স্বচ্ছতা জরুরি
সুকান্ত চৌধুরী তাঁর প্রবন্ধ ‘প্রজা নই, নাগরিক’ (১৫-১২)-এ লিখেছেন, ভোটারতালিকা ও নাগরিকপঞ্জি এক বস্তু নয়। এটা সহজবোধ্য, কারণ নাগরিকদের মধ্যে প্রাপ্তবয়স্করাই ভোটারতালিকার অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাকেন। তবে, স্বাধীন ভারতে ১৯৫১ সালে অসমেই প্রথম ন্যাশনাল রেজিস্টার অব সিটিজ়েনস (এনআরসি) বা জাতীয় নাগরিকপঞ্জির কাজ গণ্য করা হয়েছিল। সময়ে সময়ে সংশোধিত হয়ে ১৯৭১ সালের ভোটারতালিকাকে অসমের ক্ষেত্রে জাতীয় নাগরিকপঞ্জির ভিত্তি ধরা হয়। তাই প্রবন্ধকার যখন বলেন, “নির্বাচন প্রক্রিয়া ঘিরে সমগ্র নাগরিকমণ্ডলে এমন উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তাবোধ স্বাধীন ভারতে কখনও দেখা যায়নি”, তখন সেটা অসমের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য না-ও হতে পারে।
এই রাজ্যে বিদেশি বিতাড়ন আন্দোলনের মূলেই ছিল বিতর্কিত ভোটারতালিকা, যেখানে প্রচুর অবৈধ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীর নাম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, এমনই অভিযোগ। অসমের বাঙালিরা গত চার দশক ধরেই ভোটারতালিকা নিয়ে আশঙ্কায় থাকেন, যদিও ২০১৪ থেকে শুরু হওয়া ‘এনআরসি’ প্রস্তুত প্রক্রিয়ায় ভোটারতালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তিই নাগরিকত্ব প্রমাণের জন্য যথেষ্ট ছিল না। এক জটিল, বিভ্রান্তিকর, কষ্টদায়ক সর্বোপরি অনিশ্চিত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে অসমবাসী বিশেষত, বাঙালিদের নিজেদের নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে হয়েছে। সেটাও কাগজপত্রেই রয়ে গিয়েছে, আইনি স্বীকৃতির আলো দেখেনি। উল্লেখ্য, ১৯৫১ থেকে শুরু করে আট বার ভোটারতালিকার নিবিড় সংশোধন হয়ে গেলেও এ বারের প্রক্রিয়া বিহার, পশ্চিমবঙ্গ-সহ কিছু রাজ্যে যে অনিশ্চয়তার জন্ম দিয়েছে, তার নেপথ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর পরস্পরবিরোধী বিবৃতি, বিষয়টিকে স্বচ্ছ ভাবে জনগণের সামনে তুলে ধরার নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে নানা প্রশ্ন তোলে। রাজনৈতিক দলগুলোও সময়ে সময়ে ত্রুটিপূর্ণ ভোটারতালিকা সংশোধনের কথা বলে থাকে এবং এটা প্রয়োজন। ইতিমধ্যেই যে পরিমাণ মৃত ও স্থানান্তরিত ভোটারের হিসাব বেরিয়েছে, তাতে এই প্রয়োজন স্বীকৃত হয়। তবে, অসমের বাইরের রাজ্যের অধিবাসীদের কাছে এ জাতীয় অভিজ্ঞতা নতুন, তাই একটু সময়ের জন্য হলেও নাগরিক হিসেবে গণতন্ত্রের কাছে নিজেদের বিপন্নতা প্রথম বারের জন্য স্পষ্ট হয়েছে। এমন বিপন্নতা যদি ভবিষ্যতেও ঘটে, সে আমাদের বহুচর্চিত গণতন্ত্র ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার দুর্বলতা রূপেই গণ্য হবে।
সুদীপ্ত দেবরায়
শিলচর, অসম