এ দিন বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী জানতে চান, শিক্ষাকর্মীরা কত টাকা করে পেতেন? প্রতিনিধিরা জানান, গ্রুপ-সি কর্মীরা মাসে ৩৫ হাজার এবং গ্রুপ-ডি কর্মীরা ২৭ হাজার টাকা করে পেতেন। তখন মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “তাহলে আপনাদের সামনে দু’টো রাস্তা আছে। হয় রিভিউ পিটিশনের নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা হোক, না হলে যে সিদ্ধান্ত নেব, তা মেনে নিন।” প্রতিনিধিরা বলেন, “ম্যাডাম আমরা যোগ্যতার ভিত্তিতে বেতন পাই।”
তখন মুখ্যমন্ত্রী সংশ্লিষ্টদের সাম্মানিকের ঘোষণা করে বলেন, “কোর্ট সব বাতিল করতে বলেছে। চাকরির ক্ষেত্রে একটা ব্রেক অব সার্ভিসের ব্যাপার চলে আসে। আমাদের রিভিউ পিটিশন দাখিল করতে আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহ হয়ে যেতে পারে। সব থেকে ভাল আইনজীবী দেব। যাতে ফের পরীক্ষা দিতে না হয়। কোর্ট যদি সম্পূর্ণ বাতিল করে দেয়, তাহলে অন্য বিকল্প ভেবে দেখা হবে। কোর্ট মানবিকতার
সঙ্গে দেখুক।”
এ দিন মমতা জানান, সরকারের সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প আছে। সেই প্রকল্পে বন্ধ ডানলপ কারখানার শ্রমিকদের মাসে ১০ হাজার টাকা করে দেওয়ার ব্যবস্থা আছে। এ ক্ষেত্রেও আদালতে মামলার ফয়সালা না-হওয়া পর্যন্ত শ্রম দফতর শিক্ষাকর্মীদের মাসিক ভাতা দেবে। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, “আমি টেন্টেড-আনটেন্টেড কিছু বলব না। কারণ, কোনও প্রামাণ্য তালিকা পাইনি। প্রথম থেকেই বলা উচিত ছিল, বাদ দিয়ে দাও। সেটা তো বলেনি। আমি শিক্ষা দফতরকে এর মধ্যে রাখব না। কারণ, ওরা মামলার মধ্যে আছে। গ্রুপ সি, গ্রুপ ডি-সহ আমাদের সরকার সকলের জন্য রিভিউ পিটিশনে যাবে। তাড়াহুড়ো করতে চাই না। আইনি কাগজ তৈরি হচ্ছে।”
সরকারি এই আশ্বাসে এখনও পুরোপুরি আন্দোলনের পথ ছাড়তে নারাজ আন্দোলনকারী শিক্ষাকর্মীদের অনেকে। বৈঠকে যোগ দেওয়া প্রতিনিধিদের মধ্যে একজন বলেন, “সরকারের সাময়িক সাহায্য পেতে এত ধাপ পেরিয়ে যোগ্যতার সঙ্গে এতদিন ধরে চাকরি করিনি। সুপ্রিম কোর্টে এই মামলার জন্য আমাদের সম্মানহানিও হয়েছে। তা ফেরাতে আইনি প্রক্রিয়া দরকার। যোগ্য ও অযোগ্যদের সার্টিফায়েড তালিকাও জরুরি। কিন্তু এ ব্যাপারে সরকার এখনও সদুত্তর দেয়নি। তাই আমাদের অনশন এবং অবস্থান চলবে। কিন্তু সরকার কিছু অন্তত ভেবেছে। তাই নির্জলা অনশনের বদলে আমরা শুধু জল খেয়েই অনশন চালাব।”
এ দিন সরকারি সিদ্ধান্ত নিয়ে বিজেপির রাজ্য সভাপতি সুকান্ত মজুমদারের বক্তব্য, ‘‘সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও উনি (মুখ্যমন্ত্রী) যে ভাতা দেওয়ার কথা ঘোষণা করছেন, তাতে নতুন করে আরও আইনি জটিলতা তৈরি হবে। সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে কথা বলে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত ছিল। এঁদের মধ্যে অনেকেই অবৈধ।’’ তাঁর কটাক্ষ, ‘‘ভাতা দিতে হলে দলের থেকে টাকা দিন। তৃণমূলের কয়লা চুরি, গরু চুরি অনেক টাকা রয়েছে। রাজ্য সরকারের টাকা ওঁর পৈতৃক সম্পত্তি নয়! সাধারণ জনগণের করের টাকায় কখনওই ভাতা নয়।’’
সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুজন চক্রবর্তীর কটাক্ষ, “মুখ্যমন্ত্রী নিজে বৈঠক করার সাহস পাননি। মুখ্যমন্ত্রীর বার্তা আসলে নাকের বদলে নরুন দেওয়া। যোগ্যদের হকের চাকরি কেড়ে নিয়ে তাঁদের ভাতাজীবী করে দিচ্ছেন! চাকরিহারাদের ফের আইনি জটিলতার মধ্যে ফেলবেন না।” প্রদেশ কংগ্রেসের মুখপাত্র সৌম্য আইচ রায় বলেছেন, “আপনি (মমতা) বাংলায় অপরাধ-অপরাধীদের সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছেন। যে আইনজীবীরা প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির পর্দা ফাঁস করলেন, তাঁদের ঘেরাও করাচ্ছেন। এই সরকার
অপরাধীদের পক্ষে।”
অন্যদিকে, তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্য সহ-সভাপতি জয়প্রকাশ মজুমদার বলেছেন, “মুখ্যমন্ত্রী মানবিকতাকেই সর্বোচ্চ স্থান দেন। তাই আচমকা বিপদে পড়া মানুষের জন্য এই ব্যবস্থা করতে চেয়েছেন। এত মানুষ বেতন হারাবেন, স্ত্রী-সন্তান-পরিবার নিয়ে আতান্তরে পড়বেন— বিরোধীরা এটাই চান?”
অন্যদিকে, ইতিমধ্যেই জেলা স্কুল পরিদর্শকদের থেকে প্রধান শিক্ষক-শিক্ষিকাদের কাছে যাঁরা ‘অযোগ্য’ বলে চিহ্নিত না-হওয়া শিক্ষকদের নাম গিয়েছে। কারা বেতন পাবেন এবং কারা পাবেন না, সে ব্যাপারে বিজ্ঞপ্তিও দেওয়া হয়েছে। তাতে ২০১৬ সালের প্রক্রিয়ায় নিযুক্ত শিক্ষাকর্মীদের বেতন বন্ধের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। তবে এই মাসে বেতন সঠিক সময় হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। বাঙ্গুরের নারায়ণ দাস মাল্টিপারপাস স্কুলে প্রধান শিক্ষক সঞ্জয় বড়ুয়া বলেন, ‘‘২৮ এপ্রিল বেতন পোর্টাল আপডেট করতে হবে। তার নথি ডিআই অফিসে জমা দিতে দিতে ২৯ এপ্রিল হয়ে যাবে। তাই ৩০ এপ্রিল বেতন হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় আছে।’’