নীতির গেরোয়
সুকান্ত চৌধুরীর ‘প্রজা নই, নাগরিক’ প্রবন্ধটি পড়তে গিয়ে শুরুতেই একরাশ বেদনায় মন ভারাক্রান্ত হয়ে উঠল। সুনালী খাতুন নামের এক অন্তঃসত্ত্বা মহিলাকে তাঁর নাবালক সন্তান-সহ যে ভাবে বিচার ছাড়াই শুধুমাত্র সন্দেহের বশে ‘বাংলাদেশি’ আখ্যা দিয়ে দিল্লি থেকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হল, তা যে কোনও ধর্মাবলম্বী মানুষের কাছে অমানবিকতার এক চরম নজির হিসেবে পরিগণিত হবে। খবরে প্রকাশ, সুনালী খাতুন দিল্লি পাড়ি দিয়েছিলেন রুজি রোজগারের আশায়। বাংলাদেশের সংশোধনাগারে তিন মাসের বেশি সময় বন্দি থাকার পর তাঁকে কিছু দিন আগে ফের দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে।
ইদানীং শাসক দল ভুল স্বীকার করে শুধরে নেওয়া তো দূরে থাক, সেটিকেই সঠিক এবং ন্যায় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে মরিয়া হয়ে ওঠে। প্রবন্ধকার আর একটি গুরুত্বপূর্ণ ও ভয়ের বিষয় উল্লেখ করেছেন যে, সরকারের সঙ্গে সাধারণ মানুষের বিশ্বাস এবং আস্থার সম্পর্ক এখন অবিশ্বাস ও আতঙ্কে পর্যবসিত হয়েছে। হাতে না মেরে সরকারের ভাতে মারার অভিনব ফন্দিফিকিরে সাধারণ নাগরিকের প্রাণ ওষ্ঠাগত। এমনিতেই দেশ জুড়ে তীব্র বেকারত্ব, লাগামছাড়া দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি। এ সবের মাঝে এসআইআর, নাগরিকত্বের পরীক্ষা, এনপিআর, এনআরসি-র মতো বিষয় সহায় সম্বলহীন মানুষগুলিকে দিশেহারা করে তুলেছে ক্রমশ। সরকারের লক্ষ্য কেবল ভোটব্যাঙ্ক সামলে ভোটবৈতরণি পার হওয়া। জানি না, সরকারের এই নীতি এ কালের অভিশাপ, না আমাদের উদাসীনতার খেসারত।
বাবুলাল দাস
ইছাপুর, উত্তর ২৪ পরগনা
বিকল্প
“সিআইএসএফ বাহিনী রাখতে ‘দখল’ স্কুল ভবন, আদালতে কর্তৃপক্ষ” (৩-১) খবরটি পড়ে অবাক হলাম। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের নিরাপত্তায় মোতায়েন সিআইএসএফ জওয়ানদের রাখতে রাজ্য সরকার দু’মাসের পরিকল্পনায় ট্যাংরায় চিনাদের একটি বেসরকারি স্কুল নিয়েছিল। তার পর ১৪ মাস কেটে গেলেও স্কুলবাড়িটি থেকে জওয়ানদের সরানো হয়নি। স্বাভাবিক ভাবেই স্কুলের পঠনপাঠন বন্ধ হয়ে গিয়েছে। এ ছাড়াও, চিনা সম্প্রদায়ের সামাজিক মেলামেশার জন্যও ব্যবহৃত হয় স্কুল চত্বরটি। স্কুলটি খালি করার সরকারি কোনও পদক্ষেপের অভাবে তাই আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন স্কুল কর্তৃপক্ষ।
গোটা রাজ্যে সরকারি প্রচুর ‘ভেস্টেড’ জমি পড়ে আছে। কোথাও তা বেদখল হয়ে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান গড়ে স্থানীয় ভাবে ব্যবসার কাজে লাগানোও হচ্ছে। ওই সব জায়গায় জল, কল, শৌচাগার সম্বলিত কমিউনিটি সেন্টার গড়ে কেন্দ্রীয় বাহিনীর জন্য অতিথিশালা গড়ে তোলা যায়। অন্য সময়ে তা নানান সামাজিক কাজে (বিয়ের অনুষ্ঠান, জন্মদিনের পার্টি, ইত্যাদিতে) ব্যবহার করে তার রক্ষণাবেক্ষণের খরচ তুলে নিতে পারে সরকার। তেমনটা হলে ছেলেমেয়েদের পড়াশোনাও আটকায় না আর সরকারের সংশ্লিষ্ট উদ্দেশ্যও পূর্ণ হয়।
সৌম্যেন্দ্র নাথ জানা
কলকাতা-১৫৪
অসহিষ্ণু
উন্নয়ন ও আধুনিকতার আলোয় আমরা আজ যে সমাজে বাস করছি, সেখানে সাফল্যের পরিমাপ ক্রমশ সংখ্যায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে। দ্রুতগতি, প্রযুক্তি ও প্রতিযোগিতার এই দৌড়ে একটি প্রশ্ন বার বার উঠে আসছে— আমরা কি আমাদের মানবিকতাকে ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলছি না? চার পাশে তাকালেই তার প্রমাণ মেলে। রাস্তায় দুর্ঘটনায় আহত মানুষ পড়ে থাকলেও অনেকেই সাহায্যের বদলে মোবাইল ক্যামেরা বার করে দৃশ্য ধারণে ব্যস্ত থাকেন। সমাজমাধ্যমে বিদ্বেষ, কুৎসা ও অপমান যেন স্বাভাবিক অভিব্যক্তি হয়ে উঠেছে। মতের অমিল মানেই আক্রমণ— এই প্রবণতা সমাজকে ক্রমশ অসহিষ্ণু করে তুলছে।
পারিবারিক সম্পর্কেও বদল স্পষ্ট। একই ছাদের নীচে থেকেও আমরা একে অপরের সঙ্গে কথা বলার সময় পাচ্ছি না। শিশুদের বেড়ে ওঠা চলছে স্ক্রিনের সঙ্গে, আর প্রবীণদের জীবনে নিঃসঙ্গতা নিত্যসঙ্গী। ব্যস্ততার অজুহাতে অনুভূতির জায়গা ক্রমশ সঙ্কুচিত হচ্ছে। কর্মক্ষেত্রেও মানবিকতার অভাব চোখে পড়ে। প্রতিযোগিতার চাপে সহকর্মী নয়, সবাই যেন প্রতিদ্বন্দ্বী। মানসিক চাপ বা ক্লান্তি নিয়ে ভাবার সময় নেই। উৎপাদনশীলতার হিসাব আছে, সহমর্মিতার নেই।
প্রযুক্তি অবশ্যই সমস্যার মূল নয়। সমস্যা তার ব্যবহার ও আমাদের অগ্রাধিকারে। প্রযুক্তির মানুষকে কাছাকাছি আনার কথা ছিল, অথচ বাস্তবে অনেককে আরও একা করে দিচ্ছে। ভার্চুয়াল সহানুভূতি কখনও বাস্তব সাহায্যের বিকল্প হতে পারে না। এই পরিস্থিতিতে মানবিকতার গুরুত্ব নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। মানবিকতা কোনও বিলাসিতা নয়, এটি সমাজের ভিত্তি। সহানুভূতি ছাড়া ন্যায়বিচার অসম্পূর্ণ, সংবেদনশীলতা ছাড়া উন্নয়ন নিষ্ঠুর।
উন্নয়নের সঙ্গে মানবিকতার ভারসাম্য না রাখলে সেই উন্নয়ন শেষ পর্যন্ত অর্থহীন হয়ে পড়বে। মানুষই মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি— এই সহজ সত্যটি ভুলে গেলে সভ্যতার অগ্রগতি কেবল সংখ্যার খেলায় সীমাবদ্ধ থাকবে।
সুস্মিতা মল্লিক
বনগাঁ, উত্তর ২৪ পরগনা