জাতির অগ্নিপরীক্ষা
পর্যটনের অতি পরিচিত ঠিকানা কাশ্মীরের পহেলগাম ও পার্শ্ববর্তী বৈসরন উপত্যকা। সন্ত্রাসের ভয়াবহতায় কাশ্মীরের স্বাভাবিক জনজীবন ক্ষতবিক্ষত দীর্ঘ দিনই। সময়ের চাকা এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি কিছুটা পাল্টেছিল। বিগত প্রায় এক দশক ধরে ভূস্বর্গে ফের ভ্রমণপ্রিয় মানুষের আনাগোনা চলছে। নিরাপত্তাজনিত সংশয়ের মেঘ যে অনেকটাই সরেছে, ট্রেন-উড়ানের টিকিট ও হোটেলের চড়া মূল্য আর সমাজমাধ্যমে চোখ বোলালে তা সহজেই অনুমেয়। পর্যটন-শিল্পকে কেন্দ্র করে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে জোয়ার এসেছে। কিন্তু তার পরই মর্মান্তিক জঙ্গি হানা। অকালে প্রাণ হারালেন ২৬ জন সাধারণ মানুষ। নজিরবিহীন সন্ত্রাস দেশে কম হয়নি। তবে, বেছে বেছে পর্যটকদের পরিচয় জেনে তাঁদের পরিজনদের চোখের সামনেই ঠান্ডা মাথায় খুন করা— শুধু নৃশংসই নয়, সুপরিকল্পিত বার্তাও বহন করে। ঘটনাটির সময়কাল এমন একটি সন্ধিক্ষণ যখন প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতি টালমাটাল। গণঅভ্যুত্থানে জেরবার বাংলাদেশে মৌলবাদ ফের প্রবল। পাকিস্তানের উস্কানিতে তার রূপ ভয়াবহ। ইজ়রায়েলের বুকে প্যালেস্টাইনের জঙ্গিগোষ্ঠীর আক্রমণের অভিঘাতের জেরে, প্রতিশোধস্পৃহায় আজ একটা দেশ তথা জাতি ছারখার হতে চলেছে। পাকিস্তান, আফগানিস্তান তো বটেই, ইরাক, ইরান, সিরিয়া-সহ পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলোতেও সন্ত্রাস প্রায় দৈনন্দিন ব্যাপার। জঙ্গি হানায় কিন্তু প্রাণ যায় সকলেরই। ধ্বংসস্তূপে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় জাতপাত, ধর্ম-নির্বিশেষে সমস্ত মানুষের রক্ত।
বর্তমান শ্বাসরোধকারী পরিস্থিতিতে প্রকট হয়ে উঠছে রাগ আর হতাশা। আর সেই সুযোগেই শুরু হয়েছে রাজনীতির খেলা। আজ কৃত্রিম মেধার জাদুকাঠিতে বিদ্বেষের স্ফুলিঙ্গ গোটা দেশকে জ্বালিয়ে রাখারও ক্ষমতা রাখে। ঘটনার অব্যবহিত পরেই সমাজমাধ্যমে লাগাতার কদর্য ভাষায় আক্রমণ চালানো হচ্ছে দেশের সংখ্যালঘুদের উদ্দেশে। বিদ্বেষের বিষবাষ্প স্মার্টফোনের মুঠিতেই সীমাবদ্ধ নয়, হিংসার আঁচ পৌঁছে যাচ্ছে মনের ভিতরেও। সমাজমাধ্যম আজ রণক্ষেত্রে পরিণত। বিভাজনকামী স্বার্থান্বেষী রাজনীতির জন্য মোক্ষম রসদ। অথচ, ঘটনার দিনই মুসলমান গাড়িচালক নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়েই পরম যত্নে ভিন ধর্মী পর্যটকদের পৌঁছে দেন হোটেলের নিরাপদ আস্তানায়। তীব্র নিন্দায় শামিল হয়ে মোমবাতি মিছিলে পথে নামেন সেই সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষগুলোই। রব ওঠে, আমরা প্রথমে ভারতীয় তার পরে কাশ্মীরি। জঙ্গিবাহিনীর পাল্টা ‘সবক’ শেখানোর ভয় উপেক্ষা করেই ‘শেম শেম’ রবে মুখরিত হয় ভূস্বর্গের অলিগলি। আচমকা হানায় পর্যটকদের বাঁচাতে গিয়ে বেঘোরে প্রাণ হারান টাট্টুঘোড়ার সহিস সইদ আদিল হুসেন শাহ। ঘটনার পরের দিন এক অভূতপূর্ব শোক ও ক্ষোভের মধ্য দিয়ে বন্ধ পালন করেছে কাশ্মীর। হামলার খবর পাওয়া মাত্রই মসজিদগুলি প্রতিবাদ ও সংহতির স্লোগানে ফেটে পড়ে। অপরাধীদের শাস্তির প্রতিবাদে মুখরিত হয় উপত্যকার গলিঘুঁজি।
প্রশাসনের অভূতপূর্ব কড়া পদক্ষেপে জঙ্গিগোষ্ঠী সমূলে উৎপাটিত হোক। এটাই কাম্য। কিন্তু তা বলে, চরম সঙ্কটকালে একটা গোটা সম্প্রদায়কে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো কি সত্যিই সমীচীন? জাতি-ধর্ম-ভাষা-সংস্কৃতির বহুত্ব ও ভিন্নতাই ভারতের বৈশিষ্ট্য। তা রক্ষার দায়িত্ব কি শুধু সরকারের? একে অন্যকে দোষারোপে সমস্যার সমাধান মিলবে? দেশের গভীর সঙ্কট। প্রতিটি সংবেদনশীল মানুষের প্রতিটি পদক্ষেপই এই মুহূর্তে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ইন্ধন-উস্কানির পিচ্ছিল পথে হারিয়ে না গিয়ে সংযম অনুশীলনের এ যেন এক চরম অগ্নিপরীক্ষা।
শঙ্খদীপ কর্মকার
কলকাতা-১১৫