যান্ত্রিক শিক্ষা
ঈশা দাশগুপ্তের ‘নগদ মূল্যে কিনে আনা শিক্ষা’ (১-৭) শীর্ষক প্রবন্ধটি বড় দুঃখের। এই শিক্ষাব্যবস্থায় মানুষ গড়ার কাজটি হয় না। এ বড় প্রাণহীন, যান্ত্রিক শিক্ষাব্যবস্থা। পরীক্ষাকেন্দ্রিক এই শিক্ষায় নিরাসক্ত মন নিয়েও পড়া মুখস্থ করে ১০০ শতাংশে পৌঁছনোর জীবনপণ লড়াই চলে। এরা ছাপার অক্ষরেই সম্পূর্ণ ডুবে থাকে, বাইরের প্রত্যক্ষ জগতের প্রতি এদের আকর্ষণ থাকে না। শিক্ষাঙ্গনের দেওয়ালের বাইরে, এদের মনে লাগে না বিশ্বপ্রাণের স্পন্দন। এ তো মানসিক শক্তিহ্রাসকারী নিরানন্দময় শিক্ষা। এখানে রয়েছে কোর্স-শেষে বিরাট প্যাকেজের চাকরির হাতছানি, যদিও সেই ক্ষেত্রটিও সীমিত! কাজেই, অসম্ভব প্রতিযোগিতার দৌড়ে এই একমাত্র ‘মোক্ষ’ লাভে বঞ্চিত হলে আসে তীব্র হতাশা, হাহাকার। অতি সামান্য শতাংশ বিজয়ীর পাশে হেরে যাওয়া শিক্ষার্থীরা হারিয়ে যায় অন্ধকারের চোরাবালিতে। অসম্ভব প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থতার গ্লানি বয়ে বেড়াতে হয় অনির্দিষ্টকাল ধরে। আজ নিরপরাধ শিক্ষার্থীর কাছে এ ধরনের ‘বিদ্যাগার’ পেয়েছে ‘কারাগার’-এর আকৃতি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কোচিং ক্লাসে থেকে এরা আহরণ করে ‘বিদ্যাবস্তু’। হয় না তার যথার্থ ব্যবহার। যথাযথ বিকাশ ঘটে না শিক্ষার্থীর নিজস্ব চিন্তা ও কল্পনাশক্তির।
প্রবন্ধকার ঠিকই বলেছেন, ‘বিদ্যাবস্তু’ আজ নগদ মূল্যে কিনতে হয়। কাজেই শিক্ষাদান নামক ব্যবসায়িক ব্যবস্থায় স্নেহ-শ্রদ্ধা-নিষ্ঠা আজ নেই। তবে আশার কথা, সবটাই এখনও বিকিয়ে যায়নি। এখনও সরকারি বা সরকারপোষিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ডিগ্রিধারী শিক্ষার্থীরা জীবনের অনেক ক্ষেত্রে নিজেদের মেলে ধরছে। সর্বভারতীয় প্রবেশিকা পরীক্ষায় ভাল ‘র্যাঙ্ক’ করে তথাকথিত ভাল প্রতিষ্ঠানে পড়ার সুযোগ করে নিচ্ছে, বিদেশ পাড়ি দিচ্ছে পোস্ট ডক্টরেট করতে। সামান্য বেতনের বিনিময়ে বি টেক বা এম টেক ডিগ্রি অর্জন করে বিরাট প্যাকেজের চাকরি নিয়ে দেশ-বিদেশের নামীদামি প্রতিষ্ঠানে যোগ দিচ্ছে। মেধা ও পরিশ্রমের সবটুকু আজ বিক্রি হয়ে যায়নি। তবে সমস্যাও অনেক। ডিগ্রিধারী শিক্ষার্থীর তুলনায় আজ চাকরিতে নিয়োগ অপ্রতুল। রয়েছে দুর্বৃত্তায়নের নানা ফন্দিফিকির, ছলনাই যেখানে অধিক। প্রশিক্ষিত শিক্ষার্থী বাধ্য হচ্ছে স্বল্প মাইনের চুক্তিভিত্তিক কাজ করতে। বাবা-মায়ের আক্ষেপ আজ এটাই, হয়তো অপরাধবোধও।
সুদেব মাল
খরসরাই, হুগলি