অব্যবস্থায় মহা-বিপর্যয়
করেন এবং তার ফলে এই ঘটনা ঘটেছে বলে প্রাথমিক ভাবে জেনেছি। মৃত দু’জনের পরিবারের তরফে বলা হয়েছে, বেসরকারি রক্ষী ছিল। তাঁরা বাঁশি বানানোয় হুড়োহুড়ি শুরু হয়।” মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেছেন, “আমাদের অগ্রাধিকার, ২৫ জন জখমকে সুস্থ করা, চিকিৎসা পরিষেবা দেওয়া। ২৪ জনের অবস্থা স্থিতিশীল। এক জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। ১৭ জন মৃত। তদন্ত হবে। যা ব্যবস্থা নেওয়ার নেব। শোক জানানোর ভাষা নেই। চোরবাগানের পুজো বন্ধ করা হয়েছে। ক্লাব কর্তৃপক্ষ, বেসরকারি রক্ষী, যারা ওখানে দায়িত্বে ছিলেন, তাঁদের থানায় আটক করা হয়েছে। ঘটনাস্থল ফরেন্সিক ও দমকলের আধিকারিকদের তুলে দেওয়া হয়েছে। আগামী কাল কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে যে সব কর্মসূচি ছিল, স্থগিত করা হয়েছে। আমরা সবাই রয়েছি।”
পদপিষ্ট হওয়ার খবর পেয়েই ঘটনাস্থলে পৌঁছয় বিশাল পুলিশ বাহিনী। সঙ্গে দমকল কলকাতা পুলিশের বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী। শুরু হয় উদ্ধারকাজ। বন্ধ করে দেওয়া হয় চোরবাগানের ঠাকুর দেখা। ছড়িয়ে পড়ে উত্তেজনা। বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন এক দল মানুষ। তাঁরা অভিযোগ জানাতে থাকেন দুর্ঘটনার সময় সাহায্যের জন্য. কাউকে পাওয়া যায়নি। পুলিশকেও দেখা যায়নি। পরে পুলিশ ওই বিক্ষোভকারীদের
সরিয়ে দেয়।
পুলিশ সূত্রের খবর, ঘটনার সূত্রপাত চোরবাগান পুজো মন্ডপের বাহির গেটের কাছে। সেই সময়ে বৃষ্টি পড়ছিল। মনে করা হচ্ছে তাতেই দর্শনার্থীদের ভিড় বাইরে বেরোনো থমকে যায়। এ দিকে বাইরের থেকে লোকজন ভিতরে ঢুকতে চায় বৃষ্টির থেকে বাঁচতে। এর ফলে ওই ঘটনা ঘটেছে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে পুজোর সন্ধ্যায় বৃষ্টির ঘটনা নতুন কিছু নয়। এর থেকে অনেক বেশি বৃষ্টি বহু ঘটেছে। তাতে এই ভিড় সামলাতে ব্যর্থতার ব্যাখ্যা অনেকের কাছে সন্তোষজনক নয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের থেকে জানা গিয়েছে, বৃষ্টির জন্য প্রচুর দর্শনার্থী মণ্ডপে ঢুকে পড়েন। ভিতরের দর্শনার্থীরাও বৃষ্টির জন্য মণ্ডপ ছেড়ে বেরোতে চাইছিলেন না। ভিড়ের চাপে ধাক্কাধাক্কি, হুড়োহুড়ি শুরু হয়। তার ফলে অনেকে পড়ে যান। তাঁদের উপর দিয়ে চলে যান অনেকে। ভিড়ের চাপে ধাক্কাধাক্কিতে প্রস্থান দরজার কাছে মণ্ডপের এক জায়গা ভেঙে যায়। বহু মানুষ জখম হন। অনেকে অচৈতন্য হয়ে পড়েন।
জখমদের উদ্ধার করে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। উদ্ধারকাজে হাত লাগান স্থানীয় বাসিন্দারা। অনেক জখমকে উদ্ধার করে প্রতিবেশীরা তাঁদের বাড়িতে নিয়ে যান। জল দেন। স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, ‘‘আমরা পাশেই থাকি। হঠাৎ এই মণ্ডপ থেকে চিৎকার-চেঁচামিচি শুনে ছুটে এসে দেখি ভিড়ের চাপে পদপিষ্টের ঘটনা ঘটেছে। আমরা উদ্ধারকাজে হাত লাগাই।’’ তবে এত বড় দুর্ঘটনার পরেও চোরবাগান পুজো কমিটির কাউকে ঘটনাস্থলে খুঁজে পাওয়া যায়নি। পরে ফোনে পুজো কমিটির এক সদস্য বলেন, ‘‘প্রবল বৃষ্টির কারণে বহু দর্শনার্থী মণ্ডপে ঢুকে পড়ায় এই দুর্ঘটনা ঘটেছে।’’
জখম দর্শনার্থীদের উদ্ধার করে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের জরুরি বিভাগে নিয়ে যাওয়া হয়। একাধিক জনের শরীরের বিভিন্ন অংশে আঘাত রয়েছে। ইমার্জেন্সি মেডিক্যাল অফিসার ছাড়াও শল্য, অস্থি শল্য বিভাগের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের নিয়ে আসা হয়েছে। হাসপাতালের বিভিন্ন আধিকারিকদেরও জরুরি বিভাগে পাঠানো হয়েছে চিকিৎসার তদারকির জন্য। কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের সমস্ত বিভাগের ইউনিট ইনচার্জ এবং অন্যান্য চিকিৎসকদের জরুরি ভিত্তিতে ডেকে আনা হয়েছে। বৈঠকের সিদ্ধান্ত মোতাবেক কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ থেকে অনেক আহতকে নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজে স্থানান্তরিত করা হচ্ছে বলে খবর।
এ দিন সন্ধ্যায় ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায় একের পর এক অ্যাম্বুল্যান্স আসছে। আহতদের উদ্ধার করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে হাসপাতালে। মণ্ডপের পাশের রাস্তা সঙ্কীর্ণ হওয়ায় উদ্ধারকাজ করতে কিছুটা অসুবিধা হয়। মণ্ডপের প্রস্থান দরজাগুলির কাছে চটি-জুতো, ব্যাগের স্তূপ। মণ্ডপে জমে থাকা ব্যাগগুলির মধ্যে থেকে বান্ধবীর ব্যাগ খুঁজছিলেন জ্যাক তরফদার। বিধস্ত জ্যাক বলেন, ‘‘তিন বান্ধবীকে নিয়ে চোরবাগানের ঠাকুর দেখতে এসেছিলাম। বাইরে প্রবল বৃষ্টি হচ্ছিল। তাই কেউ মণ্ডপের বাইরে বেরোতে চাইছিলেন না। বাহির গেটের সামনে ভিড় জমে যায়। সেই ভিড়ের উপরে পিছন থেকে আর একটি ভিড় এসে পড়ে। এর ফলে বহু লোক পদপিষ্ট হয়ে যান। আমার তিন বান্ধবীও পদপিষ্ট হয়েছেন। কোনও রকমে তাঁদের বহু লোকের তলা থেকে উদ্ধার করেছি। আমারও আঘাত লেগেছে।’’ তাঁর তিন বান্ধবী কথা বলার মতো পরিস্থিতিতে নেই। উত্তর কলকাতায় ‘চোরবাগান সর্বজনীন’ দুর্গাপূজা মণ্ডপে দুর্ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পক্ষ থেকে একটি টোল ফ্রি হেল্পলাইন চালু করা হয়েছে, যার নম্বর ১৮০০৩৪৫৫৬৭৮ দুর্ঘটনা সংক্রান্ত তথ্য পাওয়ার জন্য এই নম্বরে
ফোন করুন।