১৩ জুলাই: লিয়োনেল স্কালোনি বললেন বটে, ‘‘আর একটা ফুটবল ম্যাচ’ কিন্তু সত্যিই কি আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড দ্বৈরথকে কখনও শুধুই ফুটবল ম্যাচ হিসেবে দেখা সম্ভব? ফকল্যান্ডস যুদ্ধ তো আছেই কিন্তু তারও আগে থেকে যে দু’দেশের মধ্যে তিক্ততা চলছে এবং তার প্রভাব সব সময় ফুটবল মাঠেও পড়তে
দেখা গিয়েছে।
বিশ্বকাপেও ফুটবল ছাপিয়ে দু’দেশের মধ্যে উত্তেজনা বা রেষারেষি নতুন কিছু নয়। ১৯৬৬ বিশ্বকাপে আন্তোনিয়ো রাতিনকে দিয়ে শুরু। সে বার ইংল্যান্ডেই হয়েছিল বিশ্বকাপ। ওয়েম্বলিতে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ম্যাচে মাঠ থেকে বহিষ্কৃত করা হয় রাতিনকে। জার্মান রেফারি যখন তাঁকে মাঠ থেকে বেরিয়ে যেতে বলছেন, কিছু বুঝেই উঠতে পারেননি রাতিন। তিনি রেফারির ভাষা জানতেন না। নয় মিনিট ধরে মাঠেই ছিলেন রাতিন, বেরোতে চাননি। অবশেষে যখন তিনি বেরোচ্ছেন, হতাশায় মাঠে ধারে পোঁতা কর্নার ফ্ল্যাগ ধরে মুচড়ে দেন। তাতে আবার ইংল্যান্ডের জাতীয় পতাকা ছিল। মাঠ থেকে বেরোলেও এর পরে রেড কার্পেটে গিয়ে বহু ক্ষণ বসে ছিলেন রাতিন, যা রানির জন্য পেতে রাখা হয়েছিল।
এই ঘটনা নিয়ে পরের দিন ব্রিটিশ প্রেস তীব্র আক্রমণ করে রাতিন এবং আর্জেন্টিনাকে। এই ঘটনার পরেই কার্ড দেখানোর প্রথা আবিষ্কার হয়। তখনকার ফিফা প্রধান কেন অ্যাস্টন ট্র্যাফিক লাইটের অনুকরণে দুই ধরনের সঙ্কেত ব্যবহারের পরামর্শ দেন ম্যাচ চলাকালীন শাস্তিযোগ্য অপরাধ বোঝানোর জন্য। তার পরেই ফুটবলে আসে হলুদ ও লাল কার্ড। ইংল্যান্ডে রাতিনের ঘটনার পরে মেক্সিকোয় ১৯৭০ বিশ্বকাপেই ব্যবহৃত হয় হলুদ ও লাল কার্ড। রাতিন সম্প্রতি মারা গিয়েছেন, তাঁর শোকপালন চলছে আর্জেন্টিনায়। তাতে ছেষট্টি বিশ্বকাপে তাঁকে বার করে দেওয়ার পুরনো স্মৃতি ফিরে এসেছে এবং আর্জেন্টিনীয় সমর্থকদের ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে আরও ফুটিয়ে তুললে অবাক হওয়ার নেই।
রাতিনের ঘটনার আগে থেকেই অবশ্য ফকল্যান্ড দ্বীপপূঞ্জ নিয়ে আর্জেন্টিনার সঙ্গে গ্রেট ব্রিটেনের সংঘাত চরমে। তার আগের বছরেই রাষ্ট্রসঙ্ঘের বৈঠকে এ নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। সকলে স্বীকার করেছে, ফকল্যান্ডস নিয়ে দু’দেশের মধ্যে এই অস্থিরতার সমাধান হওয়া দরকার। দক্ষিণ অতলান্তিকের এক দ্বীপপুঞ্জ ফকল্যান্ড। আর্জেন্টিনা থেকে যার দূরত্ব ৩০০ মাইল, ব্রিটেন থেকে ৮০০০ মাইল। এই দ্বীপপুঞ্জ কার অধীনে, তা নিয়েই দু’দেশের মধ্যে সংঘাত। আর্জেন্টিনার বরাবরের দাবি, ফকল্যান্ডস তাদের দেশ থেকে এত কাছে, তাই এই দ্বীপপুঞ্জ তাদের অধীনে। ব্রিটেন পাল্টা বলে এসেছে, দ্বীপের মানুষেরা তাদের সঙ্গেই থাকতে চায়। ১৯৮২-র ২ এপ্রিল আর্জেন্টিনা তাদের সেনাবাহিনী পাঠায় ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জে। বেশ কিছু অঞ্চল দখলও করে নেয়। ব্রিটেন উত্তর দিতে শুরু করে। ৭৪ দিন ধরে যুদ্ধ চলার পরে আর্জেন্টিনা আত্মসমর্পণ করে। মনে করা হয় সেই যুদ্ধে ৬৪৯ জন সৈনিকের মৃত্যু আজও ভুলতে পারেনি আর্জেন্টিনা। আত্মসমর্পণের ঠিক এক দিন আগে স্পেনে ১৯৮২ বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে বেলজিয়ামের কাছে এক গোলে হেরে যায় আর্জেন্টিনা। পুরো দেশে জোড়া শোকপালন চলতে থাকে। এর পর মিলিটারি শাসকেরা ফতোয়া দেন, বিশ্বকাপ চলাকালীন ‘ইংল্যান্ড’ নামটাও উচ্চারণ করা চলবে না। মনে করো পৃথিবীতে এই দেশটার কোনও অস্তিত্বই নেই। শুধু মুখের কথা নয়, এই আদেশ মানাও হয়েছিল। পশ্চিম জার্মানির বিরুদ্ধে দ্বিতীয় রাউন্ডের ম্যাচ হেরে বিদায় নেয় ইংল্যান্ড, সেই ম্যাচে আর্জেন্টিনার প্রধান সম্প্রচারকের মাধ্যমে ধারাবিবরণী করা হয় পুরো ম্যাচে ‘ইংল্যান্ড’ শব্দটা উচ্চারণ না করে।
মিলিটারি শাসন শেষ হয়ে গণতন্ত্র আসার পরে আর্জেন্টিনীয়রা ফকল্যান্ডস নিয়ে যুদ্ধং দেহি মনোভাব থেকে বেরিয়ে আসতে শুরু করেছিল। নতুন প্রজন্ম যুদ্ধের আগুন, গোলাবারুদের গন্ধ ভুলতে চেয়েছিল। কিন্তু সব কিছু মনে করিয়ে দেন তাদের সব চেয়ে প্রিয় এক ফুটবল তারকা— দিয়েগো মারাদোনা। ১৯৮৬ বিশ্বকাপে সেই মহা বিতর্কিত ম্যাচে ইংল্যান্ডকে হারানো নিয়ে যিনি পরে আত্মজীবনীতে লিখেছিলেন, ‘‘ওদের দল নয়, মনে হয়েছিল সে দিন ওদের দেশটাকে হারিয়েছিলাম।’’ মারাদোনার স্মৃতি মানে ফকল্যান্ডস যুদ্ধেরও স্মৃতি। ফকল্যান্ডস যুদ্ধের সময় তিনি অর্থসংগ্রহের জন্য রাস্তাতেও নেমেছেন। শোনা যায় ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ছিয়াশি বিশ্বকাপের সেই ম্যাচ খেলতে নামার আগে টানেলের মধ্যে তিনি সতীর্থদের উদ্দেশে বলেন, ‘‘ইংরেজরা আমাদের ভাইদের, সন্তানদের, আত্মীয়দের মেরেছে। ওদের ছাড়া যাবে না।’’ মেক্সিকোর অ্যাজ়টেকা স্টেডিয়ামে এর পরে নেমে তিনি ‘হ্যান্ড অব গড’ এবং শতাব্দীর সেরা গোল করে একাই ইংল্যান্ডকে চূর্ণ করেন। অনেক বছর পরে তিনি বলেছিলেন, ‘‘খেলতে খেলতে সেদিন ফকল্যান্ডস যুদ্ধের কথা মাথায় ঘুরছিল। এটা কোনও ভাবেই শুধু একটা ফুটবল ম্যাচ হতে পারে না। আমার অনেক ছোট ছোট ভাইদের ওরা মেরে ফেলেছিল, তাদের ছোট পাখির মতো মারা হয়নি নিশ্চয়ই। ওই ম্যাচটা ছিল বদলা নেওয়ার ম্যাচ।’’
স্কালোনি যা বলছেন, মারাদোনা বেঁচে থাকলে নিশ্চয়ই বলতেন না। এবং, এ বারের বিশ্বকাপেও যে ভাবে মারাদোনাকে বুকে বেঁধে নিয়ে সব সময় চলছেন আর্জেন্টিনীয়রা, তাতে মনে হচ্ছে ইংল্যান্ড ম্যাচের আগেও মারাদোনার চোখ দিয়ে ইংল্যান্ডকে দেখতে চাইবেন। ওরা আমাদের ভাইদের মেরেছিল, ওদেরও হারাও। ইংল্যান্ডকে সামনে পেয়ে সেই সৈনিকদের মৃত্যুমিছিলের ছবিটাই হয়তো ভেসে উঠবে তাঁদের চোখের সামনে। মারাদোনা যা মনে করিয়ে দিয়েছিলেন প্লেয়ার্স টানেলে। ফকল্যান্ডস যুদ্ধে হারের অপমানের জ্বালা ফের ফুটবল মাঠে মেটানোর সুযোগ হিসেবে দেখতে চাইবে তারা। বলা হয়, আর্জেন্টিনার হৃদয়ে তিনটি ‘এম’। মারাদোনা, মেসি ও মালভিনাস (ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের আর এক নাম)। যুদ্ধ থেমে গিয়ে থাকতে পারে কিন্তু যুদ্ধের মেজাজ এখনও ঠান্ডা হয়নি। এই একটা দলের বিরুদ্ধে যিনি জানপ্রাণ দিয়ে লড়াই করবেন, সহজে ইংরেজদের সামনে মাথা ঝোঁকাবে না, তিনিই দেশবাসীর কাছে নায়ক। আন্তোনিয়ো রাতিন যে রেফারির আদেশের পরেও মাঠ ছাড়তে চাননি, ৯ মিনিট সেখানেই দাঁড়িয়ে ছিলেন, কর্নার ফ্ল্যাগ দুমড়ে দিলেন, কারও তোয়াক্কা না করে রানির জন্য নির্দিষ্ট রেড কার্পেটে গিয়ে বসে পড়েছিলেন— এ সবের জন্য তিনি জাতীয় নায়ক হয়ে উঠেছিলেন। মৃত্যুর পরেও যে কারণে আর্জেন্টিনীয়রা বলছেন— রাতিন, তুমি অমর হয়ে থাকবে।
তুলনায় অনেক শান্তশিষ্ট স্বভাবের লিয়োনেল মেসি ড্রেসিংরুমে ফকল্যান্ডস নিয়ে মারাদোনার মতো ডাকাবুকো বক্তব্য রাখবেন না, এমন ভাবার কারণ নেই। ২০১৪ ব্রাজ়িল বিশ্বকাপের আগে স্লোভেনিয়ার বিরুদ্ধে একটি ফ্রেন্ডলি খেলেছিল আর্জেন্টিনা। সেই ম্যাচের আগে আর্জেন্টিনা দল একটি ব্যানার তুলে ধরেছিল, যাতে লেখা ছিল— ‘ফকল্যান্ডস আর্জেন্টিনার’। মাসচেরানো, ম্যাক্সি রদ্রিগেস সেই ম্যাচে খেলছিলেন। মেসি এবং দি’মারিয়া না খেললেও তখন বেঞ্চে বসেছিলেন রিজ়ার্ভ হিসেবে। ফুটবল মাঠে এ ধরনের রাজনৈতিক বার্তা দিলে ফিফা শাস্তি দেয়। সে দিনও আর্জেন্টিনার মোটা জরিমানা হয়েছিল। কিন্তু সব জেনেশুনেও ফকল্যান্ডস নিয়ে তাদের মনের কথা গোপন রাখেননি ফুটবলাররা এবং মেসিও তার সমর্থক ছিলেন। এ বারে মেসির জন্য প্ররোচনাও থাকছে। ইংল্যান্ড ও চেলসির প্রাক্তন ডিফেন্ডার জো কোল বলেছেন, ‘‘আমাদের (ইংল্যান্ডের) যা গতি আছে, আর্জেন্টিনা পেরে উঠবে না। মেসিকে ঘুম পাড়িয়ে রাখতে পারি আমরা। আর্জেন্টিনার থেকে ইংল্যান্ড ভাল টিম।’’ মেসি নিশ্চয়ই কোলকে জবাব দিতে চাইবেন। আর এক জন পিয়ার্স মর্গ্যান। বরাবরের ঘোষিত মেসি-বিরোধী এবং রোনাল্ডোর ভক্ত। তিনি আরও এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে মন্তব্য করেছেন, ‘‘মেসির চেয়ে জুড বেলিংহ্যাম অনেক বড় তারকা।’’
সেমিফাইনালে তাদের বিখ্যাত আকাশি-নীল ও সাদা জার্সি পরে খেলছে না আর্জেন্টিনা। বদলে নীলের উপর কাজ করা জার্সি পরে নামছে। তা নিয়ে অনেকে মন্তব্য করেছেন, জার্সি বদল করা অশুভ হবে না তো? এ বারের বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা ফুটবলের ‘থিম’টাই হচ্ছে ‘মেসিদোনা’। হৃদয়ে মেসি এবং মারাদোনা মিলেমিশে একাকার। যত গান গাইছেন আকাশি-নীল ও সাদার সমর্থকেরা, সবেতেই দুই মহাতারকার উপস্থিতি।
সেমিফাইনালে সামনে ইংল্যান্ড পড়ায় এর সঙ্গে তৃতীয় ‘এম’ ইতিমধ্যেই যোগ হয়ে গিয়েছে। এতদিন তাঁরা গাইছিল ‘মারাদোনার জন্য, মেসির জন্য কাপ চাই’। ক্যানসাস সিটি থেকে গাইতে শুরু করেছে— ‘মারাদোনার জন্য, মেসির জন্য, মালভিনাসের
জন্য কাপ চাই’।
শুধুই ফুটবল ম্যাচ? আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ড? কে বিশ্বাস করবে!