আনন্দ পাবলিশার্স প্রকাশিত ‘শরৎ সাহিত্য সমগ্র’ সম্পাদনা করেছিলেন সুকুমার সেন। মুখবন্ধে তিনি লিখেছিলেন ‘ট্রেজ়ার আইল্যান্ড’, ‘ডা. জেকিল অ্যান্ড মি. হাইড’-এর বিখ্যাত লেখক রবার্ট লুইস স্টিভেনসনের কথা। স্কটিশ নাগরিক স্টিভেনসন তাঁর জীবনের অন্তিম পর্ব কাটিয়েছিলেন প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপ সামোয়ায়, আদিবাসী জনজীবনের সঙ্গে নিজেকে ওতপ্রোত রেখে। প্রতিদিন সন্ধ্যায়, স্টিভেনসন তাঁর বাড়িতে আদিবাসীদের সঙ্গে এক অন্তরঙ্গ আড্ডায় বসতেন। নানা কাহিনি বলতেন। আদিবাসীরা মুগ্ধ হয়ে শুনত। ভালবেসে, তাদের ভাষায় তারা স্টিভেনসনের নামকরণ করেছিল ‘টুসি টালা’। অর্থাৎ, গল্প-বলিয়ে। সুকুমার সেন সেই নাম স্মরণ করে, তাঁর মুখবন্ধের শেষে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উদ্দেশে লিখেছিলেন, ‘আর বাগাড়ম্বর নয়। এ বার শরৎবাবু গল্প বলুন।’
এ এক আশ্চর্য সমাপতন যে, যে-বছর ১৪৩১ বঙ্গাব্দের আনন্দ পুরস্কার অর্পিত হচ্ছে, সে বছর ‘গল্প বলিয়ে’ স্টিভেনসনের জন্মের একশো পঁচাত্তর বছর, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়েরও সার্ধশত জন্মবর্ষের প্রাক্কাল। আর প্রাপক স্মরণজিৎ চক্রবর্তী তাঁর পুরস্কার গ্রহণ অনুষ্ঠানের ভাষণের শুরুতেই বললেন, ‘আমি গল্পের বই লিখি। শুধু গল্পই লিখি। গল্পের কথাই আজ বলতে এসেছি।’
গল্পের উত্তরাধিকার দেশ কাল পেরিয়ে এভাবেই প্রবাহিত হতে থাকে।
মফস্সল শহরে বড় হয়েছেন স্মরণজিৎ। ছোট থেকেই এক ধরনের গল্পের পরিবেশে ঢুকে পড়েছিলেন। এক চিলতে হারানো ইতিহাস নিয়ে সেখানে হাজির হয়েছিলেন স্মরণজিতের মামাদাদু। মামাদাদু তাঁর নিজের আত্মীয় নন। তাঁর ঠাকুরদার গ্রামের লোক। ঠাকুরদারা অবিভক্ত বাংলার মানুষ। ১৯৪০-এর প্রথম দিকে সকলে চলে আসেন বাটানগরে। মামাদাদু এসেছিলেন পরে, দেশ ভাগের পর। মামাদাদুর আসল নাম মানিক মালাকার। তিনি কাঠের কাজ করতেন। দোকান ছিল কাঠের ফার্নিচারের। স্মরণজিৎ লক্ষ করতেন কী ভাবে বাতিল বা বেঁচে যাওয়া কাঠ দিয়ে মূর্তি বানাচ্ছেন মানিক। সঙ্গে বলতেন গল্প—‘বাটানগরের আগের নাম ছিল মীরপুর। সামনে বইছে ভাগীরথী। সেখান দিয়ে জাহাজে করে এক সময় নাকি প্রতাপাদিত্য যেতেন। এক সময় রাজা বসন্ত রায় যেতেন। এমনকি এক সময় লর্ড ক্লাইভও নাকি ও জলপথ দিয়ে গিয়েছেন।’
গল্প পিছু ছাড়ত না যেন স্মরণজিতের। বাড়ির অন্দরেও গল্পের পরিবেশ। বাবা ছিলেন গম্ভীর মানুষ। সপ্তাহের ছ’দিন ছ’টি কথা বলতেন। সপ্তম দিন একটা বড় গল্প বলতেন, সপ্তাহের সকল না-বলা কথা বলে দিতেন ওই গল্পের মধ্য দিয়ে। স্মরণজিতের সেজকাকার নাম ছিল স্বপনকুমার চক্রবর্তী। গোয়েন্দা দীপক চ্যাটার্জির স্রষ্টার সমনামী হওয়ার কারণে তিনি স্মরণজিৎকে বলতেন, ‘আমিই স্বপনকুমার। দীপক চ্যাটার্জির কাহিনি আমারই লেখা’। অনেক বয়স পর্যন্ত তিনি এটিই বিশ্বাস করেছেন যে, তাঁর সেজকাকাই সেই গোয়েন্দা গল্প-লেখক স্বপনকুমার!
গল্প বলা, গল্প শোনা আর গল্প পড়া থেকেই ধীরে ধীরে গল্প লেখার দিকে এগিয়েছেন স্মরণজিৎ। এক সময়, ‘আনন্দমেলা’-র জন্য পাঠানো গল্প সম্পাদকীয় সিদ্ধান্তে প্রকাশিত হল ‘উনিশ-কুড়ি’ পত্রিকায়, প্রতিষ্ঠা পেলেন গল্পকার স্মরণজিৎ। ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে। উপন্যাস-গল্প মিলিয়ে লিখেছেন একের পর এক জনপ্রিয় রচনা। অচিরেই পেয়েছেন বেস্টসেলার লেখকের তকমা। তাঁর অকপট স্বীকারোক্তি, প্রথমদিকে লিখে অর্থোপার্জন তাঁকে দারুণ আকর্ষণ করেছিল। কিন্তু পরে তাঁর মাথায় অন্য এক প্ররোচনা আসে—তাঁর যে-সমস্ত বন্ধু-বান্ধবীরা হারিয়ে গিয়েছে জীবনের তোড়ে, তারা কি তাঁর নাম পত্রিকায় বিজ্ঞাপিত হতে দেখে, প্রকাশিত বইয়ে দেখে, ফিরে আসবে? তারা কি সে সব লেখা পড়ে দেখবে যে, স্মরণজিৎ আসলে তাদের কথাই লিখেছে? হারানো গল্প নিয়ে গল্প বোনার তাড়নাই শেষ পর্যন্ত পেয়ে বসল তাঁকে। সে তাড়নারই এক সুবিন্যস্ত প্রকাশ স্মরণজিতের সাম্প্রতিকতম উপন্যাস ‘শূন্য পথের মল্লিকা’। রচনাটিকে পুরস্কৃত করে আনন্দ পুরস্কার মানপত্র ঘোষণা করেছে, ‘নির্মেদ গদ্যে, প্রাণোচ্ছল তারুণ্যে, নির্মোহ অবলোকনে এবং অন্তর্দৃষ্টির অনুধাবনে এই উপন্যাস বাংলা সাহিত্যে আক্ষরিক অর্থেই এক ব্যতিক্রমী সংযোজন’।
গত বছর পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়। অসুস্থ থাকায় তিনি উপস্থিত হতে পারেননি। এ বছরের প্রধান অতিথি গণেশ হালুইও আসতে পারলেন না বয়সজনিত অসুস্থতার কারণেই। এলেন শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়। তৈরি হল এক দৃশ্য, এক সেতুও। বাংলা সাহিত্যের এক ধ্রুপদী কথাকার আনন্দ পুরস্কার তুলে দিলেন তাঁর পরবর্তী প্রজন্মের অন্যতম জন-আদৃত কথাকারের হাতে। এ শুধু পুরস্কার তুলে দেওয়া নয়, সাহিত্য-উত্তরাধিকারের দণ্ড তুলে দেওয়াও।
স্মরণজিৎকে ‘অসম্ভব শক্তিশালী এক জন লেখক’ বলে উল্লেখ করে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় বললেন, পুরস্কৃত উপন্যাসটি এক ক্যালাইডোস্কোপের মতো, তাতে মানুষের জীবনের বিবিধ বৈচিত্রময় পরত রয়েছে। এক জন যথার্থ লেখক হিসেবে স্মরণজিৎ সে সবই তুলে এনেছেন পাঠকের সামনে। যে-কোনও লেখকের তো কাজই তা-ই, মানুষের অন্তরের অপরিশোধিত রূপকে বাইরে আনা। যেমন বিভূতিভূষণ দেখিয়েছিলেন ‘অপরাজিত’-তে—যে-মা তার সবচেয়ে কাছের, তার মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে মুক্তির স্বাদ পাচ্ছে অপু। যেমন ফ্রানজ় কাফকা দেখিয়েছিলেন তাঁর ‘দ্য মেটামরফসিস’-এ—গ্রেগর সামসা হঠাৎ এক দিন সকালে উঠে এক পোকায় পরিণত হওয়ায় কী ভাবে নিজের মা-বাবার কাছ থেকেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। পোকা বা ছেলের মৃত্যুতেও মা-বাবা মুক্তির আনন্দ অনুভব করছে। কোথায় গেল বাৎসল্য! আসলে, মানুষের বহিরঙ্গে তার অন্তরঙ্গের প্রকাশ সবসময় ঘটে না।
শীর্ষেন্দু তাঁর ভাষণে বলছিলেন চিত্রকূট পর্বতের কাছে এক জলখাবার দোকানের রুক্ষ স্বভাবের দোকানির কথা। প্রান্তিক অঞ্চল। বিশেষ একটি লেখার প্রয়োজনে শীর্ষেন্দুকে যেতে হয়েছিল সেখানে। আশপাশে কিছু নেই ওই দোকান ব্যতীত। দোকানি খাবার পরিবেশন করছিল ড্রাইভার, বাস-চালকদের। খাবার চাইলেও দোকানি পাত্তা দিচ্ছিল না শীর্ষেন্দুকে। এক সময়, আর অপেক্ষা করতে না-পেরে শীর্ষেন্দু বললেন, ‘মা, আমার খিদে পেয়েছে।’ ব্যস, এতেই পাল্টে গেল দোকানির মেজাজ—রুক্ষতা থেকে মাতৃভাব দেখা দিল তার মধ্যে। খাবার পেলেন শীর্ষেন্দু। তাঁর স্বকীয় কথনে নিজের গল্প বলে, গল্পের গল্প বলে শীর্ষেন্দু আবিষ্ট করে রাখলেন শ্রোতাদের।
এক গল্প থেকে আর-এক গল্পে উপনীত হওয়া, গল্পের ভিতর গল্পের নির্মাণই ছিল ‘কথাসরিৎসাগর’ নামক বিখ্যাত কাশ্মীরি উপাখ্যানমালার উৎস। আজ কাশ্মীর শিরোনামে, রক্ত ঝরেছে উপত্যকায়। প্রার্থনা, ধর্ম-বিদ্বেষের সমস্ত গল্প সরিয়ে কাশ্মীর জেগে থাকুক, বেঁচে থাকুক কাশ্মীরিয়তের প্রকৃত গল্পে। ‘আমার মনে হয়, এমন গল্প লিখব, যেটা পড়ে খানিক ক্ষণের জন্যও আমরা ভাল থাকব’, বলছিলেন স্মরণজিৎ। ঠিকই বলেছেন। যথার্থ গল্প প্রাণদায়ী, অনৃত গল্প প্রাণঘাতী।