ওটিটি মাধ্যম কোনও ভৌগোলিক সীমারেখায় আটকে নেই, তার দর্শক পৃথিবী জুড়ে। গত কয়েক বছরে বড় আর ছোট পর্দার মধ্যে অনায়াসে জায়গা করে নিয়েছে ওটিটি। শুধু জায়গা করে নেওয়া নয়, এই মাধ্যমের উত্তরোত্তর বৃদ্ধি ঘটেছে। ওটিটির এই সাম্রাজ্যে বাংলা কনটেন্ট কোথায় দাঁড়িয়ে? যে সব বাংলা ওটিটি রয়েছে, সেগুলোই বা কেমন ব্যবসা করছে?
সমীক্ষা বলছে, বাংলা কনটেন্টের প্ল্যাটফর্মের মধ্যে হইচই জনপ্রিয়তায় এগিয়ে। এর পাশাপাশি রয়েছে বাংলা জ়ি ফাইভ, আড্ডাটাইমস, ফ্রাইডে, ক্লিক-এর মতো প্ল্যাটফর্ম। বাংলা সিনেমা যেখানে ব্যবসা করতে ব্যর্থ হচ্ছে, সেখানে বাংলা ওয়েবের দর্শকসংখ্যা ঈর্ষণীয়। ডাব করা বাংলা সিরিজ়ও দেখেন অন্য ভাষাভাষী দর্শক।
ওটিটির দুনিয়ায় বাংলা
এ দেশে ওটিটির উত্থান মূলত কোভিডের সময়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সেই উৎসাহে এখন কিছুটা হলেও ভাটা পড়েছে। হইচই-এর চিফ অপারেটিং অফিসার সৌম্য মুখোপাধ্যায় বলছিলেন, “কোভিডের সময়ে ওটিটিতে যে জোয়ার এসেছিল, সেটা এখন স্টেবিলাইজ়ড হয়ে গিয়েছে। ওই সময়ে অনেক সংস্থায় ৭০-৮০ শতাংশের মতো বৃদ্ধি দেখা গিয়েছিল। সেটা এখন ৩০-৪০ শতাংশে এসেছে। আমরা এটাকে স্থিতিশীল বলব। কারণ এখনও নিয়মিত নতুন দর্শক তৈরি হচ্ছে।” বাংলা কনটেন্ট নিয়ে এ দেশে ও আন্তর্জাতিক দুনিয়ায় আগ্রহ কতটা? “বাঙালি দর্শক সারা পৃথিবীতেই ছড়িয়ে রয়েছেন। বাংলা কনটেন্ট দেখার নিরিখে হইচই দেশ ও বিদেশে সবচেয়ে এগিয়ে। তা ছাড়া আমরা কিন্তু দেশের প্রথম পাঁচ-ছ’টা ওটিটি প্ল্যাটফর্মের মধ্যে পড়ি। এর অন্যতম কারণ ইউজ়ার লয়ালটি। আমেরিকা, ইউকে, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, পশ্চিম এশিয়ায় আমাদের দর্শক রয়েছেন। এ ছাড়া বাংলাদেশ রয়েছে। যৌথ ভাবেও আমরা কাজ করি,” মন্তব্য সৌম্যর। বাংলাদেশের সংস্থা চরকি-র কনটেন্টও বেশ জনপ্রিয়।
কনটেন্ট নির্বাচন
যে কোনও ওটিটির ক্ষেত্রেই স্থায়ী দর্শকগোষ্ঠী খুব গুরুত্বপূর্ণ। “এর জন্য নিয়মিত ভাল ছবি-সিরিজ়ের জোগান দেওয়া প্রয়োজন,” বলছেন আড্ডাটাইমসের কর্ণধার নিসপাল সিংহ। দর্শক যদি নিয়মিত পছন্দমাফিক বিষয় পান, তা হলে তিনি সাবস্ক্রিপশন বজায় রাখবেন। সম্প্রতি আড্ডাটাইমসে ‘ফেলুদা ফেরত: যত কাণ্ড কাঠমান্ডুতে’ ভাল ভিউয়ারশিপ পেয়েছে। নতুন সিরিজ় বা ছবি নিয়ে আসার ক্ষেত্রে নিসপাল তাড়াহুড়ো করতে চান না। ৩০-৪৫ দিনের মধ্যে একটা করে নতুন কনটেন্ট আনার পক্ষপাতী তিনি। হইচই-এর পদ্ধতি আবার খানিক আলাদা। গোটা বছরের তালিকা আগাম ঘোষণা করে এই সংস্থা। নতুন সিরিজ় এবং ফ্র্যাঞ্চাইজ়ি মিলিয়ে তারা বছরে ৩০টির কাছাকাছি কনটেন্ট আনে।
প্রতিটি ওটিটি সংস্থারই লক্ষ্য, নিজস্ব দর্শক তৈরি করা এবং তাঁদের ধরে রাখা। “দুর্গাপুর থেকে ডাবলিন— সব ধরনের দর্শকের কথা মাথায় রেখে কনটেন্ট তৈরি করতে হয়,” বললেন সৌম্য। দেখা যাচ্ছে, থ্রিলার, গোয়েন্দা সিরিজ়ের প্রতি আগ্রহ বেশি। হরর, কমেডির দর্শকসংখ্যাও ভাল। তবে বাংলা ওয়েব সিরিজ়ের মান নিয়ে নানা স্তরে ক্ষোভ রয়েছে। ভূত-প্রেত, কুসংস্কারকে প্রাধান্য দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। যদিও নির্মাতাদের মতে, দর্শক যে ধরনের শো বেশি দেখেন, সেগুলোই আনা হয়। ভিউয়ারশিপ এবং সাবস্ক্রিপশন দেখে এটি আন্দাজ করা যায়। জ়ি ফাইভে রাজ চক্রবর্তীর ‘আবার প্রলয়’-এর সময়ে সাবস্ক্রিপশন বেড়েছিল। এখন সেই সিরিজ়ের নতুন সিজ়নও আসছে।
সিনেমা মুক্তি
শুধু সিরিজ় নয়, বাংলা সিনেমা দেখার ক্ষেত্রে ওটিটি এখন বড় মাধ্যম। এসভিএফ প্রযোজিত ছবিগুলি সিনেমা হলে মুক্তির পরে হইচই-এই আসে। অন্য নির্মাতাদের ছবিও এই প্ল্যাটফর্ম কেনে। কোনও ছবি ওটিটিতে কত টাকায় বিক্রি হল, তার উপর সেটির সাফল্য নির্ভর করে। তবে যে ছবি বক্স অফিসে সফল হয়নি, ওটিটিতেও সেটা ভাল দর পাবে না বলে জানালেন সৌম্য।
অধিকাংশ বাংলা ওটিটি সাবস্ক্রিপশনের উপরে নির্ভর করে চলে। অন্য ওয়েব প্ল্যাটফর্ম এবং একাধিক টেলিকম সংস্থার সঙ্গেও চুক্তি থাকে। কিন্তু বাংলার বাজার কি এতটাই বড় যে এতগুলো ওটিটি একসঙ্গে লাভের মুখ দেখছে? ‘না’। কিন্তু এটাও ঠিক যখন কোনও প্ল্যাটফর্ম ভাল শো এনেছে, দর্শক তা দেখেছেন। তাই সাফল্যের চাবিকাঠি হল ধারাবাহিকতা।