অধিকারের লড়াই
ভালবাসা যে আসলে স্নেহ, আবেগ, মানসিক সংযুক্তির এক নিঃস্বার্থ অনুভূতি, পরের মঙ্গল কামনায় নিজেকে উজাড় করে দেওয়া, অন্যকে সম্মান করা— সেটা আবার এক বার মনে করিয়ে দেয় স্বাতী ভট্টাচার্যের ‘সকল কাঁটা ধন্য করে’ (১৫-২) শীর্ষক প্রবন্ধটি।
চিরকালীন ছকভাঙা পথের পথিক কমলাদেবী চট্টোপাধ্যায় তাঁর হৃদয়ের ভালবাসা উজাড় করে দিয়েছেন দেশের জন্য। আপন করে নিয়েছেন তাঁদের, যাঁরা সমাজ-সংসার-প্রিয়জনের কাছ থেকে প্রাপ্য সম্মানে বঞ্চিত। ভালবেসেছেন নিজের সত্তাকে। অথচ, তাঁর নিজের জীবনে যন্ত্রণা তো কম ছিল না। প্রায় একশো বছর আগে এই সমাজে এক জন বালবিধবা কন্যা ঘরের কোণে চোখের জল না-ফেলে আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। সমাজের বেঁধে দেওয়া রীতি ভেঙে তাঁর মা তাঁকে স্কুলে ভর্তি করিয়েছেন। তার পর নিজের পছন্দমতো বিবাহ এবং আত্মসম্মান রক্ষার্থে ডিভোর্স, যেগুলো তখনকার দিনে ভয়ঙ্কর এক সাহসী পদক্ষেপ।
ছকভাঙা পথের দিশারি কমলাদেবী চট্টোপাধ্যায় এক দিকে ছিলেন ব্রিটিশ-বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের এক জন ব্যক্তিত্ব ও অগ্নিযুগের নারীবিপ্লবী। অন্য দিকে, তিনি ভারতীয় নারীর আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নতি ও ভোটাধিকারের জন্যও লড়াই করেছেন। প্রথম মহিলা হিসাবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। স্বাধীনতার পর তিনি ভারতীয় হস্তশিল্প, তাঁতশিল্প এবং নাট্যকলাকে পুনরুজ্জীবিত করায় মুখ্য ভূমিকা পালন করেছেন। রাজনীতিতে সক্রিয় ভাবে যুক্ত ছিলেন। আজ একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়েও যেখানে অনেক ক্ষেত্রে নারী শুধুমাত্র সংসারে তাঁর নিজের অধিকারটুকু ছিনিয়ে নিতে ভয় পান, সেখানে এত বছর আগে বার বার সামাজিক প্রথাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে প্রগতিমূলক কাজে নিজেকে ব্যাপৃত করেছেন। ভারতীয় সংস্কৃতি চর্চা থেকে রাজনীতি— দেশের জন্য কারাবরণ থেকে দেশবাসীর অধিকার রক্ষা— নারীবাদের আদর্শ। কমলাদেবীর জীবনী আমাদের সমাজের নারীদের নতুন করে ভাবতে শেখায়— জীবনে ঝড় আসবেই, তবু আত্মসম্মান বজায় রেখে নিজের অধিকার রক্ষার লড়াইয়ে জিতে অসহায়ের পাশে দাঁড়ানো যায়। নারীকে নিজ ভাগ্য জয় করে নিতে হয়। অধিকার নিজের যোগ্যতায় অর্জন করে নিতে হয়।
কেকা চৌধুরী
হরিপাল, হুগলি