৫ মার্চ: প্রায় বাতিল হয়ে যাওয়ার মুখ থেকে ফিরে আসা। টানা দু’টি ম্যাচে সেরার পুরস্কার। কিন্তু সঞ্জু স্যামসন নিজেকে নয়, নায়ক বেছে নিচ্ছেন যশপ্রীত বুমরাকে। পুরস্কার মঞ্চে এসে বলে গেলেন, ‘‘আমি এখানে দাঁড়িয়েই থাকতাম না, যদি না বুমরা এ রকম দুর্ধর্ষ বোলিং করত।’’ আবারও প্রমাণ করে দিয়ে গেলেন, তাঁর কাছে সব সময় ব্যক্তি নয়, দল আগে।
অবাক লাগবে শুনে যে, এই টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ শুরুর সময় সঞ্জু স্যামসনই প্রথম ভোকাল টনিক দিয়েছিলেন দলকে। অথচ তিনি প্রথম একাদশে সুযোগই পাচ্ছিলেন না। দলের উদ্দেশে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ঠিক সঞ্জু সেদিন বলেছিলেন, ‘‘এমন একটা মানসিকতা তৈরি করো যাতে দলের স্বার্থ সবার আগে মাথায় আসে। যাতে দলের জন্য সব কিছু করার জন্য তৈরি থাকতে পারো।’’ আর এ দিন কী বললেন? নিজের এমন দুর্ধর্ষ ইনিংসকেও পিছনে ঠেলে দিয়ে বুমরার গলায় মেডেল পরিয়ে দিলেন। ‘‘সব কৃতিত্ব বুমরার,’’ বললেন তিনি, ‘‘ও এক জন বিশ্বমানের বোলার। এ রকম বোলার একটা প্রজন্মে একবারই আসে। আজ ও যা বোলিং করেছে, তা দেখে এই কথাটাই আমার মাথায় আসছে।’’ এর পরেই আরও অবাক করে দিয়ে বললেন, ‘‘এই ম্যান অব দ্য ম্যাচের পুরস্কারটা আমার নয়, বুমরারই প্রাপ্য। শেষের ওভারগুলোতে ও যে ভাবে বল করেছে, তা যদি না করত, আমি এখানে দাঁড়িয়ে থাকতে পারতাম না। আমাদের বোলাররা দারুণ
কাজ করেছে।’’
ওয়াংখেড়ের বাইশ গজ নিয়ে সকলের খুব আগ্রহ ছিল। শেষ পর্যন্ত স্বপ্নের ব্যাটিং উইকেটই হয়েছে, দেখা গেল। ঘাসও ছাঁটা হয়েছিল ম্যাচের দিন সকালে। যে ম্যাচে ৪৯৯ রান হয়েছে ৪০ ওভারে, ৩৪টি ছক্কা হয়েছে (ভারত ১৯টি, ইংল্যান্ড ১৫টি), সেখানে বুমরার বোলিং হিসাব? ৪-০-৩৩-১। সঞ্জুর সঙ্গে একমত অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদবও। গলা মিলিয়ে বললেন, ‘‘দিনের পর দিন ধরে সবাই দেখছে বুমরা কী করতে পারে। আজও একই কাজ করে গেল।’’ অবিশ্বাস্য নিয়ন্ত্রণ দেখিয়ে মেপে-মেপে ইয়র্কার ও নিচু ফুলটস করে গেলেন। যা ইংল্যান্ডের ব্যাটসম্যানেরা খেলতেই পারলেন না। ১৬ ও ১৮তম ওভার বল করে বুমরা দিলেন মাত্র ১৪ রান। এর মধ্যে ১৮তম ওভারে মাত্র ৬ রান দেওয়া ভারতের দিকে ম্যাচের ভাগ্য ঘুরিয়ে দেয়। জেকব বেথেল ভারতের সব বোলারকে পেটালেন কিন্তু বুমরার সামনে এসে বার-বার আটকে গেলেন। হিসাব বলছে, বুমরার বিরুদ্ধে ১৩ বলে মাত্র ১৭ রান করতে পেরেছেন তিনি।
নিজের ইনিংস নিয়ে বেশি কিছু ‘বলব না বলব না’ মনোভাবই ধরে রেখেছিলেন সঞ্জু। অনেক চাপাচাপিতে বললেন, ‘‘আমার মনে হয়েছিল, ইডেন থেকে ছন্দে আছি। এই ছন্দকে যথাসম্ভব কাজে লাগাতে হবে আজও।’’ ওয়াংখেড়ের ব্যাটিং পিচে কোনও স্কোরই নিরাপদ নয়, মনে হয়েছিল তাঁর। ‘‘দারুণ সেমিফাইনাল হল। ইংল্যান্ড দারুণ লড়াই করেছে। খুব কাছাকাছি
চলে এসেছিল,’’ বলার সময় মনে হচ্ছিল গোটা দেশের মতোই তাঁরও যেন ঘাম দিয়ে জ্বর ছেড়েছে যে, জেকব বেথেল শেষ পর্যন্ত থাকেননি বা বেথেল আর উইল জ্যাক্সের জুটি আর কিছু ক্ষণ টেকেনি। সূর্যকুমার যাদব মজা করে হ্যারি ব্রুক-কে বলেছেন, ‘‘জিততে গেলে আর কত রান করতে হবে তোমাদের সঙ্গে?’’ ফিল্ডিং কোচ টি দিলীপকে কৃতিত্ব দিয়ে গেলেন সূর্যকুমার। ‘‘ফিল্ডিংয়ের জন্য অনেক খেটেছেন উনি। ছেলেরা সাড়া দিয়েছে। অতিরিক্ত পরিশ্রম করেছে ফিল্ডিংয়ে খামতি মেটানোর জন্য।’’
আর ১৫ রানে সঞ্জুর ক্যাচ ফেলে ম্যাচই গলিয়ে দেওয়া হ্যারি ব্রুক কী বললেন? মনে হয় না, চট করে ইংল্যান্ড অধিনায়ক এই দুঃস্বপ্ন থেকে বেরতে পারবেন। ঘুরবেন, ফিরবেন আর চোখের সামনে ভেসে উঠবে সঞ্জুর ক্যাচ ফেলে দেওয়ার সেই দৃশ্য। ‘‘আমি দু’হাত তুলে স্বীকার করতে চাই, আমিই দোষী। সঞ্জুর ক্যাচটা ফেলে বিরাট ভুল করেছি আমি।’’ ক্যাচ তো ফেললেনই, ব্যাট হাতে যে সেই ব্যর্থতা পুষিয়ে দেবেন, সেটাও পারলেন না। কে বলবে, ভারতের ফিল্ডিং নিয়ে এত কথা হচ্ছিল। অভিষেক শর্মাদের ক্যাচ ফেলা নিয়ে এত সমালোচনা হচ্ছিল। ওয়াংখেড়েতে সেই সমালোচনা একশো আশি ডিগ্রি ঘুরে গিয়ে ইংল্যান্ডকে তাড়া করল। একটা দুর্ধর্ষ ভঙ্গিতে তালুবন্দি করা। অন্যটা সহজতম সুযোগ ফেলে দেওয়া। দু’টো ক্যাচের দু’রকম ভাগ্য কী ভাবে ম্যাচের রং পাল্টে দিয়ে গেল ওয়াংখেড়েতে!
ক্রিকেটকে কি এ জন্যই বলে, ঘোর অনিশ্চয়তার খেলা? কখন কাকে রাজা বানায়, কাকে ফকির— কে
বলতে পারে!