ভবিষ্যৎ-অস্ত্র কী, ক্যানসার নিয়ে সম্মেলন শিকাগোয়
সায়ন্তনী ভট্টাচার্য
ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় বারের জন্য আমেরিকার সিংহাসনে বসার পরেই একটা ত্রাহি ত্রাহি রব উঠেছিল বিজ্ঞানী মহলে। কারণ ক্ষমতায় এসেই তিনি ঘোষণা করেন, গবেষণায় অর্থবরাদ্দ কাটছাট করা হবে। চিন্তায় পড়েন ক্যানসার বিশেষজ্ঞেরা। কারণ এই গবেষণা বিপুল খরচসাপেক্ষ। ক্যানসার গবেষকদের মুখে এই নিয়ে হতাশাও শোনা গিয়েছে যে, ‘‘আমরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা, গবেষণা, চিকিৎসা নিয়ে বুঁদ হয়ে থাকি। কিন্তু জনমানসে আরও প্রচার করা উচিত ছিল। ক্যানসার মানেই মৃত্যুদণ্ড নয়। বিজ্ঞান অনেক এগিয়ে গিয়েছে। এই বিপুল অর্থ ব্যয় যে প্রয়োজনীয়, পৌঁছে দেওয়া উচিত ছিল সেই বার্তাও।’’ এমনই এক আবহে এ বছর শিকাগো শহরে অনুষ্ঠিত হল ‘আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন ফর ক্যানসার রিসার্চ’ (এএসিআর)-এর বার্ষিক সম্মেলন।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ৮১টি দেশের ২২ হাজারেরও বেশি বিজ্ঞানী, চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী, ওষুধপ্রস্তুতকারী সংস্থার প্রতিনিধিরা, ক্যানসার আক্রান্ত রোগী, ক্যানসার-জয়ী, এমনকি সাংবাদিকেরাও। এই সম্মেলনের উদ্দেশ্যই ছিল, গবেষণায় বিপুল অগ্রগতির বার্তা পৌঁছে দেওয়া জনমানসে। এ বছরের থিম ছিল: ‘ইউনিফাইং ক্যানসার সায়েন্স অ্যান্ড মেডিসিন: এ কন্টিনিউয়াম অব ইনোভেশন ফর ইমপ্যাক্ট’। অর্থাৎ কর্কটরোগের বিজ্ঞান ও চিকিৎসাকে একত্রিত করে লাগাতার উদ্ভাবন, যার প্রভাব চোখে পড়ার মতো।
এ বারের সম্মেলনে জোর দেওয়া হয়েছে ‘ড্রাগ রেজ়িসস্ট্যান্স’-এর উপরে। কোনও ওষুধ বা চিকিৎসা পদ্ধতি কিছু রোগীর উপর কাজ দিচ্ছে, কিন্তু অন্যদের শরীরে কাজ দিচ্ছে না। কিংবা কোনও ওষুধ প্রথমে কাজ দিচ্ছে, কিন্তু পরে রোগীর দেহে কাজ দিচ্ছে না। এর কারণ জানার উপর জোর দিচ্ছেন বিজ্ঞানীরা। ঠিক এই জায়গা থেকেই উঠে এসেছে ‘পার্সোনালাইজ়ড মেডিসিন’-এর প্রয়োজনীয়তার কথা। অর্থাৎ রোগীবিশেষে চিকিৎসা। দু’টো মানুষের একই ধরনের ক্যানসার হলেও রোগের চরিত্র ভিন্ন হতে পারে। রোগীভিত্তিক সমস্যাকে চিহ্নিত করে সেই মতো চিকিৎসাপদ্ধতি স্থির করায় জোর দিচ্ছেন আমেরিকার গবেষকেরা। বিজ্ঞানী ডেভিড ক্রেগের কথায়, ‘‘এক জন রোগীর উপর নজর দিয়ে তাঁর রোগটা বোঝা... ক্যানসার নিরাময়ে এই কৌশল নিচ্ছি আমরা।’’
গবেষণায় ‘অর্গানয়েড’ ব্যবহার করার উপরেও জোর দেওয়া হয়েছে এই সম্মেলনে। ‘অর্গানয়েড’ হল গবেষণাগারে তৈরি ত্রিমাত্রিক কোষ-সমষ্টি যা কোনও অঙ্গের ক্ষুদ্র সংস্করণ। গবেষণাগারে প্রাণীদের শরীরে পরীক্ষা না করে, তার বদলে রোগীর কোষ থেকে তৈরি অর্গানয়েডে পরীক্ষা করার উপরে জোর দেওয়া হয়েছে সম্মেলনে। তাতে গবেষণার ফলাফল আরও নিখুঁত হবে। সেই সঙ্গে দীর্ঘকাল ধরে গবেষণাগারে নির্বিচারে প্রাণী-হত্যা নিয়ে যে ক্ষোভ রয়েছে, তারও সমাধান হয়। ক্যানসারের প্রতিষেধক নিয়েও আলোচনা হয়েছে ১১৬তম এএসিআর সম্মেলনে। উঠে এসেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগ ও ডিজিট্যাল প্যাথোলজির কথা। এআই ব্যবহারের লাভক্ষতি প্রসঙ্গে সম্মেলনে উপস্থিত বিজ্ঞানী ট্রে ইডেকার বলেন, ‘‘আমাদের বিশ্বাস থাকতে হবে, স্বচ্ছতা থাকতে হবে ও কোনও যুক্তি নিয়ে স্পষ্ট ধারণা থাকতে হবে।’’
বিজ্ঞানীরা আরও জোর দেন ‘স্পেশিয়াল মাল্টি ওমিক্স’-এর উপরে। এর সাহায্যে একই সঙ্গে একটি কলাকোষ থেকে একাধিক বিষয়ে তথ্য বিশ্লেষণ করা সম্ভব। অর্থাৎ একটি টিস্যু বা কলাকোষ থেকে জিনোমিক্স (জিন বিষয়ক), এপিজিনোমিক্স (ডিএনএ-তে রাসায়নিক পরিবর্তন জিন-চরিত্র বদল), মেটাবোলোমিক্স (বিপাক সম্পর্কিত), প্রোটিওমিক্স (প্রোটিন বিষয়ে গবেষণা) জানা যায়। সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন ক্যানসার গবেষক অরিন্দম বসু। তিনি বলেন, ‘‘কোনও এক জন রোগী একটি চিকিৎসা পদ্ধতিতে কেমন সারা দেবেন, সেটা আগে থেকে বোঝা খুব মুশকিল। কিন্তু নতুন প্রযুক্তি মাল্টি-ওমিক্স এবং পার্সোনালাইজ়ড চিকিৎসা সেই পথ করে দিচ্ছে। এই পদ্ধতিতে টিউমারের চরিত্র বোঝা যাচ্ছে। তাকে কাবু করার রাস্তা খুঁজে পাওয়াও সহজ হচ্ছে। ভবিষ্যৎ চিকিৎসা ব্যবস্থা নিঃসন্দেহে এর উপরেই দাঁড়িয়ে রয়েছে।’’