মণ্ডপে অধিষ্ঠাত্রী বাঙালির প্রাণের দেবী দুর্গা দশপ্রহরণধারিণী, সিংহবাহিনী জননী, মহিষাসুর বধ তাঁর মূর্তির কেন্দ্র। কিন্তু দেবী বঙ্গে শুধুই অসুরদলনী নন, তিনি আনন্দদায়িনীও। তাঁর সঙ্গে আসে সন্তানসন্ততি, দুই দেবীকন্যা লক্ষ্মী-সরস্বতী, দেবপুত্র সিদ্ধিদাতা গণেশ ও দেবসেনাপতি কার্তিকেয়— নিজ নিজ বাহনাদি-সমেত। বাঙালির দুর্গামূর্তি এক মিশ্র রূপ, জ্যোতির্ময়ী পরমাপ্রকৃতির প্রতিরূপের পাশাপাশি তাঁকে ঘরের মেয়ে উমারূপেও কল্পনা করা হয়। লক্ষণীয়, বাঙালির এই পরিচিত আকারের সঙ্গে ভারতের অন্যত্র পূজিতা দুর্গা বা দেবীর অন্যান্য শক্তিরূপের বিগ্রহের পূর্ণ সাদৃশ্য নেই। জম্মুতে বৈষ্ণোদেবী, উত্তর ভারত জুড়ে মা শেরাওয়ালি, হরিদ্বারে মায়া দেবী, রাজস্থান-মহারাষ্ট্রে মাতা ভবানী, গুজরাতে অম্বা, বিন্ধ্যাচলে বিন্ধ্যবাসিনী, কর্নাটকে চামুণ্ডেশ্বরী ও জয়দুর্গা, কন্যাকুমারিকায় কন্যাকুমারী— সকলেরই বিগ্রহের আলাদা বৈশিষ্ট্য। উত্তর ভারতের ত্রিকূট পাহাড়ে বৈষ্ণোদেবী বিরাজিতা গুহামধ্যে। তিনি সেখানে লক্ষ্মী, সরস্বতী, মহাকালীর প্রাকৃতিক শিলাখণ্ড বা পিণ্ডিরূপে পূজিতা। কুমায়ুনে দেবীর পরনে লালবস্ত্র, মাথায় উচ্চ মুকুট এবং তিনি সিংহ নয়, বহু ক্ষেত্রে এলাকার রক্ষক-প্রতিভূ ব্যাঘ্রে আরূঢ়া— মা শেরাওয়ালি। দেবী কোথাও যুদ্ধের শক্তি, কোথাও পাহাড় অরণ্যের বিপদ থেকে রক্ষা করেন, কোথাও গ্রামদেবী, কোথাও উর্বরতার প্রতীক, মঙ্গলময়ী। দেবীর এই বিচিত্র বহুরূপের শিকড় শুধু শক্তি-তত্ত্বই নয়, তা একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের কল্পনারও প্রতিবিম্ব।
সুজলাশ্যামলা বঙ্গদেশের অধিবাসীরা রণং দেহি স্বভাবের নন বলেই খ্যাত, তাঁরা পলল মৃত্তিকার ন্যায় নম্র, সংবেদনশীল। আদ্যাশক্তি মহামায়াকে ঘরের মা-মেয়ের কোমল রূপে দেখা বাঙালির একান্ত নিজস্ব সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য। শরৎ-হেমন্তে ফসল তোলার সময় বাবা-মায়ের ঘরে আসে প্রিয় কন্যা। সঙ্গে আসে তার স্বামী ও ছেলেমেয়েরা। দেবী দুর্গার পূজাও সেই আঙ্গিকেই বাঙালির মিলনোৎসবে রূপান্তরিত হয়। তাঁকে নিয়ে রচিত হয় আগমনী গান। দেবীর মূর্তিতেও তাই যুদ্ধবাসরে মহিষাসুরের বিনাশের সঙ্গে সন্তানসন্ততিপূর্ণ পারিবারিক রূপটিও বিকশিত। অন্য দিকে, হিমালয়ের কোলে দেবীকে খুঁজে নিতে হয় দুর্গম প্রকৃতিরূপে। গ্রামদেবী কোথাও পূজিতা জঙ্গলের ধারে, কোথাও কাঠ বা পাথরের প্রতীকে এলাকার অভিভাবক। গুজরাতে অম্বামাতার পরম্পরায় নবরাত্রি উদ্যাপন নৃত্য ও আলোর উৎসব, মানুষের বৃত্তাকার নাচ যেন দেবীকে কেন্দ্র করে সমাজের একত্রিত হওয়ার দৃশ্যপট। দক্ষিণ ভারতে আবার মহিষাসুর বধের পর দেবীর রূপ প্রচণ্ড, বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা ও সোনার হাওদায় হাতিতে চড়িয়ে দেবীর উৎসবের উদ্যাপন চলে, যা দাক্ষিণাত্যের রাজকীয় ঐতিহ্যের স্মারক। ছত্তীসগঢ়ের ডোঙ্গরগড়ে বম্লেশ্বরী দেবী দুর্গার এক শক্তিরূপ হিসাবে পূজিতা হন। সিঁদুরে রাঙানো অলঙ্কার-ভূষিতা ও পুষ্পসজ্জিতা দেবীমূর্তিটি বিশেষ দর্শনীয়। চৈত্রে ও শারদীয়া নবরাত্রিতে উঁচু পাহাড়ের মন্দিরে ভক্তসমাগম এবং জ্যোতিঃ-কলস প্রজ্বলনের রীতি দেবী-আরাধনার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। উদুপি জেলার কুঞ্জরুগিরির পাহাড়ে পূজিতা দুর্গা চতুর্ভুজা, পদ্মের বেদিতে আসন— চার হাতে শঙ্খ, চক্র, ধনুক ও পিনাক; দশভুজার চেয়ে তিনি স্পষ্টতই আলাদা। দেশের বহু এলাকাতেই পুরাণের মহিষাসুরমর্দিনীর বা পার্বতীর সঙ্গে স্থানীয় মাতৃদেবীর উপাসনা মিশেছে, কোথাও প্রাচীন স্থানীয় ঈশ্বরী বৃহত্তর দেবী-পরম্পরার সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। ইতিহাস, ভূগোল, লোকায়ত সংস্কৃতি, মানুষের দৈনন্দিন জীবনের দুঃখ-কষ্ট প্রয়োজন, ভয়-ভরসা— সব মিলিয়ে দেবীর এই বিবিধ রূপ নির্মাণ।
তবে এলাকাভেদে প্রতিমার রূপ বদলালেও কেন্দ্রীয় শক্তির ধারণাটি একই থেকেছে, কোথাও সেই শক্তি অসুরদমনের, কোথাও প্রাকৃতিক দুর্জয় শক্তি, কোথাও মানুষে মানুষে মিলনের, যূথবদ্ধতার। চণ্ডীপাঠেও ব্যক্ত, দেবী কখনও উগ্র, কখনও কোমলমতি শান্তা, কখনও সৃষ্টিস্বরূপা। এই বৃহত্তর দেবী-ভাবনাকেই ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ নিজেদের নৃতত্ত্ব, সমাজ, ভৌগোলিক ক্ষেত্র অনুযায়ী বিভিন্ন নামে ও রূপে গ্রহণ করেছে। এখানেই ভারতের বৈশিষ্ট্য: স্থানীয় ধারাকে অস্বীকার না করে বৃহত্তর বিশ্বাস ও সাংস্কৃতিক পরিসরের সঙ্গে তাকে যুক্ত করা। তাই আজকের ভারতে যখন সাংস্কৃতিক পরিচয়কে একমাত্রিক করার চেষ্টা হয়, মনে করা দরকার দেবী দুর্গা কেমন ভাবে সাংস্কৃতিক বহুত্বেরও প্রতীক। তাঁর অচিন্ত্য-রূপই বলে দেয় সংস্কৃতির সৌন্দর্য শুধু একটিমাত্র রঙে নয়, নানা রঙের বিচ্ছুরণে।