মফস্সলের গলি একা।
উৎসবের ক্ষণস্থায়ী আলোয়, মানুষ ও গাড়ির সহাবস্থানে সে নিজের একাকী,
বিষণ্ণ জায়গাটি রেখে দেয়। একটু বাড়ির গাছ, একটু ছায়া, দু’পাশে বাড়ির মধ্যে আচ্ছন্ন, নিরিবিলি। পুজোর দুপুরে যখন পাড়ার লাউডস্পিকার ও কলরব কিছুটা বিশ্রাম নেয়, রোদ পড়ে আসে বা শেষ রাতে পদধ্বনি মিলিয়ে যায়, সে জেগে ওঠে, পড়ে থাকে একলা চেহারায়। পুজোর, উৎসবে সে অনিবার্য, আনন্দে অনিবার্য যে বিষণ্ণতা, হারানোর ভয়ে, বা জীবনের সম্মিলিত বেদনার ভারে, গলিটিও তেমন অনিবার্য। সে না হলে পুজো হয় না। এ কি তার একলাপনা না একাকিত্ব?
কদমগাছের তলায় পাতা বেঞ্চিতে যে যুবক খেতে বসল এইমাত্র, ৪০ টাকার থালায় ভাত, ডাল, মাছ, তরকারি দিচ্ছি বলে দোকানির গর্বকে উপেক্ষা করে বলল, ‘‘আমাকে ভাবতে হয়, এই টাকাও আমাকে ভাবতে হয়, মাছ দিও না’’, সে নস্যাৎ করে দিল সব পুজোর রোদ। তার পাশেই ভাঁড়ের চা আর বিড়িতে টান দিয়ে যে মধ্যবয়সি ফোনে চেঁচিয়ে বলছে, হ্যাঁ হ্যাঁ আমি টাকাটা পাঠিয়ে দিচ্চি এইমাত্র, সে দুশ্চিন্তায় বিড়বিড় করছে আপনমনে, বলে দেওয়াই যায়, পুজোয়
তাদের কেনাকেটা নেই এক ভয়ঙ্কর অশান্তি শুধু।
দুই কন্যা। ক্লান্ত শরীরে রেস্তরাঁয় ঢুকে একটাই নিরামিষ থালি অর্ডার দেয় ২০০ টাকা। একটাতেই হবে। বলে দু’জনে। ওয়েটার বলেন, এর পর কিন্তু ভাত ছাড়া চাইলে কিছু আর পাবেন না। অগত্যা দু’টি থালি। শুকনো মুখ আরও ক্লিষ্ট হয়। খিদে জানে, পুজোর মুখে সে আরও বাড়বে। শুধু নিজেরই নয়, মা পাখির জন্য যেমন অপেক্ষা করে একাধিক হাঁ করা ছানা-মুখ, তেমনই চার পাশের খিদে গিলে খেতে আসবে। বেদনা, দুঃখ, শোক ছাপিয়ে
সে শুধু খিদে।
মণ্ডপে আরতির আলো, হোমের ধোঁয়া, ঢাকের শব্দ, সবের মধ্যে যে মুখটার দিকে তাকিয়ে প্রাণপণে প্রার্থনা করে যায় যে বিশ্বাসী-অবিশ্বাসী প্রিয়জনের মঙ্গল কামনায়, সে জানে জীবনের একটা বড় ম্যাচ হেরে সে খেলতে নেমেছে। ফিল্মে দেখায় বটে দুষ্টের দমনের সঙ্গে দুর্গার অসুরদলনী রূপ, বেজে ওঠে স্তোত্র, সে জানে অনেক হারলে তবে একটা জয় আসলেও আসতে পারে। অপমান, পরাজয়, ভীরুতা সব চামড়ার ভিতরে ঢুকে বর্মের মতন হয়ে গিয়েছে। তাকে চলতেই হবে পা মেপে। ওই উজ্জ্বল মুখের দিকে তাকিয়ে সে কী চাইবে সাহস, একটা, অন্তত একটা জিত? শান্তি না হোক, অন্তত স্বস্তি।
—আমার এক পরিচিতকে মেরে ফেলেছে তার বর, পণের জন্য। তোমরা কিছু করতে পারবে?
—আগে থানায় যেতে বল।
—ডায়েরি করেছে। লোকটা অ্যারেস্টও হয়েছে। সরকারি চাকুরে, অনেক পয়সাও। আমার পরিচিতের কেউ নেই, অসুস্থ বাবা।
—দেখ, এর পর পুলিশ কী করে। তার পর জানাস।
কী নিস্পৃহ কথোপকথন।
—কী আর করব? কী আর করা যাবে?
—পয়সা নেই? তা হলে তো পরে কী হবে, বলা মুশকিল। ভাল উকিল দিতে পারবে না। লোকটি জামিন পাবে।
তার পর? জীবন পাতা ওল্টায় এবং অন্যত্র বিপ্লবী সাজার চেষ্টা করে।
গুড়ওয়ালা, ও গুড়ওয়ালা— যে বালক ফোনে এই নামে সুর করে ডাকে তার পরিচিত যুবককে, তার ‘ডাকঘর’ পড়ার বয়সই হয়নি। গল্প সে শোনেওনি। কিন্তু এই ডাকে যে একাকিত্ব, আকুলতা, সে পেল কোথা থেকে? তার অসুখ নেই। অ-সুখ আছে।
পুজো এই কোনও মুখকেই বদলায় না। কিছুই বদলায় না যে।
পুজো জীবনকে খোপে খোপে রাখে, যার যেখানে থাকার।
সুখ, স্বস্তি, দুঃখ, আনন্দ, অভাব, খিদে, বেকারত্ব, বেদনা, শোক। নিজেদের খোপে থেকেই তারা পুজো দেখে বা দেখে না।
আর আনন্দ, স্বস্তি যদি খোপ থেকে বেরিয়ে সাপটে নেয় দুঃখকে, অভাবকে, তা হয়ে ওঠে উৎসব।
দশ হাতের খ্যাতি পাওয়ার ফাঁদ কাটিয়ে একটি মেয়ে, একটি মানুষ হেঁটে যায় রোজ।
তাকে জোর করে মণ্ডপে টেনো না। সে যেন নিজের ঘরটিতে
থাকতে পারে।
অঙ্কন: অমিতাভ চন্দ্র