শিল্পের স্বার্থে
মৈত্রীশ ঘটকের ‘যে রাজ্য আছে মাঝখানে’ (১১-২) প্রবন্ধের পরিপ্রেক্ষিতে কিছু কথা। একটা সময় হাওড়া জেলার শিল্পাঞ্চলকে বলা হত ‘ভারতের শেফিল্ড’। এই অঞ্চলের অসংখ্য এঞ্জিনিয়ারিং, ফাউন্ড্রি, কাস্টিং, স্টিল ফেব্রিকেশনের কারখানাগুলোর উৎপাদিত পণ্য গোটা ভারতে শিল্পের চাহিদা মেটাত। ভারী শিল্পের মধ্যে বার্ন স্ট্যান্ডার্ড কোম্পানি লিমিটেড, ব্রেথওয়েট অ্যান্ড কোম্পানি, জেশপ, ডানলপ প্রভৃতি ছিল বাংলার গর্ব।
ভারতের মধ্যে প্রথম মোটরগাড়ি তৈরির কারখানা ছিল হিন্দমোটরে। স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক ভাবে সবচেয়ে এগিয়ে থাকা রাজ্য ছিল পশ্চিমবঙ্গ। সেই সময় এই রাজ্যের মানুষের মাথাপিছু আয় ভারতের অন্য রাজ্যের তুলনায় অনেক বেশি ছিল। কিন্তু তার পর হঠকারী রাজনীতির কারণে বর্তমানে এই ভারী ও মাঝারি শিল্পগুলির পাকাপাকি ভাবে সমাধি হয়েছে এবং স্বাভাবিক ভাবেই এর প্রভাব পড়েছে রাজ্যের অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে। পিছিয়ে গেছে রাজ্যের সামগ্রিক উন্নয়ন। অপর দিকে, আশির দশকে কেন্দ্রীয় সরকারের মাসুল সমীকরণ নীতি এবং শিল্প গড়ার ক্ষেত্রে লাইসেন্স প্রথা পশ্চিমবঙ্গের অর্থনৈতিক উন্নয়নকে আরও পিছিয়ে দিয়েছিল।
নব্বইয়ের দশকের গোড়ায় উদার অর্থনীতির দৌড় শুরু হলে পশ্চিমবঙ্গকে পিছনে ফেলে অন্যান্য রাজ্য দ্রুত এগিয়ে যেতে থাকে। ২০০০ সালের পরবর্তী সময়ে পশ্চিমবঙ্গে আবার একটা শিল্পবান্ধব পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, কিন্তু ধ্বংসাত্মক শিল্পবিরোধী আন্দোলনের ফলে তারও অপমৃত্যু ঘটে। প্রবন্ধকার সঠিক ভাবেই উল্লেখ করেছেন, এত কিছুর পরেও পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতি এখনও ভেঙে পড়েনি, কিন্তু দ্রুত বেড়ে ওঠা রাজ্যগুলির সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোতে পারছে না। সুতরাং আগামী বিধানসভা নির্বাচনে যে দলই ক্ষমতায় আসুক, তাদের প্রথম এবং প্রধান কাজ হওয়া উচিত আমাদের এই সম্ভাবনাময় রাজ্যে শিল্পবান্ধব পরিস্থিতি তৈরি করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করা।
শেষাদ্রি বন্দ্যোপাধ্যায়
ভদ্রেশ্বর, হুগলি
প্রশ্নের মুখে
শ্রীদীপ ভট্টাচার্যের ‘অবিবাহিত, তবুও পেলেন!’ (১৪-২) শীর্ষক প্রবন্ধটিতে একটি বাস্তব চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। বাড়ি ভাড়া নেওয়ার ক্ষেত্রে শুধু অবিবাহিত পুরুষদেরই নন, মেয়েদেরও নানা প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়। এই সব প্রশ্ন কখনও-কখনও ব্যক্তিগত তো বটেই, শালীনতার মাত্রাও ছাড়িয়ে যায়। আবার এমনও দেখেছি, কোথাও কোথাও অন্য ধর্মের মানুষজনকে কিছুতেই ভাড়া দেওয়া হয় না, নানা রকমের ওজর আপত্তি তোলা হয়। শুধু বাড়ি ভাড়া নয়, অন্যান্য ক্ষেত্রেও অবিবাহিতদের সমাজের নানা প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়।
এমনকি দত্তক নিতে গেলে বিবাহিত দম্পতি তুলনামূলক ভাবে যত সহজে সন্তান দত্তক নিতে পারেন, এক জন অবিবাহিত পুরুষ বা নারীর ক্ষেত্রে সেটা অনেক জটিল হয়ে ওঠে। কেউ যদি নিজের ইচ্ছায় অবিবাহিত জীবন যাপন করতে চান, তা হলে সমাজের উচিত নয় তাঁকে উত্ত্যক্ত করা।
সর্বানী গুপ্ত
বড়জোড়া, বাঁকুড়া
সুন্দরবন
ইউনেস্কো স্বীকৃত সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ অঞ্চল জলবায়ু পরিবর্তনের সম্মুখ সারিতে দাঁড়িয়ে। সমুদ্রতল বৃদ্ধির হার এখানে বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় বেশি। নিম্নভূমি উপকূলে সামান্য বৃদ্ধিও ভাঙন, প্লাবন ও লবণাক্ততার ঝুঁকি বহু গুণ বাড়ায়।
গত দুই দশকে ভারতের সুন্দরবন অঞ্চলে প্রায় ১০০-১১০ বর্গকিলোমিটার ম্যানগ্রোভ ক্ষয় হয়েছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। বনহানি মানে শুধু পরিবেশের ক্ষতি নয়; প্রাকৃতিক উপকূল-প্রতিরক্ষা দুর্বল হওয়া। ফল— ঘূর্ণিঝড়ে বাঁধে ভাঙন, কৃষিজমিতে নোনা জলের অনুপ্রবেশ, পানীয় জলের সঙ্কট। ‘আয়লা’, ‘আমপান’, ‘ইয়াস’— প্রতিটি দুর্যোগের পরেই দেখা গিয়েছে, অস্থায়ী মেরামতি দীর্ঘমেয়াদে যথেষ্ট নয়। একটি মূল্যায়নে সুন্দরবনে পরিবেশগত ও স্বাস্থ্যজনিত ক্ষতির আর্থিক পরিমাণ বছরে প্রায় ১,২০০ কোটি টাকার বেশি বলে ধরা হয়েছে। এতে প্রতিরোধমূলক বিনিয়োগ— স্থায়ী, বিজ্ঞানসম্মত বাঁধ, জিয়ো-টিউব, ম্যানগ্রোভ পুনরুদ্ধার প্রভৃতি ব্যয় নয়, প্রয়োজনীয় সুরক্ষা।
কেন্দ্র ও রাজ্য— উভয় স্তরেই বিভিন্ন প্রকল্প ঘোষিত হয়েছে। কিন্তু সুন্দরবনের বিশেষ ভৌগোলিক ঝুঁকি বিবেচনায় একটি সমন্বিত, দীর্ঘমেয়াদি ‘উপকূল সুরক্ষা মিশন’ কতটা কার্যকর ভাবে এগোচ্ছে, তার স্বচ্ছ মূল্যায়ন জরুরি। লবণাক্ততা ও অনিশ্চিত ফলনের কারণে বহু পরিবার পরিযায়ী শ্রমে নির্ভরশীল। সরকারি উদ্যোগে মৎস্য-প্রক্রিয়াকরণ, কোল্ড স্টোরেজ, মূল্য সংযোজন শিল্প ও সমবায়ভিত্তিক উদ্যোগ গড়ে উঠলে স্থানীয় অর্থনীতি শক্তিশালী হতে পারে।
সুন্দরবন রক্ষা মানে শুধু পরিবেশ সংরক্ষণ নয়; এটি অর্থনীতি ও মানবিক দায়িত্বের প্রশ্ন। প্রয়োজন— ১) বিজ্ঞানসম্মত স্থায়ী বাঁধে নির্দিষ্ট ও বাড়তি বরাদ্দ; ২) ম্যানগ্রোভ পুনরুদ্ধার ৩) জীবিকাভিত্তিক শিল্পে বিনিয়োগ; ৪) স্বচ্ছ ব্যয় ও সামাজিক নিরীক্ষা; ৫) কেন্দ্র-রাজ্যের সমন্বিত দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। উন্নয়নের আলোচনায় এই উপকূল যদি প্রান্তে পড়ে থাকে, তবে তা পরিবেশ ও অর্থনীতির ক্ষেত্রেও বড় ব্যর্থতা।
সুজিত পাত্র
পূর্ণচন্দ্রপুর, দক্ষিণ ২৪ পরগনা