দাদাভাই, জিতে গিয়েছি আমি!” বলে বছরচারেক আগে হর্ষধ্বনি দিয়ে উঠেছিল আমার খুড়তুতো বোন সোহিনী। উচ্চ মাধ্যমিকে বিজ্ঞান নিয়ে পড়ে যথেষ্ট নম্বর পাওয়া সত্ত্বেও কাকু-কাকিমার সঙ্গে ওকে জব্বর লড়াই করতে হয়েছিল ফাইন আর্টস নিয়ে স্নাতক স্তরে পড়ার জন্য। ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে না পড়লে ‘ভবিষ্যতে পাপের আঁধার, নেই কো কোথাও আলো’-ধরনের পঙ্ক্তি, উপমা হাজার বার বুঝিয়েও মেয়ের কাছে শেষ পর্যন্ত হার মানতে বাধ্য হয়েছিলেন সোহিনীর বাবা-মা। দেখেছিলাম, সোহিনী স্প্রিংয়ের মতো লাফাচ্ছিল ছাদে। ওর দু’চোখে আনন্দাশ্রু। সরকারি আর্ট কলেজে প্রথম দিন ক্লাস করার পরে যে ছবিটা তুলেছিল, ওয়টস্যাপে সেটা ওর ডিপি হয়ে বেঁচে ছিল দিব্যি। ছবিটা পাল্টে গেল বছরখানেক আগে। হাসিখুশি সোহিনীর মুখের জায়গায় এসেছিল কালো পর্দায় লাল প্রশ্নবোধক চিহ্ন। কারণ জিজ্ঞেস করাতে বলেছিল, “ও কিছু না, দাদাভাই।”
অন্তিম সিমেস্টারের ফলাফল ঘোষণা হওয়ার দিন ফোন করেছিল আমায়। চার বছর কী তাড়াতাড়ি উবে গেল উদ্বায়ী কর্পূরের মতো! আমি ‘হ্যালো’ বলার পরে ফোনের ওদিকে প্রথমে কয়েক সেকেন্ডের নিস্তব্ধতা। তার পরেই হাউহাউ করে কাঁদতে শুরু করল সোহিনী।
“সব শেষ হয়ে গেল, দাদাভাই। অনন্ত অপেক্ষা করা ছাড়া আমার আর কোনও উপায় রইল না। শিট! মা বাবার কথা কেন শুনলাম না আগে!”
“কী হয়েছে সোহিনী? গলার স্বর এরকম কেন? হোয়াট ইজ় রং?”
“একটা বদ্ধ সুড়ঙ্গের মধ্যে আটকে পড়েছি। কোথাও একটু আলো নেই। বরফঠান্ডা অন্ধকার। কী করব আমি এখন? কী করব আমরা এখন?”
“কেন? মাস্টার্স করবি না?”
“কোনও গন্তব্য ছাড়াই আরও দুটো বছর দৌড়ে বেড়াব উন্মাদের মতো? আমরা যে হঠাৎ করে গারবেজ ব্যাগের ময়লা হয়ে গেলাম, দাদা।”
“এমন ভাবে বলছিস কেন? কোনও চাকরি পাচ্ছিস না? তোর তো ভীষণ শখ ছিল পেন্টার হওয়ার, ইলাস্ট্রেটর হওয়ার। শারদীয়া সংখ্যা কিনে অন্যরা গল্প-উপন্যাসে ডুবে যেত, আর তুই ঠায় চেয়ে থাকতিস প্রচ্ছদের দিকে। মনে পড়ে? বইমেলায় শুধু প্রচ্ছদ পছন্দ হয়ে যাওযার জন্য বই নিয়ে বিলিং কাউন্টারে চলে যেতিস, কী করে ভুলি সেই সব!”
“ওই সব ব্যাড মেমরিজ় আর নয় দাদাভাই, প্লিজ়। ওই শখ আমায় শেষ করল। এই অদ্ভুত, বিটকেল, অসভ্য টেকনোলজি আমার শখগুলোকে শেষ করল। আমাদের হেরো বানিয়ে দিল। কত জায়গায়, কত মাস ধরে চাকরি খুঁজছি জানো? চাকরির সন্ধান দেওয়ার বাহারি অ্যাপগুলো মোবাইলের পর্দায় বালিঘড়ি ঘুরিয়ে, স্ক্রিনের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে প্লেন উড়িয়ে, জাহাজ চালিয়ে কয়েক সেকেন্ড পরে জানান দেয়— স্যরি, নো ম্যাচ ফাউন্ড।”
“তুই তো ফ্রেশার। এত সহজে অধৈর্য হলে চলে? জীবন যে অনেক বড়।”
“জ্ঞান দিয়ো না প্লিজ়। অন্য একটা ফেক প্রোফাইল তৈরি করে এই ডিগ্রির পরে মাস্টার্স জুড়েছি, বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের আরও কয়েকটা সার্টিফিকেট কোর্স, ডিপ্লোমা অ্যাড করেছি। অভিজ্ঞতা বারো বছর বাড়িয়ে দিয়েছি। কী আশ্চর্য! তার পরেও বলে— নো ম্যাচ ফর দ্য টাইম বিয়িং। বেটার লাক নেক্সট টাইম।”
“বিভিন্ন খবরের কাগজ, পাবলিকেশন হাউস, ম্যাগাজ়িনে বায়োডেটা পাঠিয়ে দেখেছিস?”
“কিছুই বাকি রাখিনি, দাদাভাই। বেশির ভাগ জায়গা থেকে কোনও উত্তর আসেনি। আর যারা উত্তর দিয়েছিল, লিখেছিল, ‘অ্যাপ্লাই করার জন্য ধন্যবাদ। তবে আনন্দের সঙ্গে জানাই, আমাদের এই পুরো বিভাগটি এখন এআই দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। ফলে বাড়তি শিল্পীর দরকার নেই।’ ভাবতে পারো? এক জনের ইমেল সিগনেচারে ফোন নম্বর দেওয়া ছিল। আমার তো হারানোর কিছু নেই আর। চিৎকার করে জিজ্ঞেস করলাম, তা হলে আমরা করবটা কী বলতে পারেন? চার বছর ধরে এই পড়াশোনা কি বেকার হয়ে গেল? লোকটা ওদিক থেকে ফ্যাচফ্যাচ করে হেসে বলল, ‘ইউ আর জাস্ট আ ফুল, বেবি গার্ল। বোকামো করেছ, মূল্য তো দিতে হবেই। হ্যাভ আ গ্রেট ফিউচার অ্যাহেড।’ বলে আরও দু’বার ওই বিচ্ছিরি ফ্যাচফ্যাচানির পরে ফোনটা কেটে দিল।”
“তা হলে উপায়?”
“আমি বাঁচতে চাই দাদা। আমরা বাঁচতে চাই। একটা বিরাট বড় সর্বনাশ হতে চলেছে। কেউ কি বুঝতে পারছে না?”
*****
অজানা নম্বর থেকে এখন দিনে যে ফোনগুলো পাই, তার এক তৃতীয়াংশ রোবটের। ফোনের অন্য প্রান্তে যে বসে রয়েছে সে মানুষ না রোবট, তা বুঝতে বুঝতে বেলা বয়ে যায়। মানুষ ভেবে আমি কথা বাড়াই। ঠকে যাই। এমনই একটি সাম্প্রতিক কথোপকথন ভাগ করে নিতে খুব ইচ্ছে করছে।
“আমি কি (নিস্তব্ধতা) মিস্টার (নিস্তব্ধতা) আমলান (নিস্তব্ধতা) কুসুমচক্রবর্তী (নিস্তব্ধতা) জি-র সঙ্গে কথা বলছি?”
“বলছি। বলুন।”
“এই কলটি করা হচ্ছে এবিসি ইনশিয়োরেন্স সংস্থার তরফ থেকে। আমি কি আপনার কিমতি সময়ের দু’ মিনিট পেতে পারি?”
“এ আবার কী ধরনের বাংলা? কিমতি সময় মানে? কথাও ঠিক করে বলতে পারেন না? যত্তসব।”
“দুঃখিত। আপনার আগের কথাগুলোর অর্থ আমি বুঝতে পারলাম না। আমি কি আপনার কিমতি সময়ের দু’মিনিট পেতে পারি?”
“আবার এক কথা! যা বলার, স্পষ্ট করে বলুন।”
“আশা করি আপনি আমার কথা স্পষ্টভাবে শুনতে পাচ্ছেন। আমি কি আপনার কিমতি সময়ের দু’মিনিট পেতে পারি?”
“বলুন, বলুন। যত সব উটকো ঝামেলা।”
“এগিয়ে যাওয়ার বার্তা দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ। অনুগ্রহ করে জানান বাংলা, হিন্দি না ইংরিজি— কোন ভাষাতে আপনি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবেন।”
“ইয়ার্কি করছেন আমার সঙ্গে? এতক্ষণ ধরে কি উর্দুতে কথা বলছিলাম? অদ্ভুত মহিলা তো আপনি।”
“দুঃখিত। আপনার এইমাত্র বলা কথাগুলো আমার আগের প্রশ্নের উত্তর নয়। অনুগ্রহ করে জানান বাংলা, হিন্দি না ইংরিজি— কোন ভাষায় আপনি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবেন।”
“বাংলা, বাংলা, বাংলা! এবারে কিন্তু আমি রেগে অগ্নিশর্মা হয়ে যাচ্ছি।”
“দুঃখিত। অগ্নি শর্মা নয়, এই কলটি করা হচ্ছে মিস্টার (নিস্তব্ধতা) আমলান (নিস্তব্ধতা) কুসুমচক্রবর্তী (নিস্তব্ধতা) জি-কে। আমি কি তাঁর সঙ্গেই কথা বলছি?”
“দূর ছাই! অম্লানকুসুম এইমাত্র পটল তুলেছেন। যত সব আপদ!”
“দুঃখিত। আপনার আগের কথাগুলোর অর্থ আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না। কথা এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য অনুগ্রহ করে আপনার নামটি
কনফার্ম করুন।”
“অ্যাই! তুমি রোবট নাকি রে?”
“দুঃখিত। নাম সংক্রান্ত নিশ্চয়তা না পাওয়ার জন্য কলটি আর এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। আপনার কিমতি সময় দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।”
একই দিন। কথোপকথন দুই। আগের ফোনের ঘণ্টাদুয়েক পর।
“নমস্কার স্যর। আমি কি অম্লানকুসুম চক্রবর্তীর সঙ্গে কথা বলছি?”
“বলছি।”
“নাম সংক্রান্ত নিশ্চয়তা দেওয়ার জন্য আপনাকে প্রথমেই অজস্র ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই। কলটি করা হচ্ছে ডিইএফ ইনশিয়োরেন্স কোম্পানি থেকে। আমরা কি তিন-চার মিনিট কথা বলতে পারি?”
“আবার সেই রোবটের খপ্পরে পড়লাম। আবার! হে ভগবান!”
“আগের কথাগুলোর অর্থ আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না, স্যর। আমরা কি তিন-চার মিনিট কথা বলতে পারি?”
“আগে বলুন, আপনি কি রোবট?”
“আগের কথাগুলোর অর্থ...”
“চোপ! একদম চুপ। তুই রোবট না মানুষ?”
“দিনের শেষে রোবটই তো।”
“স্যরি। আমি কোনও রোবটের সঙ্গে কথা বলি না। এই কলগুলো আমার জীবন কয়লা করে দিল।”
“দুঃখিত। আগের কথাগুলোর অর্থ আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না। প্রসঙ্গত জানাই, কলটি রেকর্ড করা হচ্ছে ফর ট্রেনিং অ্যান্ড কোয়ালিটি পারপাসেস। আমরা কি তিন-চার মিনিট কথা বলতে পারি?”
“এই এআই রোবট এসে সব গোগ্রাসে গিলবে। কোনটা যে মানুষ বোঝা দায়।”
“গিলবে বললেন কেন? গিলছে তো। স্যর, ও স্যর! কোনও রোবট কি আপনাকে কখনও এভাবে ডাকবে? এবার তো বিশ্বাস করুন অন্তত।”
“আমার ইনশিয়োরেন্সের প্রয়োজন নেই।”
“চাকরিটা হয়তো আর থাকবে না স্যর। একটু ভেবে দেখুন না।”
“বললাম তো আমার প্রয়োজন নেই। তাও জ্বালাচ্ছেন কেন?”
“আপনার মূল্যবান সময় দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ। বলছিলাম, একটু ভেবে দেখা যেত না?”
ফোনটা কেটে দিয়েছিলাম। ওপাশে দীর্ঘশ্বাসের শব্দ ছিল। সঙ্গে কি মিশে ছিল ক্রন্দনধ্বনিও?
*****
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কী কী কাজ করতে পারে ভাবতে বসলে স্তম্ভিত হতে হয়। বরং উল্টো হিসাব অনেক সোজা। কী করতে পারে তা না ভেবে, কী কী করতে পারে না তা জানার চেষ্টা করলে খাটনি কমে। মনের মধ্যে বিবেক ডোরবেল বাজায় হঠাৎ। যন্ত্রদাস হয়ে যাওয়ার প্রলোভন থেকে নিজেকে কী ভাবে মুক্ত রাখতে পারি? এক বিখ্যাত প্রযুক্তিবিদের সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকার থেকে ধার করে বলা যেতে পারে, “পারবেন না। কিছুতেই পারবেন না। জল থেকে তুলে রাখা মাছের মতো খাবি খেতে খেতে মরে যাবেন। বড় বেদনাময় সেই মৃত্যু।”
এতটুকু লেখার মধ্যে অন্তত পঁচিশ বার আমায় হাঁক দিয়েছে ডকুমেন্ট এডিটিং সফ্টওয়্যারের মধ্যে পুরে দেওয়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার টুল। এরা নিজেদের সহকারী চালক হিসেবে দাবি করে। ক্রমাগত বলতে চায়, ‘তুমি শুধু স্টিয়ারিং ধরে বসে থাকো, ক্যাপ্টেন। চোখ বুজে থাকো। বাকি সব কাজ আমার উপরে ছেড়ে দাও।’
এআইয়ের কাজের একটি খতিয়ান দেওয়া যাক। ইমেল লেখা, কোনও রিপোর্ট তৈরি করা, নির্দেশিত বিষয়ে শব্দসংখ্যা মেপে মুহূর্তে গল্প-উপন্যাস-প্রবন্ধ-কবিতা লেখা, সামাজিক মাধ্যমের পোস্ট লিখে দেওয়া, খবর লেখা, রিপোর্ট বিশ্লেষণ, শিক্ষকতা, গবেষণাপত্র তৈরি করা কিংবা কালীপ্রসন্ন সিংহের ‘মহাভারত’-সম গবেষণাপত্রকে ‘ক্ষণিকা’-র কোনও কবিতার মতো সারাংশ করে দেওয়া, ওয়েবসাইট তৈরি করা, চলচ্চিত্রের স্ক্রিপ্ট লেখা, পোস্টার-লোগো-ব্যানার-ছবি তৈরি এবং এডিট করা, পডকাস্ট করা, সিনেমার সাবটাইটল সৃষ্টি, ভ্রমণের পরিকল্পনা করে দেওয়া, কুইক কমার্স অ্যাপে মাসকাবারি বাজারের প্ল্যান করা, মান্থলি শপিং বাস্কেটে আগে কেনা কিন্তু এ বারে ভুলে যাওয়া কোনও সামগ্রীর কথা মনে করানো, অনুবাদ করা, দোভাষীর কাজ করা, কুইজ়, ধাঁধা, শব্দছক তৈরি এবং তার সমাধান, অনিঃশেষ কল সেন্টার হয়ে গিয়ে ক্রমাগত ফোন করে যাওয়া, পরীক্ষার প্রশ্নপত্র তৈরি এবং উত্তরপত্র পরীক্ষা— এই তালিকা অন্তহীন।
নামজাদা বিদ্যালয়ের পাতাজোড়া বিজ্ঞাপন বলে এআই এন্যাবল্ড ক্লাসরুমের কথা, আধুনিক হাসপাতাল জানান দেয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্য নেওয়া রোবটিক সার্জারির কথা, বহুজাতিক খাবারের সংস্থা বলে এআই ব্যবহার করে গুণমানে সেরা কাঁচামাল সংগ্রহ করার কথা। এত কিছু জানার পরে মনে যে প্রশ্নের উদয় হয় তা হল— মানুষের জন্য তা হলে আর রইলটা কি? এই বিষয়ে ক্রমাগত সমীক্ষা হয়ে যাচ্ছে, বিশ্ব জুড়ে।
ওয়াকিবহাল শিবিরের বিভিন্ন লোকের সঙ্গে কথা বলে, আন্তর্জালের এক উইন্ডো থেকে অন্য উইন্ডোয় পাড়ি দিয়ে, বিভিন্ন সংস্থার সমীক্ষার রিপোর্ট পড়ার পরে মনের মধ্যে ধোঁয়াশার মেঘ আরও ঘন হল ক্রমশ। এক দলের মতে, এআইয়ের জমানায় সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ যে কাজগুলো হতে চলেছে তা হল ডেটা এন্ট্রি, কাস্টমার সাপোর্ট এবং পুনরাবৃত্তিমূলক ক্ল্যারিকাল কাজ। সাধারণ হিসাব রাখা কিংবা রিপোর্ট তৈরির কাজগুলোও এই বন্ধনীতে ঢুকবে। বেকারত্বময় এই ৮৩০ কোটি মানুষের দুনিয়ায় কত জন এই সামান্য কেরানিগিরি করেন তার একটা খোঁজ নেওয়া যাক। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী, ক্ল্যারিকাল সাপোর্ট ওয়ার্কার অর্থাৎ কেরানি মানুষের সংখ্যা মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৮-১০ শতাংশ। অঙ্কের সহজ হিসাব বলে, সারা পৃথিবীর প্রায় ২৮ থেকে ৩৫ কোটি মানুষ চাকরি-সংক্রান্ত অনিশ্চয়তায় ভুগতে শুরু করবেন খুব তাড়াতাড়ি। পৃথিবীর যাবতীয় সংস্থায় কি এআই ইমপ্লিমেন্টেশন হবে? যদি হয়, কবে? ‘দ্য স্টেট অব এআই: গ্লোবাল সার্ভে ২০২৫’ নামক ম্যাকিনসের একটি রিপোর্ট বলছে, প্রায় ৮৮ শতাংশ বাণিজ্যিক সংস্থা অন্তত একটি বিভাগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার ইতিমধ্যেই শুরু করে দিয়েছে। আর এআইকে দিয়ে আরও বড় পরিসরে কাজ করছে, এমন সংস্থার পরিমাণ প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ। এই প্রযুক্তির ম্যাজিক-ক্ষমতার কথা আঁচ করতে পেরে বিশ্বের প্রায় ৯৩ শতাংশ সংস্থা এর ব্যবসায়িক প্রয়োগ নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা শুরু করে দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, এই অদ্ভুত আঁধারে যাঁদের টিকে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, তাঁদের মধ্যে পড়বেন চিকিৎসক, নার্স, ফিজ়িয়োথেরাপিস্ট, বিজ্ঞানী, ইলেকট্রিশিয়ান, প্লাম্বার, মেকানিক, আইনজীবী ও বিচারকরা। তবে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, এই ‘সেফ জ়োন’ নামক বন্ধনীর মধ্যে থাকা মানুষরাও স্বস্তিতে আছেন, ভাবতে শুরু করলে ভুল হয়ে যাবে বিলকুল।
এক এমবিবিএস, প্রৌঢ় ডাক্তারবাবুকে বলতে শুনেছিলাম, “আমাদের দিন মনে হয় শেষ হতে চলল ক্রমশ। এখন রোগীরা কী করছে জানো? উপসর্গ বলে এআই প্ল্যাটফর্মকে জিজ্ঞেস করছে, কোন টেস্ট করাব বন্ধু? টেস্ট রিপোর্ট পেয়ে সেটাও আপলোড করছে ওখানে। অ্যানালিসিসের পর ওই প্ল্যাটফর্ম বাতলে দিচ্ছে, তুমি অমুক স্পেশালাইজ়েশনের কোনও ডাক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করো। সাধারণ সর্দিজ্বর, পেটখারাপ, মাথাব্যথার রোগীরা ধীরে ধীরে গায়েব হয়ে যাচ্ছে। এ বারে আমার কী উপায়?”
কোন কাজে কতটুকু এআইয়ের ব্যবহার আমাদের সম্মিলিত বিবেকের গ্রিন সিগনাল পেয়ে এগিয়ে যেতে পারে, এ নিয়েও কলহ শুরু হয়েছে বিস্তর। মৌলিক গবেষণাপত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নিয়ে ওয়াকিবহাল শিবিরের মানুষরাই কার্যত দ্বিখণ্ডিত। অনেকে বলছেন, “গুচ্ছগুচ্ছ বই পড়ে রেফারেন্স সংগ্রহের কাজটি যদি এআই করে দিতে পারে, তাতে দোষ কোথায়? তথ্য সংগ্রহের উপদেশ দেওয়ার ব্যাপারে প্রোজেক্ট গাইডের ভুল হতেই পারে। তাঁরা মানুষ তো! থেকে যেতে পারে মিসিং লিঙ্ক। এআই সেই ভুল করবে না কখনও।”
অন্য পক্ষের লোকেরা বলছেন, “বই খুঁটিয়ে নিজে না পড়ে, নোট সংগ্রহ না করলে সেই গবেষণার কোনও মৌলিকত্ব থাকে না।”
এক পক্ষ অন্য পক্ষকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখাচ্ছেন ক্রমাগত। হার্ড ওয়ার্ক ও স্মার্ট ওয়ার্কের মধ্যেও শুরু হয়েছে এক অনন্ত তরজা। তবে এরই মধ্যে তৈরি হয়ে যাচ্ছে প্রচুর গবেষণাপত্র। মানুষেরা ডক্টরেট হচ্ছেন, পাওয়ার্ড বাই এআই।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দাপটে কত মানুষ ইতিমধ্যেই কাজ হারিয়েছেন, তার সংখ্যার মধ্যে মিশে রয়েছে জমাট ধোঁয়াশা। লোক ছাঁটাইয়ের ঘোষণাগুলো কস্ট কাটিং, রিস্ট্রাকচারিং, ডাউনসাইজ়িং, স্মার্টসাইজ়িং, ট্রিমসাইজ়িং—এমন বেশ কিছু জার্গনে সম্পৃক্ত হয়ে থাকে। কোনও সংস্থা কলার তুলে শুধুমাত্র কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রয়োগের জন্য কর্মচারীদের পাকাপাকি ভাবে ছুটি দেওয়ার কথা ঘোষণা করে। প্রকাশ্যে প্রেস রিলিজ় দিয়ে জানান দেয়। অধিকাংশ সংস্থাই এই কাজটি করে চুপিসাড়ে। একসঙ্গে, একলপ্তে অনেক লোকের চাকরি বাতিল করলে ক্যাম্পাসের বাইরে টেলিভিশনের বুম ক্যামেরার ভয় থাকে। ভাইরাল ভিডিয়োর জন্ম হয়। আমেরিকান আউটপ্লেসমেন্ট ফার্ম ‘চ্যালেঞ্জার, গ্রে অ্যান্ড ক্রিসমাস’-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে অগস্ট মাস পর্যন্ত সে দেশে মোট ঘোষিত লে-অফের ২২ শতাংশ হয়েছে শুধুমাত্র কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রয়োগের কারণে। আমেরিকায় এ বছরে চাকরি গিয়েছে প্রায় ৫ লক্ষ ৩০ হাজার জনের। এর মধ্যে ১ লক্ষ ১৬ হাজার ছিনিয়ে নিয়েছে এআই। গত বছরে এই ছিনিয়ে নেওয়ার হার ছিল মোট খোয়া যাওয়া চাকরির মাত্র ১.২ শতাংশ।
জানা গিয়েছে, সবচেয়ে বেশি চাকরি খোয়া গিয়েছে তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে। আমেরিকায় ঠিক এর পরেই রয়েছে পরিবহণ সংক্রান্ত চাকরি লোপাট হওয়ার খবর। লাইনে এর পরে দাঁড়িয়ে রয়েছে স্বাস্থ্য, হেলথকেয়ার অ্যান্ড অ্যালায়েড সার্ভিসেস। বিশ্বের তাবড় তথ্যপ্রযুক্তিক্ষেত্র, সামাজিক মাধ্যম এবং অনলাইন খুচরো বিপণির সংস্থাগুলো থেকে সম্প্রতি মুছে গিয়েছে প্রায় ১,১৫,০০০ স্থায়ী চাকরি। কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ক অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন এবং অটোমেশন। ভারতের ছবিও কম শোচনীয় নয়। ২৫ থেকে ৩৫ হাজার চাকরি উধাও হয়ে যাওয়ার জন্য অপেক্ষারত। বছর পেরোতে না পেরোতেই তা গায়েব হয়ে যাবে। পড়ে থাকবে শূন্য চেয়ার।
অনেকে বলছেন, “এ তো হিমশৈলের চূড়ামাত্র। পিকচার আভি বাকি হ্যায়।”
সাহিত্যজগতের উপরেও কি প্রভাব ফেলতে শুরু করে দিয়েছে এআই? সম্প্রতি বিতর্কে জড়িয়েছেন জামির নাজির। ২০২৬ সালের কমনওয়েলথ ছোটগল্প সম্মানের প্রাপক ত্রিনিদাদের এই সাহিত্যিক। পুরস্কার ঘোষণার পরেই সামাজিক মাধ্যমে ঝড় ওঠে, জামিরের লেখা এআই এডিটিংয়ে সম্পৃক্ত। নড়েচড়ে বসে তদন্ত শুরু করে কমনওয়েলথ ফাউন্ডেশন। লেখকের ব্যক্তিগত নোট, লেখার খসড়া-সহ আরও বিভিন্ন নথি যাচাই করে শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্তে আসা হয়— না, সরাসরি এআই ব্যবহার করেননি তিনি। জানা গিয়েছে, স্বাস্থ্যের কারণে অ্যান্ড্রয়েড ফোনে ‘স্পিচ টু টেক্সট’ সফ্টওয়্যারের সাহায্য নিতেন জামির। সেই সফ্টওয়্যার মুখের কথা শুনে টাইপ করার ক্ষেত্রে ভুল করত ক্রমাগত। আর প্রতিটি ভুলের জন্য জামির তা সংশোধন করতে বাধ্য থাকতেন। ক্রমাগত এডিটের পরিমাণ দেখে ভ্রু কুঁচকেছে এআই ডিটেক্টর। তাঁর লেখাকে লাল কার্ড দেখিয়েছে, তাঁকে অপদস্থ করেছে। তবে প্রযুক্তির সঙ্গে এই যুদ্ধে শেষ পর্যন্ত জিতে গিয়েছেন তিনি। পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হওয়ার পরে মুখ খুলেছেন জামির। জানিয়েছেন, এআইয়ের মাধ্যমে লেখা এবং এআইকে সহায়ক প্রযুক্তি হিসেবে ধরে নিয়ে লেখার মধ্যে মূল পার্থক্য কোথায়, তাঁর সঙ্গে ঘটে যাওয়া এই ঘটনা সাধারণ মানুষকে স্পষ্টভাবে বুঝতে সাহায্য করবে। তবে জামিরের এই বক্তব্যে সন্তুষ্ট হননি সাহিত্যজগতের সঙ্গে যুক্ত বহু মানুষ। বিতর্কের ঢেউ এখনও বহমান। খবরের কাগজ থেকে জানতে পেরেছি, পরবর্তী বই প্রকাশের আগে এখনও কিছুটা ইতস্তত করছেন ষাটোর্ধ্ব এই সাহিত্যিক।
এক জগদ্বিখ্যাত তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থার সিইও সম্প্রতি বলেছেন, “এআইয়ের নিয়ন্ত্রণ এমন হতে হবে যা এই প্রযুক্তি কোন প্রেক্ষাপটে ব্যবহার করা হচ্ছে, তা বিবেচনায় রাখে।”
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পর্কে প্রেমে ডগমগ, বাৎসল্যপূর্ণ, ভয়ঙ্কর কিংবা অতি ভয়ঙ্কর— যত রকমের উক্তি কিলবিল করছে আন্তর্জালে ও সামাজিক মাধ্যমে, তার মধ্যে সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক লাগল এটাই। এআই দিয়ে দুনিয়াকে কতটা বধ করব আর কতটুকুই বা বধ্য হব, তার রাশ কি তা হলে আমাদেরই হাতে? মধ্য-তিরিশের এক জার্মান তরুণ তাঁর ব্যক্তিগত ব্লগে লিখছেন, “গাড়ি নিয়ে দশ-বারো বার ঘুরে আসা কোনও বন্ধুর বাড়িও চিনতে পারি না আজকাল, জিপিএস সাহায্য না করলে। কোপাইলট ছাড়া লিখতে পারি না দু’-তিন লাইনের ইমেলও। সামান্য বড় কোনও চার্ট দেখলেই মাথা ঝিমঝিম করতে থাকে। দু’-তিনশো শব্দের বেশি কিছু পড়তে হলে ঘোরতর অসুস্থ বোধ করি। আমি কি কোমায় চলে যাচ্ছি ক্রমশ?”
মনোরোগ-বিশেষজ্ঞরা সমস্বরে বলে উঠছেন, “সারা দুনিয়ার মানুষদের মনের মধ্যে যে মেঘ ঘন হচ্ছে প্রতিদিন, তা হল আসলে কগনিটিভ সারেন্ডার। নিজেদের স্বাভাবিক চেতনাকে যন্ত্রের কাছে সমর্পণ করছি আমরা। নিজেকে যতটা বিশ্বাস করছি, তার থেকে অনেক বেশি আস্থা রাখছি যন্ত্রে। মানুষের নতুন সংজ্ঞা হল বোধবুদ্ধিলুপ্ত এক বায়োলজিক্যাল মাস।”
সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘এইট্টিজ়’-এর ছবির দাপট দেখে আমার পাড়ার ‘স্টুডিয়োকাকু’ টানা তিন দিন তাঁর দোকান খুললেন না কেন কে জানে! জানতে পেরেছিলাম, ভয়ঙ্কর গুম মেরে রয়েছেন তিনি। শিশুর মতো কাঁদছেন বাড়িতে। চতুর্থ দিনে দোকান খুলে একটা বোর্ড ঘেন্না মিশিয়ে ছুড়ে ফেলে দিয়েছিলেন রাস্তায়, সজোরে। সেই ক্ষয়াটে বোর্ডে লেখা ছিল— ‘এখানে যত্নসহকারে পুরনো ছবি রিস্টোর করা হয়।’
উন্নতি তো দেখতে পাচ্ছি প্রতিদিন। এই যান্ত্রিক উন্নতি নিজেকে ক্রমশ ছোট হতে শেখায়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার হড়পা বানে তলিয়ে যেতে বাধ্য করে কালান্তক গভীরে। সপ্তাহান্তের ছুটির পর সোমবার অফিসে এসে উন্মুখ হয়ে থাকতাম অপঠিত মেলগুলো পড়ার জন্য। মুখবন্ধ চিঠির মতো প্রতিটি ইমেলের মধ্যেই তো রহস্য লুকিয়ে থাকে। একটি অত্যাশ্চর্য বিষয় ঘটে চলেছে গত কয়েক মাস হল। মেলবক্সের মাথায় জ্বলজ্বল করে বট্, মানে রোবট। বলে, ‘না পড়া মেলগুলোর সামারি বানিয়ে দিই?’
‘হ্যাঁ’ বলেছিলাম এক সোমবার। জুলজুল করে দেখলাম, কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ২৭৩টি অপঠিত ইমেলের সারাংশ বানিয়ে দিয়েছে ওই রোবট। প্রায়োরিটি ঠিক করেছে। কোনগুলো শুধু আমায় তথ্য দেওয়ার জন্য আর কোন ইমেলগুলো আমার উত্তর আশা করে, সারাংশের গায়ে তার তকমা লাগিয়েছে। শেষ প্রায়োরিটিতে ছিল এক অধস্তন কর্মীর রেজ়িগনেশন লেটার। স্বয়ংক্রিয় সারাংশে স্টিকি নোটের মতো লেখা ছিল, ‘ও গেলে কোনও ক্ষতি নেই। তোমাকে ওর পাঠানো শেষ ১০০টি ইমেল কুইক স্ক্যান করে বলতে পারি, ও আউটডেটেড এবং ফাঁকিবাজ। ‘প্লিজ় লিভ’ বলে উত্তর দিয়ে দিই আমি?’ ছেলেটি ওর মৃত্যুপথযাত্রী বাবার ক্যানসারের সঙ্গে লড়ছিল গত তিন মাস। এআই কি মানুষের ব্যথা বোঝে? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধুমাত্র উত্তর দেওয়াতেই থেমে থাকছে না এআই। চাইছে মানুষের হয়ে কোনও কাজ কিংবা অ্যাসাইনমেন্ট শেষ করে দিতে। এই ‘শেষ’ কিংবা সমাপ্তির হাতে কি রক্ত লেগে থাকে?
প্রযুক্তির শিশিরে দিনরাত ভেজার পরে দিনের শেষে সেই প্রযুক্তিরই নিন্দা করলে চলে না। সাজেও না। তবে যে নয়া প্রযুক্তির এবং জমানার জন্ম দিয়েছি আমরাই, সে যখন আমাকেই আমি মানুষ কি না তার প্রমাণ দিতে বলে, মনের মধ্যে তুমুল কুডাক ডাকে বইকি। ‘প্রুভ দ্যাট ইউ আর আ হিউম্যান’। কিংবা, কয়েকটা প্রশ্নের উত্তর দিয়ে টিক মারতে হয় ‘আই অ্যাম নট এ রোবট’ লেখা চেকবক্সে। প্রতিদিনের এই অগ্নিপরীক্ষার কোনও শেষ নেই আপাতত।
তবে প্রবলভাবে এআই-স্নাত হওয়ার পরে সারা শরীরে বলিরেখা প্রকট হয়েছে যে মানুষদের, তাঁরা দাবি করছেন, তথ্যগুলো সর্বসমক্ষে তুলে ধরা হোক অন্তত। এআইয়ের হাত ধরে চলতেই পারে আধুনিক সময়ের সিনেমা। তবে যে দৃশ্যগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে নির্মিত, ফ্রেমের নীচে এক কোণে তা উল্লেখ করে দিতে অসুবিধে কোথায়? যন্ত্রচালিত বিজ্ঞাপনী ফোনের শুরুতেই কেন বলে দেওয়া হবে না— এটি একটি রোবট-নিয়ন্ত্রিত কল? যে গ্রাফিক্স, ইলাস্ট্রেশন, ছবি, ভিডিয়ো ছাপা হচ্ছে কিংবা পোস্ট করা হচ্ছে সবার জন্য, তাতে এআই ব্যবহৃত হলে তার উল্লেখ কোন যুক্তিতে বাধ্যতামূলক করা হবে না? অন্য প্রান্তে মানুষ আছে ভেবে ‘কী অসামান্য নির্মাণ!’ বলে হাততালি দেব আমরা, আর সেই প্রাণোচ্ছল শব্দ গিলে খাবে যন্ত্রের রোবটিক কান! কেন? মানুষের সৃষ্টি জানতে পারলে আকাশচেরা হাততালি দেওয়ার অধিকার তো আমাদেরও রয়েছে। এআইয়ের সাহায্য নেওয়া সাহিত্যে কিংবা গবেষণাপত্রে যান্ত্রিক শব্দগুলোকে অন্য ধরনের ফন্টে ছাপা যেতে পারে। এই ব্যবস্থা হওয়া উচিত স্বয়ংক্রিয় ভাবে। সঙ্গীতের ট্র্যাকে যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহৃত হচ্ছে, সেখানে এক বার মৃদুস্বরে ট্রিং করে আওয়াজ হোক না!
সামাজিক মাধ্যমে যে ছবি কিংবা খবরের জন্ম দিয়েছে এআই, সেগুলোর চলন-বলন-ফ্রেমের ধরন অন্য রঙের, অন্য রকমের হতে পারে। কোনও সংস্থার সামগ্রিক কাজে রক্তমাংসের মানুষ এবং রোবটের অনুপাত কত— শেয়ার ট্রেডিং পোর্টালে কোম্পানির স্ক্রিপ্টের সঙ্গে দেওয়া বাধ্যতামূলক তথ্যের মধ্যে যদি এটিও দেওয়া থাকত, বেশ হত। আহা, বেশ হত।
কিছু মানুষের মনের আকাশে এমন কয়েকটি হিজিবিজবিজ প্রশ্ন ঘুড়ির মতো ওড়ে আজকাল। আকাশ অংশত মেঘলা। সামাজিক ভাবে বেকুব বনে গিয়েও সুতোতে টান মারেন তাঁরা। যান্ত্রিক হাওয়ার সঙ্গে যুদ্ধ করে ঘুড়ি তীব্রবেগে এগিয়ে যায় আরও কিছুটা পথ। কয়েক সেকেন্ড। বাজ পড়ার মতো আওয়াজ ওঠে হঠাৎ— ‘ভোকাট্টা। দুয়ো মুখপোড়া। দুয়ো হেরো।’
তাঁরা হাল ছাড়েন না। বিমর্ষ লাটাই তাঁদের চেতনার ওমে প্রাণ ফিরে পায় আবার।
ছবি: রৌদ্র মিত্র