প্রতি বারের মতোই ১৪৩১ বঙ্গাব্দের আনন্দ পুরস্কার প্রদানের সান্ধ্য বৈশাখী আয়োজন আগাগোড়া সুরে আচ্ছন্ন করে রাখল। অশান্ত সময়-আবহে উপনিষদের স্তোত্রে অনুষ্ঠানের সঙ্গীত-পর্বের সূচনা আলাদা মাত্রা সংযোজিত করল আয়োজনে। পরে রবীন্দ্রনাথের তিনটি গান। কণ্ঠশিল্পী প্রকৃতি মুখোপাধ্যায় এবং প্রত্যুষ মুখোপাধ্যায়। তাঁদের সঙ্গত-সতীর্থ ছিলেন এসরাজে অপরাজিতা চক্রবর্তী, তালবাদ্যে পার্থ মুখোপাধ্যায়।
‘শৃন্বন্তু বিশ্বে অমৃতস্য পুত্রা/আ যে ধামানি দিব্যানি তস্থূ’— শ্বেতাশ্বতর উপনিষদের দ্বিতীয় অধ্যায়ের পঞ্চম শ্লোক এবং ‘বেদাহমেতং পুরুষং মহান্তম্/আদিত্যবর্ণং তমসঃ পরস্তাৎ/তমেব বিদিত্বাতিমৃত্যুমেতি/নান্যঃ পন্থা বিদ্যতে অয়নায়’— শ্বেতাশ্বতর উপনিষদেরই তৃতীয় অধ্যায়ের অষ্টম শ্লোক। এই দুই শ্লোকের সম্মিলিত বাংলা রূপান্তর করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ‘নৈবেদ্য’ কাব্যে— ‘শোনো অমৃতের পুত্র যত দেবগণ/দিব্যধামবাসী, আমি জেনেছি তাঁহারে/মহান্ত পুরুষ যিনি আঁধারের পারে/জ্যোতির্ময়। তাঁরে জেনে, তাঁর পানে চাহি/মৃত্যুরে লঙ্ঘিতে পারো, অন্য পথ নাহি’। আবার, ‘অমৃতের পুত্র’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ লিখছেন— ‘মৃত্যুর সাক্ষ্য চারি দিকে, অথচ মানুষ বলে উঠেছে: ওগো শোনো, তোমরা অমৃতের পুত্র, তোমরা মৃত্যুর পুত্র নও’। লিখছেন— ‘মৃত্যুর অন্ধকার সত্য নয়, সত্য সেই জ্যোতি যা যুগে যুগে মোহের অন্ধকারকে বিদীর্ণ করে আসছে।
যুগে যুগে মানুষ অজ্ঞানের ভিতর থেকে জ্ঞানকে পাচ্ছে... বিরোধের ভিতর দিয়ে সত্যকে পাচ্ছে, এ ছাড়া সত্যকে পাবার আর-কোনও উপায় মানুষের নেই’।
মানুষকে অমৃতের সন্তান বলে সম্বোধিত করার অমিয় ভাবনাটির কথা বহু ভাবে তুলে ধরেছেন স্বামী বিবেকানন্দও। তাঁর বয়ান— ‘অমৃতের পুত্র’ কী মধুর ও আশার নাম!... এই মধুর নামে আমি তোমাদের সম্বোধন করিতে চাই। তোমরা অমৃতের অধিকারী’। শান্তিদেব ঘোষের বয়ান অনুযায়ী, রবীন্দ্রনাথ এই মন্ত্রে প্রথমে ইমন-ভূপালি আধারে সুর দিয়েছিলেন। যদিও বিখ্যাত ভৈরবী বয়ানটিই। আনন্দ-সন্ধ্যায় রাবীন্দ্রিক কাঠামোর ভৈরবী বয়ানটিই পরিবেশিত হল। মন্ত্রগানের সুরে অন্য গানের মতো তালে বেঁধে বেদ-উপনিষদের মন্ত্রের গতির স্বাধীনতা খর্ব করতে চাইতেন না কবি। বরং সংস্কৃত হ্রস্ব-দীর্ঘ স্বরের কারণে মন্ত্রপাঠে যে ছন্দ উপস্থিত হয়, তার সঙ্গে রাগ-রাগিণীর সংযোজনা ঘটাতেন, মেশাতেন গির্জাগানের মাধুর্যও। আনন্দ-সন্ধ্যায় আবহে শুধুমাত্র তানপুরা রেখে প্রকৃতি-প্রত্যুষের যুগ্ম কণ্ঠে পরিবেশিত হল উপনিষদের সেই আর্ষ। শান্তিমঙ্গল সূচিত হল সভাগৃহে।
দ্বিতীয় পরিবেশনা রবীন্দ্রনাথের পূজা পর্যায়ের ‘জাগে নাথ জোছনারাতে’। শিল্পী প্রত্যুষ। বেহাগে বাঁধা ধামার-তালবিভঙ্গের ধ্রুপদাঙ্গ। ১৩১৬ বঙ্গাব্দ, ১৯১০ খ্রিস্টাব্দের সাত পঙ্ক্তির রচনা। রচনাকালে কবির বয়স ৪৯। মূল গান ‘আজু রঙ্গ খেলত হোরি’ থেকে তৈরি হয়ে ওঠা ভাঙাগান। প্রত্যুষ উপস্থাপনায় সমীহ-সংযোগ ঘটালেন ধীর লয় নির্বাচন করে। মিঠে-ওজস্বী কণ্ঠ, আকুল এসরাজের মূর্ছনা আর অতুলনীয় পাখোয়াজ-সঙ্গতে ধ্রুপদের নির্যাস ছড়িয়ে পড়ল অনুষ্ঠানগৃহে।
তৃতীয় গান রবীন্দ্রনাথের প্রেম পর্যায়ের ‘ওগো শোনো কে বাজায়’— ‘কড়ি ও কোমল’ কাব্যের কবিতা ‘বাঁশি’র সুরারোপিত বয়ান, যার সুররূপ বেহাগ-নিবদ্ধ কীর্তনাঙ্গের। আড়খেমটায় গাঁথা এই গানটির জন্ম ১২৯৩ বঙ্গাব্দ, ১৮৮৬ সালে। কবি তখন ২৫ বছরের। রবীন্দ্রনাথ বেহাগসিদ্ধ এবং তাঁর বেহাগ গোঁড়া-মতে সঙ্গীতশাস্ত্র মান্য করা বেহাগের চেয়ে আলাদা। এই গানটিতেই যেমন সুরের চলন বেহাগড়ার মতো— কোমল নিষাদের ব্যবহার, যা বাণীর আকুলতাকে আরও তীব্র করে তোলে। বেহাগে বাঁধা ধ্রুপদে কোমল বা নিখাদ নিষাদের ব্যবহার মেলে। হয়তো রবীন্দ্রনাথেও তা মেলে ধ্রুপদের প্রতি কবির আজন্ম-টানের সূত্রে। শিল্পী প্রকৃতি মুখোপাধ্যায় এ গানে প্রবেশ করলেন অপরাজিতা চক্রবর্তীর এসরাজের মরমিপথ ধরে। শ্রীখোলে অনবদ্য সঙ্গতে মিঠে-গম্ভীর কাটা-বোলে কীর্তনের রস চুঁইয়ে পড়ল।
অনুষ্ঠানের শেষ গানটিতেও বেহাগ-রেশ অব্যাহত। রবীন্দ্রনাথের প্রকৃতি পর্যায়ের বাসন্তী গান ‘ও আমার চাঁদের আলো’— বেহাগ-খাম্বাজ নিবদ্ধ বাউলাঙ্গ দাদরা। ১৩২৯ বঙ্গাব্দ, ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দের রচনা। কবির বয়স তখন ৬২। শান্তিনিকেতনের বসন্তোৎসবের আগের রাতের বৈতালিকে গীত হয়ে আসা এ গান বাঙালি-মনের শিমুল-পলাশ ফাল্গুন-জ্যোৎস্না। একই সঙ্গে ‘শাপমোচন’-অনুষঙ্গও— ‘কেমন করে কমলিকার ছবি এসে পড়ল গান্ধারে রাজ-অন্তঃপুরে। মনে হল, যা হারিয়েছিল এই-জন্মের আড়ালে, তাই যেন ফিরে ধরা দিল অপরূপ স্বপ্নরূপে’। প্রকৃতি আর প্রত্যুষ একসঙ্গে গাইলেন গানটি। গানের আগে চিকন দ্রুতিতে ঢুকল শ্রীখোল। শিল্পীরা এ গানের কিছু পঙ্ক্তি সংলাপের মতো ভাগ করে নিয়ে আলাদা আলাদাও গাইলেন। তাতে নবতর আবেশ তৈরি হল।
এ বারের আনন্দ-সন্ধ্যার শিল্পীদের শান্তিনিকেতন-যোগ তাঁদের পরিবেশনে স্পষ্ট ধরা পড়ল। গায়কি, উচ্চারণ এবং বাদনে। ভৈরবীতে শুরু করে বেহাগের নানা আস্তরের আলিম্পনে গান নির্বাচনের ভাবনাটি খুব সুন্দর, ভিন্ন মাত্রার। কণ্ঠশিল্পী প্রকৃতি-প্রত্যুষ যেমন আচ্ছন্ন করে রাখলেন প্রতিটি গানে ভাবের প্রাণ-উদ্ঘাটনে, তেমনই এসরাজে সুযোগ্য সঙ্গতের পাশাপাশি মায়া-বিচ্ছুরণ ঘটালেন অপরাজিতা, তেমনই তালবাদ্যে পাখোয়াজে-শ্রীখোলে মাপা বিভঙ্গে মাত করলেন পার্থ।