আর কী রকম প্রাণান্তকর চাপের পরিস্থিতিতে ভাবুন একবার। বেথেল আর জ্যাক্স ৭৭ রান যোগ করে ম্যাচ ছিনিয়ে যাওয়ার আতঙ্ক ছড়াচ্ছেন। আইপিএলে শহর বনাম শহর। এখানে সারা দেশের দেড়শো কোটি মানুষের চাপ সহ্য করে অমন মাহেন্দ্রক্ষণে মস্তিষ্ককে কাজ করানো। কোনও তুলনাই হয় না। অক্ষর যে সেটা করে দেখালেন, তার জন্য তাঁকে ‘ঠান্ডা ঠান্ডা কুল কুল অক্ষর’ বলে ডাকা যেতেই পারে। এক-এক বার ভাবতে গিয়ে শিউরে উঠছি যে, ওই ক্যাচটা ধরতে দিয়ে যদি কোনও ভাবে বাউন্ডারির গোল দড়ি ছুঁয়ে ফেলত অক্ষরের পা? যদি না শিবম সঙ্গে সঙ্গে দৌড়ে যেতেন? আরব সাগরের পারে এ দিনই তো হারিয়ে যাচ্ছিল বিশ্বকাপ স্বপ্ন। ঠিক যে ভাবে ২০১৬-তে হয়ে গিয়েছিল। সে দিন বিরাট কোহলির দুর্ধর্ষ ইনিংসের পরেও যেমন ম্যাচ ছিনিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন লেন্ডল সিমন্স, আন্দ্রে রাসেলরা, এ দিনও তেমনই সঞ্জু স্যামসনের ইনিংসের কোনও মূল্যই থাকত না। ইডেনে ওয়েস্ট ইন্ডিজ়কে হারিয়ে ২০১৬-র পরাজয়ের প্রত্যাঘাতে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন সঞ্জু। এ দিন সাতাশি বিশ্বকাপে গুচ, গ্যাটিংয়ের ইংল্যান্ডের কাছে চাবকানির জবাবি মিছিলের পুরোভাগেও তিনি। ইডেনে বিরাট, রোহিতদের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন। ওয়াংখেড়েতে কপিল দেবের দলের শাপমোচন ঘটিয়ে গেলেন।
কপিল মাঠে ছিলেন না কিন্তু গাওস্কর ছিলেন। ধারাভাষ্য দিচ্ছিলেন। ফিলিপ ডেফ্রিটাসের বলে তাঁর সেই শুরুতে বোল্ড হয়ে যাওয়ার ছবি আজও কত মানুষকে যন্ত্রণাবিদ্ধ করে! এখনও কত লোকে বলে, আহা যদি সেদিন সানি দাঁড়িয়ে যেতে পারত! ভিআইপি বক্সে আরও দু’টি মুখ দেখা গেল। মহেন্দ্র সিংহ ধোনি এবং রোহিত শর্মা। দুই বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক। তাঁদের সামনে আর একটি বিশ্বকাপ জয়ের হাইওয়ে খুলে দেওয়া গেল, এটা নিশ্চয়ই ছোটদের তরফে বড়দের জন্য বিশেষ উপহার।
সচিন তেন্ডুলকর? তিনি কোথায়? নিজের শহরে বিশ্বকাপ সেমিফাইনাল হচ্ছে আর তিনি নেই? পুত্র অর্জুন তেন্ডুলকরের বিয়ে নিয়ে ব্যস্ত সচিন। সেখানে নেমন্তন্ন খেয়েই ওয়াংখেড়েতে এসেছিলেন ধোনি, রোহিতরা। বিয়েবাড়ির আনন্দ মাটি করে দিয়ে শ্রাদ্ধবাসরে পরিণত করে দিয়ে যাচ্ছিলেন বেথেল আর উইল জ্যাক্স। শেষ পর্যন্ত যে রংচংয়ে প্যান্ডেল সরিয়ে নিয়ে সাদা চাদরে মুড়িয়ে দিতে হয়নি, তার জন্য অক্ষরের ক্যাচের সঙ্গে বহু বছর ধরে একই সঙ্গে উচ্চারিত হবে সঞ্জু স্যামসনের ৪২ বলে ৮৯ রানের মারকাটারি ইনিংসও। আটটা চার, সাত-সাতটা ছয়। স্ট্রাইক রেট ২১১.৯০। সব ক’টাই অবিশ্বাস্য পরিসংখ্যান। কিন্তু পরিসংখ্যান আর কবে কোন রূপকথার সঠিক বর্ণনা দিতে পেরেছে? স্কোরবোর্ডে তো আর লেখা থাকবে না, জফ্রা আর্চারের মতো আগুনে পেসারকে তিনি এমন মেরেছেন যে, মনে হচ্ছিল, আজাদ ময়দানেও তাঁকে কেউ খেলতে নেবে না। এ বারের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে দশ উইকেট নিয়েছেন আর্চার। তার মধ্যে পাওয়ার প্লে-তে আট শিকার। এ দিন দিলেন চার ওভারে ৬১। এক-এক বার মনে হচ্ছে, একা জফ্রাকে কাঠগড়ায় তোলা যায় কী ভাবে? ১৫ রানের মাথায় তাঁর বলে সঞ্জুর যে লোপ্পা ক্যাচ হ্যারি ব্রুক ফেললেন, সেটাও তো ম্যাচ ঘুরিয়ে দিয়ে গেল। স্টিভ ওয় যেমন হার্শেল গিবসকে বলেছিলেন, আর্চারের আজ ড্রেসিংরুমে ফিরে অধিনায়ককে বলা উচিত, ‘‘তুমি তো আমাদের কাপটাই হাত থেকে ফেলে দিলে!’’
আর সঞ্জুকে দেখে মনে হচ্ছিল, পুরনো হিসাবনিকাশ ঠিক করতে এসেছেন। এক বছর আগে যখন ইংল্যান্ড এসেছিল পাঁচ ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজ় খেলতে, আর্চার শর্ট বলে জীবন দুঃসহ করে তুলেছিলেন সঞ্জুর। সবাই বলতে শুরু করে দেয়, তিনি শরীরের দিকে আসা গতিসম্পন্ন বাউন্সার খেলতে পারেন না। কেরিয়ারের উপরে প্রশ্নচিহ্ন তৈরি হয়ে যায়। বৃহস্পতিবার মনে হয়, আর্চারকে দেখেই বিড়বিড় করতে করতে নেমেছিলেন তিনি— আজ তোর একদিন কী আমার একদিন।
তা ছাড়া ক্রিকেটের বৃত্তেই তো শুধু সীমাবদ্ধ নয় সঞ্জু স্যামসনের কাহিনি। যে কোনও পেশার, যে কোনও জগতের মানুষের জন্য তা বুস্টার ডোজ় ইঞ্জেকশন হয়ে থাকছে যে, বাকি পৃথিবী যতই তোমার দক্ষতায় সন্দেহ প্রকাশ করুক, তুমি বিশ্বাস হারিয়ো না। সিদ্ধান্ত নেওয়ার মালিকদের কাছে যতই ব্রাত্য হয়ে যাও, হাল ছেড়ো না। লড়াই চালিয়ে যাও। ঘোর দুর্যোগের মধ্যেও বলতে থাকো, অন্ধকার হয় আরও উজ্জ্বল আকাশ ফিরে আসবে বলে। অভিষেক শর্মাদের নিয়ে মাতামাতির মধ্যে সঞ্জু সুপারম্যান স্যামসনকে কেউ মনে রাখেনি। অবহেলা, অনাদরে তিনি এককোণে পড়েছিলেন দুয়োরানির সন্তানের মতো। ইডেন আর ওয়াংখেড়ে— দেশের দুই সব চেয়ে ঐতিহাসিক মাঠ ক্রিকেট দরবারে তাঁকে নায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠা দিয়ে গেল। ‘ক্ষ্যাপা খুঁজে খুঁজে ফিরে পরশপাথর’। কিন্তু খেয়ালই করেনি কখন সে তা হাতে পেয়ে গিয়েছিল। হঠাৎ কোমরবন্ধনীর দিকে তাকিয়ে গম্ভীররা আবিষ্কার করছেন, সোনা চিকচিক করছে। ভাগ্যিস, মহামূল্যবান সেই পাথর দূরে সরিয়ে রাখলেও একেবারে ছুড়ে ফেলে দেননি তাঁরা।
সঞ্জুর দুর্ধর্ষ ইনিংস, শিবম দুবে-হার্দিক পাণ্ড্যদের আগ্রাসী ব্যাটিংয়ে ২৫৩-৭ তুলেও যে এমন প্রবল স্নায়ুর চাপে ভুগতে হবে, কে জানত! বেথেল আর উইল জ্যাক্স মিলে যা শুরু করেছিলেন, সাতাশি বিশ্বকাপের সেই অভিশপ্ত ওয়াংখেড়ের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিল। মনে হচ্ছিল গুচ আর গ্যাটিং বোধ হয় নামধাম পাল্টে, সময়ের কাঁটা পিছিয়ে দিয়ে আবার রক্তাক্ত করতে এসেছেন। সাতাশির সেই সেমিফাইনালে গুচ করেছিলেন ১৩৬ বলে ১১৫। অধিনায়ক গ্যাটিং ৬২ বলে ৫৬। সুইপ মেরে মেরে শেষ করে দিয়েছিলেন ভারতীয় স্পিনারদের। এ দিন ওয়াংখেড়েতে বেথেল শেষ পর্যন্ত উদ্বেগে রেখে মাত্র ৪৮ বলে ১০৫ করে রান আউট হলেন। যত ক্ষণ তিনি ছিলেন, পকেটে সর্বিট্রেট রেখে মন্ত্রজপ করে যেতে হচ্ছিল। শেষ তিন ওভারেও দরকার ছিল ৪৫। হয়ে যেতেই পারে। কিন্তু তিনি— যশপ্রীত বুমরা আছেন। ২০১১-র ২ এপ্রিলের ওয়াংখেড়ে যদি বিখ্যাত হয়ে থাকে ধোনির ম্যাচ জেতানো ছক্কার জন্য, তা হলে বুমরা এ দিন যে ১৮তম ওভারটি করলেন, সেটাও ওয়াংখেড়ের অনার্স বোর্ডে সোনার অক্ষরে লিখে রাখা উচিত। মাত্র ছয় রান দিলেন ওই চাপের মুখে! অবিশ্বাস্য! হার্দিকও দারুণ একটা ওভার করলেন এর পর। মাত্র ৯ রান দিলেন। শেষ ওভারে ৩০ রানের কুশন পাওয়া গেল এই দু’জনের জন্য। না হলে সবার ওভার প্রায় শেষ হয়ে গিয়েছিল। শিবম দুবে ব্যাট হাতে দারুণ সব আগ্রাসী ইনিংস খেলছেন এই টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে। এ দিনও করলেন ২৫ বলে ৪৩। তাঁকে উপরে পাঠানোর পরিকল্পনা একদম সুপারহিট। আদিল রশিদকে তিনটি ছক্কা মেরে ছন্দই পেতে দিলেন না। কিন্তু বল হাতে শিবম দুবেকে দেখলেই কেমন জানি একটা আতঙ্ক হচ্ছে। বুমরা-হার্দিকের কৃপণতম বোলিংয়ের পরে শেষ ওভারে তিনটি ছক্কা খেলেন। ভারত ৭ রানে জিতলেও মানতেই হবে, কানের পাশ দিয়ে তির গিয়েছে। ম্যাচটা তারা হেরেও যেতে পারত।
বেথেলকে নিয়ে দিন দুই আগেই একটি পুরনো ভিডিয়ো দেখলাম। ২০২২-এর টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অ্যাডিলেডে যখন জস বাটলার দুর্ধর্ষ খেলে ভারতকে হারাচ্ছেন, গ্যালারিতে উৎসবে ফেটে পড়ছেন তিনি। সেই বাটলার এখন অস্তাচলে, বেথেল উঠে এলেন উদিত সূর্য হিসেবে। শতরান পূর্ণ করেও বিশেষ কোনও উচ্ছ্বাস প্রকাশ করলেন না। শুধু এক বার ব্যাট তুললেন ড্রেসিংরুমের দিকে। বোঝাই যাচ্ছিল, তখনও পাখির চোখ দেখছেন। দলকে জিতিয়েই মাঠ ছাড়বেন। অক্ষর অর্ধেক কাজ সেরেছিলেন বাউন্ডারি লাইনে রিলে ক্যাচের নেতৃত্ব দিয়ে। বাকিটা সারলেন হার্দিক পাণ্ড্য। তাঁর দুর্ধর্ষ থ্রো-তে বেথেলের রথের চাকা অবশেষে মাটিতে বসানো গেল। না হলে এই কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের ফল কী হত,
কে জানে।
ওয়াংখেড়েতে সাতাশিতে তিরবিদ্ধ কপিল, গাওস্করের সঙ্গে সম্ভবত তাঁর— হার্দিক পাণ্ড্যরও শাপমুক্তি ঘটল। আইপিএলে রোহিত শর্মার থেকে মুম্বই ইন্ডিয়ানসের অধিনায়কত্ব
তাঁর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে বলে কত বিদ্রুপই না শুনতে হয়েছে ঘরের মাঠে দাঁড়িয়ে। আর এ দিন সেই জনতাই দেশের নীল জার্সিতে ভালবাসা আর জয়ধ্বনিতে ভরিয়ে দিচ্ছিল ‘হার্দিক, হার্দিক’ বলে।
ক্রিকেট কাউকে চিরতরে নিঃস্ব করে না। যেমন ছিনিয়ে নেয়, তেমন আবার দু’হাত ভরে দেয়ও। সঞ্জু স্যামসন তাঁর ধৈর্যের পুরস্কার পাচ্ছেন। হার্দিক পাণ্ড্য লড়াইয়ের ফল পাচ্ছেন। জেকব বেথেল আজ পারলেন না। কিন্তু তাঁর জন্যও নিশ্চয়ই আগামী দিনে বড় কোনও পুরস্কার অপেক্ষা করছে।
এ বার ঐতিহাসিক মেরিন ড্রাইভে দাঁড়িয়ে হাল্কা উৎসব করতে করতে বলা যেতেই পারে, ‘‘কী ম্যাচ! আহা, কী দুর্ধর্ষ ম্যাচ দেখলাম!’’ তার পর আজকের জয়ের উত্তেজনা শান্ত হয়ে এলে চোয়াল শক্ত করে নিয়ে ফেলো নতুন শপথ— আমদাবাদ চলো!