যখন আমরা বুঝলাম, এনসিপি ভোট ও জোট রাজনীতিতে ঢুকে গিয়ে আর একটা জামাত বা বিএনপি হতে চলেছে, আমি এবং আমার মতো অনেকেই বেরিয়ে আসি।’’
অনেক গর্জনে শুরু করেও কেন বাংলাদেশের মাটিতে তেমন বর্ষণ হল না এনসিপি-র? কেন আসন্ন নির্বাচনে তারা জামাতের এক দুর্বল জোটসঙ্গী হিসেবেই আটকে গেল? দলের ভিতরের বিক্ষুব্ধ অংশ তার নানা কারণ দেখাচ্ছে। তাজের মতে, প্রথমত, এনসিপি-র রাজনৈতিক নিজস্ব পরিচয়চিহ্ন তৈরি করতে না পারা। কেন তাদের বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রয়োজন, সেই বয়ান তারা তৈরি করতে পারেনি। দ্বিতীয়ত, তাদের সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা ছিল শূন্য। তিন, হাতে গোনা কয়েক জনের উপরে নির্ভরশীলতা। চার, বাংলাদেশের ইতিমধ্যেই পচন লেগে যাওয়া রাজনৈতিক ব্যবস্থার অংশ হয়ে ক্রমশ দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়া।
এনসিপি-র বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ এটাই যে, যেখানে প্রায় তিন কোটি মানুষ জুলাই অভ্যুত্থানে রাস্তায় নেমে আন্দোলন করেছেন, পুলিশের লাঠি-গুলি খেয়েছেন, সেখানে মাত্র জনা পনেরো ছাত্রনেতা তাঁদের প্রতিনিধি হতে পারেন না। যাঁদের নিজেদের মধ্যেই না-ছিল কোনও সমন্বয়, না-ছিল রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা। সাম্প্রতিক সব ক’টি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচনে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে, ওই অভ্যুত্থানের সঙ্গে জড়িত ছাত্রদের কোনও পরিসরই কোথাও নেই। ঢাকা, জাহাঙ্গিরনগর, জগন্নাথ, চট্টগ্রাম এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় দখল করেছে জামাত ছাত্র শিবির। প্রশ্ন উঠছে, দীর্ঘ সতেরো বছর যাদের সমস্ত রকম রাজনৈতিক কার্যকলাপ নিষিদ্ধ ছিল, দেশের সমস্ত দলীয় অফিসে তালা দেওয়া ছিল, তারা রাতারাতি এই ক’মাসের মধ্যে এতটা প্রভাব কী ভাবে ছাত্রমহলে তৈরি করল? ছাত্র রাজনীতি করে শেখ হাসিনাকে দেশ ছাড়া করিয়ে নতুন অভ্যুত্থানে যে লাভ হল, তার কোনও গুড়ই কেন অরাজনৈতিক এবং পরে এনসিপি তৈরি করা ছাত্ররা পেলেন না?
বাংলাদেশের অন্যতম থিংক ট্যাঙ্ক, ‘সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ়’ (সিজিএস)-এর প্রেসিডেন্ট জিল্লুর রহমানের মতে, ‘‘হিসাবটা কঠিন নয়। আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন, ছাত্র লীগের মধ্যে বড় অংশ নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয় গোপন করে শিবিরের লোক ছিলেন। তাঁরা ক্ষমতা বদলের পর স্বমূর্তিতে এসেছেন। ছাত্র লীগের ভিতরেও অন্তর্ঘাত হয়েছে, যা নিয়ে আওয়ামী লীগ নেতা ওবায়াদুল কাদের বার বার সতর্ক করতেন।’’ পাশাপাশি নতুন মঞ্চ করতে যাওয়া ছাত্রদের বক্তব্য, বিপুল টাকা ছাত্র সংসদের নির্বাচনের জন্য খরচ করেছে জামাতের শিবির। এই টাকা কোথা থেকে আসছে, তার কোনও স্পষ্ট হিসাব নেই। জানা যাচ্ছে, শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচনের জন্য জামাত খরচ করেছে ৩০ কোটি টাকা! যা বাংলাদেশে যে কোনও ছাত্র সংগঠনের কল্পনারও বাইরে।
বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক মঞ্চ যে টাকার জোরে রাজনীতি করবে না, সেই কথা স্পষ্ট করে দিচ্ছেন তাঁদের নেতৃত্ব। বরং হাসিনার আমলে যে বাম রীতি একেবারেই মাথা তুলতে পারেনি, তারই বিকাশ ঘটানো লক্ষ্য তাঁদের। যে বিষয়গুলিকে রাজনৈতিক সামাজিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসা হবে, তার মধ্যে রয়েছে দেশের আর্থিক বৈষম্য দূর করা, বেকারত্ব কমানোর মতো বিষয়। সেই সঙ্গে পরিবেশকেও আনা হবে রাজনৈতিক দাবিদাওয়ার পুরোভাগে, যা এর আগে কখনও হয়নি। সুনামগঞ্জের মতো বহু জায়গাই বাংলাদেশে ভূমিকম্পপ্রবণ। পাশাপাশি, তাঁরা ভূ-রাজনৈতিক এবং কূটনৈতিক অবস্থানগত ভাবে ভারতের বিরুদ্ধে ‘আধিপত্যবাদ’-এর অভিযোগে সরব। অন্য দিকে, ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্কে উন্নতির কথা বলবে এই দল। অনীকের কথায়, ‘‘জামাত আসলে সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্কে থাকতে চায়, নিজেদের বাণিজ্য চালানোর জন্য। ২০১৩ সালের পরে নিজেদের ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার বিনিময়ে তারা নিষ্ক্রিয় হয়ে গিয়ে আওয়ামী লীগের সুবিধা করে দিয়েছিল। এনসিপি-ও সেই পথে হাঁটছে বলেই আমরা দল ছেড়ে ভিন্ন দল গঠনের কথা ভেবেছি।’’ (চলবে)