ডায়মন্ড হারবার রোডে মোমিনপুর থেকে খিদিরপুর পর্যন্ত মেট্রো করিডর নির্মাণের কাজ চলছে বহু দিন ধরেই। কিন্তু এই করিডরের পথে এবং নির্ধারিত মেট্রো স্টেশনগুলির আশপাশে পুরসভার জল সরবরাহ দফতরের বিস্তৃত পাইপলাইনের জাল বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই পাইপলাইনগুলির ব্যাস ১২০০ মিলিমিটার থেকে শুরু করে ১০০ মিলিমিটার পর্যন্ত— যার মধ্যে রয়েছে পরিস্রুত জল বহনকারী প্রধান লাইন, অপরিশোধিত জল বহনকারী লাইন, ট্রাঙ্ক মেন, রিজ়ার্ভ মেন, সার্ভিস মেন, ইন্টারকানেকশন ও ব্যালান্সার পাইপ। এগুলি শুধু মোমিনপুর ও খিদিরপুর নয়, আশপাশের আরও একাধিক ওয়ার্ডে প্রতিদিন কয়েক হাজার মানুষের পানীয় জল সরবরাহের মূল ভরসা।
মেট্রো নির্মাণের জন্য রেল বিকাশ নিগম লিমিটেড (আরভিএনএল) আনুষ্ঠানিক ভাবে পুরসভাকে অনুরোধ করে, এই পাইপলাইনগুলি স্থানান্তর না করলে প্রকল্পে বড় ধরনের সমস্যা ঘটতে পারে। কিন্তু এই অঞ্চলে ঘনবসতি ও বহু বস্তি এলাকা থাকায় এক মুহূর্তের জন্যও জল সরবরাহ বন্ধ করা সম্ভব নয়। এখানেই তৈরি হয়েছে দ্বৈত চ্যালেঞ্জ— এক দিকে মেট্রো নির্মাণের গতি বজায় রাখা, অন্য দিকে জল সরবরাহ সচল রাখা।
প্রকল্পের পরিকল্পনা অনুযায়ী, মোমিনপুর থেকে ন্যাশনাল লাইব্রেরি অ্যাভিনিউ পর্যন্ত করিডর হবে মাটির উপর দিয়ে। আর ন্যাশনাল লাইব্রেরি অ্যাভিনিউ থেকে খিদিরপুর পর্যন্ত মেট্রো চলবে ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ দিয়ে। ওই সুড়ঙ্গ নির্মাণের এলাকায় থাকা পাইপলাইনগুলি আগে সরানো জরুরি। ইতিমধ্যেই আরভিএনএল পূর্ব দিকের কিছু জমি অধিগ্রহণ করেছে, আর পশ্চিম দিকে পাইপলাইন খালি করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
পুরসভার জল সরবরাহ দফতর এই জটিল পরিস্থিতির মোকাবিলায় মোট ৩৩টি পৃথক কাজের পরিকল্পনা করেছে। প্রতিটি কাজের আওতায় নির্দিষ্ট ব্যাসের পাইপলাইনের স্থানান্তর, পুনর্বিন্যাস ও তার অভিমুখ বদলানো হবে। এর মধ্যে ব্যয়ের হিসাবে প্রথম পাঁচটি বড় কাজ হল— সার্কুলার গার্ডেনরিচ রোড থেকে বডিগার্ড কমপ্লেক্স পর্যন্ত ৯০০ মিলিমিটার ব্যাসের পাইপ স্থানান্তর (যার ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৪ কোটি টাকা), ময়ূরভঞ্জ রোড থেকে ন্যাশনাল লাইব্রেরি অ্যাভিনিউ পর্যন্ত ১২০০ মিলিমিটার ব্যাসের এমএস পাইপ স্থানান্তরের খরচ ৩.৫ কোটি টাকা, মোমিনপুর থেকে গোপাল ঘোষ রোড পর্যন্ত ৩০০ মিলিমিটার ব্যাসের পাইপ স্থানান্তরের ব্যয় ধরা হয়েছে দেড় কোটি টাকা।
এর পরে রয়েছে ৭৫০ মিলিমিটার এবং ৫০০ মিলিমিটার ব্যাসের পাইপ স্থানান্তরের দু’টি বড় কাজ, যেগুলির আনুমানিক খরচও কয়েক কোটি টাকার ঘরে। সব মিলিয়ে প্রকল্পের মোট ব্যয় ৪১ কোটি টাকারও বেশি।
এই প্রকল্পের পুরো ব্যয়ভার বহন করবে আরভিএনএল-এর ডিপোজিট ফান্ড। পুর জল সরবরাহ দফতরের মতে, এই প্রকল্প শুধু মেট্রো নির্মাণের পথই সুগম করবে না, বরং পুরনো পাইপলাইনগুলিকে পুনর্বিন্যাস ও মেরামত করে ভবিষ্যতে জল সরবরাহ ব্যবস্থার স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তাও বাড়াবে।
প্রশাসনিক মহলের বক্তব্য, এই ধরনের দ্বৈত প্রকল্পে যথাযথ পরিকল্পনা ও সমন্বয়ই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। মেট্রো নির্মাণের জন্য সময়সীমা নির্দিষ্ট, আবার জল সরবরাহের ক্ষেত্রে কোনও রকম ব্যাঘাত ঘটলে জন-অসন্তোষ চরমে উঠতে পারে। তাই পুরো কাজটি ধাপে ধাপে করা হবে।
প্রথমে অস্থায়ী লাইনের মাধ্যমে জল সরবরাহ চালু রেখে পুরনো পাইপলাইন সরানো হবে। তার পরে নতুন পথে স্থায়ী পাইপ বসানো হবে। প্রতিটি ধাপ আরভিএনএল ও পুরসভার যৌথ তত্ত্বাবধানে সম্পন্ন হবে। পুরসভার এক আধিকারিকের কথায়, ‘‘এটি শুধুমাত্র নির্মাণ প্রকল্প নয়, বরং শহরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জন পরিষেবা বজায় রেখে পরিকাঠামোগত উন্নয়নের একটি বড় উদাহরণ হতে পারে।’’