ফের এক বিএলও-র অস্বাভাবিক মৃত্যু হল। এ বারের ঘটনাটি কলকাতার পূর্ব যাদবপুর থানার মুকুন্দপুর এলাকার অহল্যানগরের। পুলিশ জানিয়েছে, মৃতের নাম অশোক দাস (৪৭)। বৃহস্পতিবার সকালে বাড়ির শৌচাগারে ঝুলন্ত অবস্থায় অশোককে দেখেন পরিজনেরা। তাঁকে উদ্ধার করে বাড়ির কাছে বাইপাসের একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে গেলে মৃত ঘোষণা করা হয়। ওই ব্যক্তি দক্ষিণ ২৪ পরগনার জয়নগরের বহড়ু হাইস্কুলের সহকারী শিক্ষক ছিলেন।
ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) কাজ শুরুর পর থেকে এই নিয়ে রাজ্যে অন্তত সাত জন বিএলও-র মৃত্যু হল বলে জানা যাচ্ছে। গত ডিসেম্বর পর্যন্ত চার জনের মৃত্যুর খবর সামনে এসেছিল। চলতি বছরে ফের একাধিক বিএলও-র মৃত্যুর খবর আসতে শুরু করেছে।
১০৯ নম্বর ওয়ার্ডের ১১০ নম্বর পার্টের বিএলও অশোকের মৃত্যুতে শাসকদল তৃণমূল এবং বিজেপির মধ্যে চাপান-উতোর শুরু হয়েছে। তৃণমূলের অভিযোগ, এসআইআর-এ কাজের চাপ না নিতে পেরেই এই ঘটনা। বিজেপির অভিযোগ, বিএলও-র কাজে হস্তক্ষেপ করছিলেন স্থানীয় তৃণমূল নেতৃত্ব। সেই চাপ নিতে পারেননি অশোক। তবে এই ঘটনা পারিবারিক কারণে কিনা, পুলিশ তা-ও তদন্ত করে দেখছে।
অশোকের বৌদি মধুরিমা দাস জানান, তাঁর স্বামীরা তিন ভাই। একই বাড়িতে থাকেন সবাই। এ দিন সকাল সাড়ে আটটা নাগাদ অশোকের স্ত্রী সুদীপ্তা জানান, শৌচাগারে অশোককে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া গিয়েছে। মধুরিমা বলেন, ‘‘অনেক ক্ষণ শৌচালয়ে গিয়েছিল অশোক। শেষে দরজা ভেঙে ওকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলেও তত ক্ষণে সব শেষ।’’
এ দিন প্রথমে অশোকের বাড়িতে ও পরে ওই হাসপাতালে যান কলকাতার নগরপাল মনোজ বর্মা। সেখানে তিনি মৃতের পরিবারের সঙ্গে কথা বলেন। পুলিশ সূত্রে জানানো হয়েছে, সব দিক তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। সুইসাইড নোট পাওয়া গিয়েছে কিনা, তা নিয়ে লালবাজার মন্তব্য করতে চায়নি।
হাসিখুশি স্বভাবের অশোকের এমন মৃত্যু মেনে নিতে পারছে না তাঁর পরিবার। তবে বিএলও-র কাজ শুরুর পর থেকে যে প্রচুর চাপ বেড়েছিল, তা মানছেন পরিজনেরা। অশোকের দিদি রাখি শর্মা বলেন, ‘‘দিন চারেক আগে ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। বলল, শরীর ভাল নেই। কাজেরও চাপ চলছে।’’
এ দিন স্বামীর দেহ নিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন সুদীপ্তা। সঙ্গে ছিল তাঁর ১৩ বছরের ছেলে অনুরাগ। সুদীপ্তা বলেন, ‘‘অশোক খুব গুছিয়ে কাজ করত। যখন বিএলও-র কাজ শুরু করেছিল, তখন হাসিখুশি ছিল। বলেছিল, সবাই সাহায্য করছে। কিন্তু কী এমন হল যে, দু’মাসে পুরো পরিস্থিতি পাল্টে গেল?’’ অশোকের স্কুলের প্রধান শিক্ষক এ দিন হাসপাতালে যান। তিনি বলেন, ‘‘কাজের চাপ তো ছিলই। গত দু’মাস অশোক স্কুলে যেতে পারেননি।’’
এ দিকে অশোকের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই বাড়িতে ভিড় করেন স্থানীয় তৃণমূল কর্মীরা। বিকেলে অশোকের বাড়িতে আসেন সিপিএম নেতা কান্তি গঙ্গোপাধ্যায়। দুপুর থেকে ওই বেসরকারি হাসপাতালের সামনে দেখা গিয়েছে স্থানীয় বিজেপি এবং তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের। বিজেপি নেতা অমিত মালবীয় তাঁর এক্স হ্যান্ডলে লেখেন— ১০৯ নম্বর ওয়ার্ডের তৃণমূল পুরপ্রতিনিধি অনন্যা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তৃণমূলের বিএলএ (২) রাজু বিশ্বাস বিএলও অশোক দাসের উপরে ভোটার তালিকায় অবৈধ ভোটার রেখে দেওয়ার চাপ তৈরি করছিলেন। ওই ভোটারদের তালিকা থেকে বাদ দিলে তাঁর পরিবারের উপরে হামলা করার হুমকি দেওয়া হয়। সেই চাপ নিতে পারেননি অশোক।
বিজেপি নেত্রী তথা বিএলএ (২) মৌসুমী দাসের দাবি, ‘‘অশোকের স্ত্রী সুদীপ্তার সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। সুদীপ্তা বলেছেন, ভোটার তালিকায় নাম কাটা গেলে স্থানীয় তৃণমূল পুরপ্রতিনিধি অনন্যা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং বিএলএ-(২) রাজু বিশ্বাস অশোককে দেখে নেবেন বলে ফোনে হুমকি দেন। এমনকি, রাস্তায় বেরোলে বৌ-ছেলেকে দেখে নেবেন বলেছিলেন। সুদীপ্তার সঙ্গে সেই কথোপকথন রয়েছে অডিয়োয়।’’
অভিযোগ অস্বীকার করে অনন্যা বলেন, ‘‘বিজেপি রাজনৈতিক ভাবে মানহানি করতে এ সব বলছে। যে অডিয়োর কথা শোনা যাচ্ছে, সেটা বিজেপির বিএলএ এবং এক মহিলার কথোপকথন। যার বাস্তব ভিত্তি নেই। এলাকায় আরও বিএলও আছেন, তাঁরা তো অভিযোগ করছেন না আমার বিরুদ্ধে। কারণ এসআইআর নিয়ে কোনও সমস্যা নেই এখানে।’’ সুদীপ্তা সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘‘এসআইআর-এর কাজের চাপ ছিল। বলেছিলাম, নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ করতে। আমাকে আর কিছু বলবেন না।’’