২৩ জুন: মায়ামির হার্ড রক স্টেডিয়ামে দাঁড়িয়ে নেমার দ্য সিলভা স্যান্টোস জুনিয়রের নিশ্চয়ই ফুটবলজীবনের অনেক সুদিনের কথা মনে পড়ে যাবে। ২০১৭-তে বার্সেলোনার হয়ে রিয়াল মাদ্রিদের বিরুদ্ধে এল ক্লাসিকোতে দারুণ খেলেছিলেন। তখন সতীর্থ ছিলেন লিয়োনেল মেসি এবং এক সঙ্গে তিন জনের নাম উচ্চারিত হত বিশ্ব ফুটবলের সেরাদের আলোচনায়। মেসি, রোনাল্ডো, নেমার। ব্রাজ়িলের হয়েও খেলেছেন মেসির বর্তমান লিগ ফুটবলের শহরে। যদিও শেষবার এখানে তিনি খেলেছেন দেশের হলুদ জার্সিতেই সাত বছর আগে। কলম্বিয়ার বিরুদ্ধে সেই ম্যাচ দল ড্র করেছিল, গোল পেয়েছিলেন নেমার।
দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি নিশ্চয়ই ভাববেন, হায়, আমার পৃথিবীটাই তখন কত অন্যরকম ছিল। মেসির সঙ্গে যুগলবন্দির সেই রমরমার দিন আজ কোথায়! প্রায় আড়াই বছর পরে ব্রাজ়িলের হয়ে নামবেন। কাফের চোট সারিয়ে দলের সঙ্গে পুরোদমে অনুশীলন শুরু করেছেন তিনি। কিন্তু আগের মতো আর তাঁর নির্বাচন প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। তীব্র বিতর্কের পরে কার্লো আনচেলোত্তি তাঁকে বিশ্বকাপে নিয়ে আসতে রাজি হয়েছেন ঠিকই, কিন্তু নানা কথা শোনা যাচ্ছে নেমারের নির্বাচন নিয়ে। তার মধ্যে একটা হচ্ছে, আনচেলোত্তি নাকি দল ঘোষণার আগে সরাসরি কথা বলেন ব্রাজ়িল তারকার সঙ্গে। জানতে চান, নেমার কী প্রত্যাশা করছেন? প্রশ্ন করেন, বাস্তব পরিস্থিতিটা তিনি আন্দাজ করতে পারছেন কি না। তার মানে হল, কোচের তরফে পরিষ্কার বুঝিয়ে দেওয়া যে, দলে নিলেও কবে খেলাব, কতক্ষণ খেলাব এ সব নিয়ে কোনও নিশ্চয়তা দিতে পারছি না। নেমার নাকি কোচকে জানান, তিনি খোলা মন নিয়ে বিশ্বকাপে যেতে রাজি। যে কোনও ভূমিকা তাঁকে দেওয়া হবে তিনি তা গ্রহণ করার জন্য তৈরি।
নিউ জার্সি ও ফিলাডেলফিয়ায় প্রথম দুই ম্যাচে চোটের জন্য বাইরে বসেছিলেন নেমার। ফিলাডেলফিয়ায় তো তাঁকে দলের সঙ্গে নিয়েও যাওয়া হয়নি যাতে ভাল ভাবে রিহ্যাব করে দ্রুত তিনি মাঠে ফিরতে পারেন। নিউ জার্সিতেই ব্রাজ়িলের হয়ে অভিষেক ঘটিয়েছিলেন নেমার। বন্ধুবান্ধবদের কাছে তিনি জানিয়েছিলেন, অভিষেকের মাঠে বিশ্বকাপের শুরু থেকে নামার জন্য তিনি মরিয়া। কিন্তু সেই লক্ষ্য পূরণ হয়নি। এ দিকে, বাইরে বসে থাকা নিয়ে দেশের মধ্যে থেকে কটাক্ষ ভেসে আসতেও দেরি হয়নি। স্বয়ং ব্রাজ়িলের প্রেসিডেন্ট লুলা দা সিলভা মন্তব্য করেন, নেমার প্রথম ফুটবলার যে বিশ্বকাপে ওয়ার্ক ফ্রম হোম করছে। এর পর নেমার নাম না করে সেই মন্তব্যের প্রতিক্রিয়া দেন। সমাজমাধ্যমে ট্রেনিংয়ের ছবি দিয়ে লেখেন, ‘‘অফিস থেকে কোনও ছুটি নেই।’’ ব্রাজ়িলের প্রেসিডেন্ট লুলাকে দিন কয়েক আগেই আক্রমণ করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাই আমেরিকায় নেমারের প্রত্যাবর্তন নিয়ে যেমন চর্চা, তেমনই আলোচনায় তাঁর দেশের প্রেসিডেন্টও। আর চোটমুক্ত হয়ে দলের সঙ্গে অনুশীলনে যোগ দিতে পেরে নেমার লেখেন— ‘‘ঈশ্বর, সব কিছুর জন্য ধন্যবাদ!’’
লিয়োনেল মেসি যখন বিশ্বকাপে অশ্বমেধের ঘোড়া ছুটিয়ে চলেছেন, তখন তাঁর এক সময়কার সতীর্থ ও প্রতিদ্বন্দ্বী মেসির বর্তমান ফুটবল শহরে এসেছেন পুরনো জাদু ফিরে পাওয়ার লক্ষ্যে। যদিও মেসির ইন্টার মায়ামি ঘরের মাঠ হার্ড রক নয়, নু স্টেডিয়াম। নু-তে দর্শকাসন আঠাশ হাজার মতো। আর হার্ড রকে এনএফএল দল মায়ামি ডলফিন্সের ‘হোম’। সুপার বোল হয়, আন্তর্জাতিক ফুটবলের জনপ্রিয় কেন্দ্র। এ ছাড়াও বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান লেগেই আছে। বিয়ন্সে, টেলর সুইফট-রা অনুষ্ঠান করে গিয়েছেন। এমন জাঁকজমকপূর্ণ মাঠে ফুটবলজীবনের পুরনো জাদু আবিষ্কারের লক্ষ্যে নামবেন নেমার এবং যতই তিনি এখনও হলুদ জার্সির ভক্তদের সেরা আবেগ হন, কাজ মোটেও
সহজ হবে না।
আনচেলোত্তি তাঁকে কোথায় খেলাবেন, কখন নামাবেন তা নিয়ে নানা সংশয় রয়েছে। উইং দিয়ে নেমারকে খেলানো হবে না, পরিষ্কার করে দিয়েছেন ইটালীয় কোচ। ফল্স নাইন হিসেবে আগের দিন ম্যাথিউস কুনহা দারুণ খেলে জোড়া গোল করেছেন। তাঁকে বসাবেন কী করে? রাফিনা চোট পেয়ে বাইরে, তাঁর জায়গায় আনতে পারেন। অথবা পাকেতাকে বসিয়ে। কিন্তু রাফিনহার জায়গায় লুইস হেনরিককে নামানোর কথা ভাবতে পারেন আনচেলোত্তি। স্ট্রাইকার বা দ্বিতীয় স্ট্রাইকার হিসেবেই নেমারকে খেলানোর পরিকল্পনা রয়েছে কোচের। গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে অন্তত তাঁকে দেখে নিতে চান আনচেলোত্তি। নক-আউট পর্বে মারমার-কাটকাট লড়াই। কোনও ঝুঁকি নেওয়া যাবে না। হারলেই তো বিদায়। ব্রাজ়িল যদি বৃহস্পতিবার ভোররাতে স্কটল্যান্ডকে হারিয়ে গ্রুপে প্রথম হতে পারে, জাপানের বিরুদ্ধে খেলবে। দ্বিতীয় হলে তাদের সামনে সম্ভবত নেদারল্যান্ডস।
নেমার যদিও চেষ্টায় কোনও খামতি রাখেননি বিশ্বকাপে ফিট হয়ে আসার জন্য। ২০১৪ থেকে বার্সেলোনায় তাঁর সঙ্গে থাকা ফিজ়িয়োথেরাপিস্ট রাফায়েল মার্তিনি ও ফিটনেস কোচ রিকার্ডো রোসা— এই দু’জনকে তিনি ব্যক্তিগত ভাবে নিয়োগ করেন ফিটনেসে উন্নতি করার জন্য। স্যান্টোসের হয়ে খেলার সময়েও এই যুগলবন্দি সারাক্ষণ তাঁর সঙ্গে ছিলেন। এখন দেখার বিশ্বকাপের মঞ্চে সেই উদ্যোগ কতটা কাজে দেয়।
ব্রাজ়িলের হলুদ জার্সিতে যেমন প্রচুর সমর্থক থাকবেন, তেমন স্কটিশ ভক্তরাও সারা বিশ্বে জনপ্রিয়। তাঁদের ‘টাটার্ন আর্মি’ বলা হয়। বস্টনে তাঁরা সব পানীয় শেষ করে দিয়ে মায়ামিতে এসেছেন। স্কটল্যান্ডের অধিনায়ক অ্যান্ডি রবার্টসন বলেছেন, ‘‘আমাদের সমর্থকদের সকলে খুব ভালবাসেন। বস্টেনে তা দেখা গিয়েছে। মায়ামিতেও ওঁরা মন জয় করে নেবেন। আর আমরা চেষ্টা করব, ওঁদের উৎসবের রাত উপহার দেওয়ার জন্য।’’ ব্রাজ়িল দলের প্রতি খুবই শ্রদ্ধাশীল স্কটল্যান্ডের অধিনায়ক। বারবার বললেন, ‘‘বিশ্বকাপে চার বার ব্রাজ়িলের মুখোমুখি হয়েছে স্কটল্যান্ড। সব ম্যাচেই হেরেছে। এ বারে মায়ামিতে জিতলে তাই ঐতিহাসিক রাত হবে স্কটল্যান্ড ফুটবল তাদের
সমর্থকদের জন্য।’’