নির্বাচনের নির্ঘণ্ট ঘোষণার পর থেকেই হিংসা ও রক্তপাতের আশঙ্কায় কাঁটা হয়ে থাকে রাজ্য। কিন্তু গণতান্ত্রিক উৎসবের আবহে নিঃশব্দে
জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে যে ঝুঁকি তৈরি হয়, তার উৎস সেই প্লাস্টিক দূষণ রোধে এ বার কড়া অবস্থান নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন।
পরিসংখ্যান বলছে, দেশে বছরে উৎপাদিত প্লাস্টিক বর্জ্যের অন্তত দেড় শতাংশ উৎপন্ন হয় কোনও নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। প্রচারের
ঝড়ে অল্প সময়ের ব্যবধানে এই বিপুল পরিমাণ বর্জ্য পরিবেশের শ্বাসরোধ করে। যদিও ২০২২ সালের জুলাই থেকে দেশে এককালীন ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক উৎপাদন ও ব্যবহার আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ, তবুও রাজনৈতিক লড়াইয়ের ময়দানে এখনও তার দাপট অব্যাহত থাকায় উদ্বেগে প্রশাসনিক মহল।
প্লাস্টিকের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনের এই ‘লড়াই’ অবশ্য নতুন নয়। ঘটনাপ্রবাহ বলছে, ২০২২ সালে এককালীন
ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হওয়ার আগে থেকেই এ নিয়ে ধারাবাহিক ভাবে সতর্কবার্তা জারি করেছে কমিশন।
প্রশাসনিক সূত্রের খবর, ১৯৯৯ সালে রাজনৈতিক দলগুলিকে প্রথম বার এ বিষয়ে কড়া চিঠি দেওয়া হয়।
পরে ২০০৩ সালের মে, ২০০৪ সালের মার্চ এবং ২০০৬ সালের মার্চ মাসে পৃথক পৃথক নির্দেশে প্রচার সামগ্রীতে প্লাস্টিক বা পলিথিনের মতো পচনহীন উপাদানের ব্যবহার বন্ধের কড়া বার্তা দেওয়া হয়। ২০১৮ সালের এপ্রিল ও সেপ্টেম্বরে পৃথক নির্দেশিকায় প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়মাবলী যথাযথ ভাবে পালনের উপরেও বিশেষ জোর দিয়েছিল কমিশন।
সংশ্লিষ্ট দফতর সূত্রের খবর, ২০১৯ সালে নির্বাচন কমিশন, কেন্দ্রীয় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রক এবং কেন্দ্রীয় দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের উচ্চপদস্থ
আধিকারিকদের মধ্যে একটি বৈঠক হয়। সেই বছরের অগস্টে জাতীয় পরিবেশ আদালত বা এনজিটি-র পক্ষ থেকে একটি নির্দেশিকায় প্রচারের কাজে ব্যবহৃত পিভিসি এবং ক্লোরিনেটেড প্লাস্টিকের ব্যানার বা হোর্ডিং নিষিদ্ধ করার বিষয়ে বিস্তারিত রিপোর্ট তলব করা হয়।
পরিবেশবিদদের পর্যবেক্ষণ,
নির্বাচনের মরসুমে প্রচারের দাপটে বর্জ্যের স্তূপ কয়েক গুণ বেড়ে যায়, যা মূলত নিকাশি নালা বা নদী বুজিয়ে দিয়ে শহর ও শহরতলির জনজীবন বিপর্যস্ত করে তোলে। পরিবেশ মন্ত্রক সূত্রের খবর, নির্বাচনী প্রচারে ব্যবহৃত কাট-আউট বা হোর্ডিং মূলত পিভিসি দিয়ে তৈরি হয়।
প্রচার শেষে এগুলি যত্রতত্র ফেলে রাখা হয় অথবা পুড়িয়ে ফেলা হয়। যা থেকে নির্গত অত্যন্ত বিষাক্ত গ্যাস কর্কট রোগের কারণ হতে পারে।
এই কারণেই কেন্দ্রীয় পরিবেশ ও বন মন্ত্রকের পক্ষ থেকে সমস্ত রাজ্যের মুখ্যসচিবদের আধা-সরকারি চিঠি পাঠিয়ে বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়। সেখানে প্রাকৃতিক তন্তু,
পুনর্ব্যবহারযোগ্য কাগজ বা জৈব প্লাস্টিকের তৈরি প্রচার সামগ্রী ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
২০২২ সালের জুলাই মাস থেকে প্লাস্টিক কাঠিযুক্ত ইয়ার বাড, বেলুন বা পতাকার প্লাস্টিক কাঠি এবং সাজসজ্জার কাজে ব্যবহৃত থার্মোকল পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হলেও নির্বাচনের সময়ে তার প্রয়োগ রুখতে এ বার কোমর বেঁধে নামছে প্রশাসন।
প্রশাসনিক সূত্রে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়মাবলী অনুযায়ী নির্বাচনী প্রচার সামগ্রী পরিষ্কার করার দায় সংশ্লিষ্ট প্রার্থী বা রাজনৈতিক দলের। যদি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জনবহুল স্থান থেকে এই সমস্ত ব্যানার বা কাট-আউট সরানো না হয়, তবে
স্থানীয় প্রশাসন তা সরিয়ে ফেলবে এবং সেই
ব্যয়ের বোঝা সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর নির্বাচনী খরচের সঙ্গে জুড়ে দেওয়াই রীতি। স্বচ্ছ ও অবাধ নির্বাচনের পাশাপাশি
নিষিদ্ধ প্লাস্টিকের আগ্রাসন রোখাই এখন কমিশনের কাছে ‘অ্যাসিড টেস্ট’।