২৩ জুন: দশ বছর আগে লেখা এক চিঠির পাতা। ডালাসের ফুটবল স্টেডিয়ামের বাইরে কুড়িয়ে
পাওয়া গেল।
কী রয়েছে তাতে? অসাধারণ কিছু লাইন। তুলে দেওয়া যাক।
...কী করে তোমাকে বোঝাব যদি আমরা এত ধ্বংসাত্মক হই!
...কী করে তোমাকে বোঝাব যেখানে আমরা জীবনে কখনও তোমার এক শতাংশ চাপও নিইনি।
...কোন মুখে তোমার সঙ্গে কথা বলব যখন এটাই বুঝতে চাইনি যে, তুমিও একজন রক্তমাংসের মানুষ। অসাধারণ এক প্রতিভা, বিশ্বের সেরা খেলোয়াড় হয়েও তুমিও তো মানুষ!
...কী করে তোমাকে বুঝব যদি নিজেরা এটাই না বোঝার চেষ্টা করে থাকি যে, তুমি সমুদ্রসৈকতে ছুটি কাটিয়ে বেড়াতে পারতে কিন্তু তা না করে দেশের জার্সি গায়ে অক্লান্ত ভাবে দৌড়ে বেড়িয়েছ শুধু আমাদের স্বপ্নপূরণ করবে বলে!
এ রকম আরও বেশ কিছু চমকপ্রদ লাইন, যা কোনও রক্তমাংসের মানুষ কী, পাথরকেও নাড়িয়ে দেবে। চিঠির প্রেরক সোমবার ডালাসের মাঠে উপস্থিত ছিলেন। যাঁর উদ্দেশে সেই চিঠি লেখা, তিনিও হাজির ছিলেন। বিশ্বকাপে অনন্য নজির গড়ে ঝলমলে স্টেডিয়ামে ঝাড়বাতি হয়ে জ্বললেন। যিনি চিঠি লিখেছিলেন, তাঁর নাম এনজ়ো ফার্নান্দেস। আর্জেন্টিনা ফুটবল দলের তরুণ প্রজন্মের উজ্জ্বল মুখ। যাঁর উদ্দেশে চিঠি লিখেছিলেন, তিনি লিয়োনেল মেসি।
দশ বছর আগে এনজ়োর বয়স ছিল মাত্র পনেরো। ২০১৬ কোপা আমেরিকার ফাইনালে সদ্য চিলির কাছে হেরে গিয়েছে আর্জেন্টিনা। সমালোচনায় দগ্ধ লিয়ো ঘোষণা করে দিলেন, আর জাতীয় দলের হয়ে খেলবেন না। নয় বছরে চতুর্থ ফাইনালে হার। কত আর নেওয়া যায়? বলে দিলেন, ‘‘আমার যা যা করার ছিল, সব করেছি। তবু পারলাম না। চ্যাম্পিয়ন হতে না পারার যন্ত্রণা আর সহ্য হচ্ছে না। আমি চললাম।’’
যন্ত্রণাকাতর প্রিয় নায়ক চোখের জলে বিদায় নিচ্ছেন দেখে কিশোর-ভক্ত মেনে নিতে পারেনি। চিঠি লিখে ফেলে। আবেগতাড়িত সব লাইনের শেষে কাতর আবেদন— তুমি আমাদের ছেড়ে যেয়ো না। কে জানত, একদিন ভক্ত আর আদর্শ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে অধরা ট্রফি জয় করবেন। এক-এক সময় মনে হচ্ছে, কল্পকাহিনি নয় তো? এ রকম বাস্তবে হয় নাকি? আদর্শ বিশ্বকাপে নজির গড়ছেন আর একদিন তাঁকে চিঠি লিখে ফিরে আসার কাকুতি-মিনতি করা ভক্ত গিয়ে জড়িয়ে ধরে অভিনন্দন জানাচ্ছেন! ঠিক দেখছি তো? নাকি অত্যাধুনিক স্টেডিয়াম, অমন বিশাল জায়ান্ট স্ক্রিন, গমগম করতে থাকা সাউন্ড সিস্টেম, বাইরের ভ্যাপসা গরমের আঁচ লাগতে না দেওয়া ভিতরের বাতানুকূল পরিবেশ, ঢেকে দেওয়া ছাদ আর আকাশি-নীল ও সাদার জনস্রোতের মধ্যে বসে ঘোর লেগে গিয়েছিল? দিবাস্বপ্ন দেখছিলাম?
না হলে সেই দিনটায় দাঁড়িয়ে কে ভেবেছিল, নিজেরই দেশবাসীর আক্রমণে ব্যথিত-রক্তাক্ত হয়ে অভিমান করে আচমকা সন্ন্যাস নিয়ে ফেলা সম্রাট লিয়ো ফিরে এসে এমন এক সাম্রাজ্য গড়ে তুলবেন। সেই অবসর ঘোষণার দশ বছর পরে শুধু রেকর্ড ষষ্ঠ বিশ্বকাপেই খেলবেন না, বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়ার নজিরও গড়ে ফেলবেন। কোপা ফাইনালে হারের সেই ভূকম্পনের মধ্যে দাঁড়িয়ে দূরতম দৃষ্টিতেও কি কেউ দেখতে পেয়েছিল যে, প্রত্যাবর্তনের পরে ক্যাবিনেটে একটা নয়, তিন-তিনটে ট্রফি ঝকমক করবে। একটা বিশ্বকাপ, দু’টো কোপা। উনচল্লিশেও এমন টগবগ করে ছুটছে ঘোড়া যে, চতুর্থ ট্রফি এবং দ্বিতীয় বিশ্বকাপ ঘরে ঢুকলেও অবাক হওয়ার নেই।
কাতারে জেতা বিশ্বকাপে তিনি একা সাতটি গোল করেছিলেন, এ বারে দু’টি দলের বিরুদ্ধে পাঁচটি গোলের পাঁচটিই তাঁর। প্লে স্টেশন-টেশনে এমন হয়, বাস্তবে বিশ্বকাপের মঞ্চে কী ভাবে সম্ভব? ধারাভাষ্য দিতে গিয়ে থিয়েরি অঁরি, জ়্লাটান ইব্রাহিমোভিচের মতো তারকারও ভাষা হারিয়ে ফেলছেন। দু’জনেই বলে দিলেন, ‘‘আর তর্ক-টর্ক নয়। ও সব এ বার বন্ধ হোক। মেসি এবং একমাত্র মেসিই সর্বসেরা।’’ ইব্রা আর অঁরি ক’দিন আগে স্টুডিয়োর মধ্যে যে রকম বল নাচিয়েছেন, সেই ভিডিয়ো সারা
দুনিয়ায় ভাইরাল। বিশ্ব ফুটবলে কোনও অংশে কম বড় তারকা নন এই দু’জন। তাঁরাও মেসি-মায়ায় আচ্ছন্ন। অন্তত সমসাময়িক প্রজন্মের কারও সঙ্গে যে তাঁর তুলনা আর করা যাবে না, রায় দিয়ে দিচ্ছেন তাঁরা। ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর সঙ্গেও নয়। একচল্লিশের রোনাল্ডো নয়, সেরা সময়ের সি আর সেভেনকেও দুই নম্বরে রাখছেন অঁরিরা। এক নম্বরে তর্কহীন ভাবে সম্রাট লিয়ো। যদি তাতেও বিশ্বাস না হয়, শুনুন ব্রাজ়িলের রোনাল্ডো কী বলছেন। ‘‘উনচল্লিশে এ সব কাণ্ড ঘটাচ্ছে মেসি। ওই বয়সে আমি খেলা ছেড়ে দিয়েছি চার বছর হয়ে গিয়েছে। আর ওজন হয়ে গিয়েছে ১২০ কিলো।’’ মিরোস্লাভ ক্লোজ়ে— যাঁর রেকর্ড ভাঙলেন মেসি, তিনি বলে দিয়েছেন, সর্বকালের সেরার হাতে গিয়েছে তাঁর রেকর্ড।
ম্যাচ শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও মাঠের মধ্যে অনেকক্ষণ থাকলেন মেসি। সমর্থকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে হাত নাড়ছিলেন, সতীর্থদের সঙ্গে আলিঙ্গন যেন শেষই হচ্ছিল না আর সারাক্ষণ সেই হাসিখুশি মেসি। সাইডলাইনের ধারে তখন ধারাভাষ্যের কাজে আসা প্রাক্তন ফুটবলার, কোচেরা রয়েছেন। টমাস মুলার এসে জড়িয়ে ধরলেন। ব্রাজ়িল বিশ্বকাপের ফাইনালে মুলারদের জার্মানি তাঁর স্বপ্নভঙ্গ করেছিল। মুলার কমেন্ট্রি বক্সে ঢুকে পড়েছেন, মেসি এখনও কাপ-অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন। য়ুর্গেন ক্লপ এসে হাত মেলালেন। এত বড় কোচ। তাঁর চোখেমুখেও সম্ভ্রম, শ্রদ্ধা।
এমনকি, আর্জেন্টিনার বেশ কয়েক জন সাংবাদিককে দেখা গেল মেসির দশ নম্বর লেখা জার্সি পরে ম্যাচ কভার করতে এসেছেন। জাতীয় দলের সেই জার্সি পরেই মিডিয়া ট্রিবিউনে বসে তাঁরা কাজ করলেন। আবার মাঠে দ্বিতীয় গোলের পরে দেখা যায়, মেসি সাইডলাইনের কাছে গিয়ে এক জনের সঙ্গে হাত মেলালেন। ইনিও এক জন সাংবাদিক। মেসি দ্বিতীয় গোল করার পরে নাকি কাজ ভুলে আনন্দে লাফিয়ে ওঠেন তিনি। দূর থেকে তা লক্ষ্য করে স্বয়ং নায়ক এসে হাত মিলিয়ে যান। ক্যানসাস সিটির পরে ডালাসেও বিভিন্ন জায়গায় তাঁর ‘মুরাল’ তৈরি করেছেন ভক্তরা। বিশ্বকাপে নজির উদ্যাপন করতে শহর জুড়ে বার্বিকিউ আর নাচ-গানের হুল্লোড় চলল অনেক রাত পর্যন্ত। আজ, বুধবার আবার মেসির ৩৯তম জন্মদিন। আর্জেন্টিনা তাদের বেসক্যাম্প ক্যানসাস সিটিতে সম্ভবত ফিরে যাবে। তার পরে আবার ডালাসে আসবে জর্ডন ম্যাচ খেলতে। কিন্তু তাঁর ভক্তরা এখানেই থাকছেন এবং বোঝাই যাচ্ছে কাউবয়েজ় টেক্সাসকে আরও রাঙিয়ে তুলবেন মেসির জন্মদিনে।
ছিয়াশি বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে দিয়েগো মারাদোনার ‘হ্যান্ড অব গড’ এবং সেই অমর গোলের চল্লিশতম বার্ষিকীতে মেসির বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়ার নজির গড়া নিশ্চয়ই গভীর আবেগের বলয় তৈরি করে দিল। কিন্তু ম্যাচের পরে ডালাস স্টেডিয়ামের বাইরে নাচতে থাকা, গাইতে থাকা আকাশি নীল ও সাদার জনসমুদ্রের মধ্যে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছিল, ফুটবল কেমন অভাবনীয় ভাবে দুই মহাতারকাকে মিলিয়ে দিয়ে গেল। এই আর্জেন্টিনীয় জনতাই তো একটা সময়ে তীব্র কটাক্ষ করে বলত, ‘‘দিয়েগো আমাদের ঘরের সন্তান, লিয়োনেল নয়। ওর জন্ম আর্জেন্টিনায় হলেও আসলে হৃদয় পড়ে থাকে স্পেনে।’’ ২০২২-এ কাতার বিশ্বকাপ জয় মারাদোনার
সিংহাসনের পাশে স্থান করে দেয় মেসির। আর এখন সেই বিরূপ জনতাই গান বেঁধে ফেলেছে, লিয়োর হাত ধরে কলঙ্কমুক্ত হবে দিয়েগো। ‘‘চুরানব্বইয়ে যে কাপটা ওরা জিততে দেয়নি, যে কাপটা ওরা ছিনিয়ে নিয়েছিল, সেই কাপ জেতাবে লিয়ো।’’ শুনতে শুনতে মনে হচ্ছিল, হলিউডের ছবিতেও এমন মোড় ঘোরানো দ্বিতীয়ার্ধ পাওয়া যায় না। মারাদোনার পাশে চিরকাল ‘ভিনদেশি’ আখ্যা পাওয়া আক্রান্ত এক তারকা। তাঁকে এখন মুক্তিদাতা হিসেবে দেখতে চায় দেশবাসী!
বিশ্বকাপে ২৮ ম্যাচে ১৮ গোল। ক্লোজ়ের ছিল ২৪ ম্যাচে ১৬ গোল। ব্রাজ়িলের রোনাল্ডো করেছিলেন ১৯ ম্যাচে ১৫ গোল। বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে কিলিয়ান এমবাপে ঘাড়ের উপর নিঃশ্বাস ফেলছেন। ১৬ ম্যাচে ১৬ গোল। কিন্তু মেসির ক্ষেত্রে চমকপ্রদ হচ্ছে, যত বয়স বাড়ছে ততই যেন গোলের দরজা বেশি করে খুলছে। এই ১৮ গোলের ১২টি এসেছে বয়স পঁয়ত্রিশ হয়ে যাওয়ার পরে। এর মধ্যে ১৪টি গোল বাঁ পায়ে করা। আর কোপা ফাইনালের পরে সেই অবসর ঘোষণা প্রত্যাহারের পরে বিশ্বকাপে ১৩টি গোল করেছেন। পণ্ডিতরা বলছেন, যত দুর্ভেদ্য চক্রব্যূহই তৈরি করো না কেন, মেসিকে আটকানো কঠিন।
ওহ্, বলতে ভুলে গিয়েছি, দশ বছর আগের সেই চিঠির প্রেরককে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, এখন মেসিকে চিঠি লিখলে কী লিখতেন? এনজ়ো ফার্নান্দেসের জবাব, ‘‘এখন লিখলে একটা পাতায় হত না। পুরো বই লিখে ফেলতাম!’’ কথাটা কে বললেন, এই আবেগের জলপ্রপাতের মধ্যে ঠিক মনে করতে পারছি না। কিন্তু একদম ঠিক বলেছেন— পৃথিবীটা লিয়োনেল মেসির। আমরা সবাই ভাগ্যবান, তাতে বাস করছি!