পড়াছুটদের উপাখ্যান
বিবিধ খবরের ভিড়ে সহৃদয়তার একখানি খবর নজর কাড়ল— ‘পড়াছুটেরা বাঁচাল পড়তে চাওয়া ছাত্রীকে’ (৪-২)। প্রতিবেদনটি পড়ে মনে এল অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত রচিত ‘ছন্নছাড়া’ কবিতার কথা। বাস্তব অভিজ্ঞতা-পুষ্ট এই লেখনীতে কবি তুলে ধরেছেন ‘এক নেই রাজ্যের বাসিন্দে’ কতিপয় যুবকের মানবিক কর্মের এক মহান দৃষ্টান্ত: মহাসড়কে দুর্ঘটনাগ্রস্ত এক নাম না-জানা ঠাঁইহীন ভিখারির দেহের ধুকপুকানি তখনও বিদ্যমান, তথাকথিত ভদ্র সমাজের গা বাঁচিয়ে চলার বিপ্রতীপে ওই ছন্নছাড়া ছেলের দলই এগিয়ে আসে আহত ব্যক্তিটির উদ্ধারকার্যে। রাস্তায় ধাবমান কবির ট্যাক্সিতে দ্রুত উঠিয়ে নেয় মৃত্যুপথযাত্রী হতভাগ্যকে। আহতের টাটকা রক্তের দাগ থেকে বাঁচতে কবি তড়িঘড়ি নেমে পড়েন গাড়ি থেকে, কিন্তু ছেলের দল ভিখারিকে তুলে নিয়ে ছুটিয়ে দেয় ট্যাক্সি, সোল্লাসে চেঁচিয়ে ওঠে ‘প্রাণ আছে, এখনো প্রাণ আছে’, গন্তব্য নিকটবর্তী হাসপাতাল।
চিকিৎসায় সাড়া দেন গৃহহীন ভিখারি। কবিতার শেষ স্তবকে উল্লেখ আছে, উপলব্ধির মানসলোকে কবি দিনাবসানে প্রত্যক্ষ করেন যে সকালে গলির মোড়ে দেখা একাকী দাঁড়িয়ে থাকা কঙ্কালসার, রুক্ষ, প্রেতসম গাছটিতে এ বারে “বেরিয়ে পড়েছে হাজার হাজার সোনালি কচি পাতা,/ মর্মরিত হচ্ছে বাতাসে।/ দেখতে-দেখতে গুচ্ছে গুচ্ছে উথলে উঠেছে ফুল/ ঢেলে দিয়েছে বুকের সুগন্ধ।” শুভ চেতনা জেগে ওঠার রূপকের এই বিস্তার স্বাভাবিক ভাবেই নিরাশা থেকে আশায় উত্তরণ ঘটায়।
এই কবিতার প্রতি পরতে প্রকাশ পেয়েছে আপাত অশিক্ষিত, বখাটে ছেলেদের প্রতি সভ্য, সুশিক্ষিত সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি, যার আধারে রয়েছে অবজ্ঞা ও অবহেলার নিরন্তর প্রবাহ। কিন্তু এ-হেন ‘ছন্নছাড়া’দের ভিতরে সদাই বহমান টলটলে মানবপ্রেমের ফল্গুধারা। বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখেছি যে, এই যুবারাই আগু-পিছু না ভেবে রাতবিরেতে অসুস্থ বা আহত স্বজন, বন্ধু, প্রতিবেশীদের পাশে দাঁড়ায় ভয়ডরহীন ভাবে।
এই প্রসঙ্গে ব্যক্তিগত একটি ঘটনা উল্লেখ করি: করোনাকালের চূড়ান্ত নিষেধের বেড়া অবজ্ঞা করে এমনই জনা দুই সহৃদয় প্রতিবেশী যুবক আমার বহরমপুর নিবাসী একাকী বৃদ্ধ জেঠামশাইকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া থেকে বাড়ি ফেরার দিন অবধি পাশে থেকেছিলেন নির্দ্বিধায়। পরবর্তী কালে এঁদেরই এক জন প্রাণঘাতী সংক্রমণের কারণে মারা যান।
সুপ্রতিম প্রামাণিক
আমোদপুর, বীরভূম