কুণাল বলতে উঠলে বিজেপির বিধায়কেরা খোঁচা দিতে শুরু করেন। শাসক শিবির থেকে ‘চোর’, ‘চোর’ স্লোগান উড়ে যায় বেলেঘাটার বিধায়কের উদ্দেশে। অধিবেশনে ‘প্রকৃত বিরোধী’র স্বীকৃতি পেতে সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে কুণাল পাল্টা বলেন, ‘‘তা হলে আমি নারদ-কাণ্ডে নামের তালিকা বলতে শুরু করি...।’’ ইঙ্গিত বুঝে শাসক শিবিরের প্রতিবাদ বেড়ে যায় কয়েক গুণ। তবে কুণালের লক্ষ্য যে তৃণমূলেরই অন্য অংশ, তা স্পষ্ট করে তিনি রাজ্যপালের বক্তৃতার নারী সুরক্ষা ও দুর্নীতি বিরোধী অংশ টেনে বলেন, ‘‘নারী নিগ্রহের সব অভিযোগের তদন্ত হোক।’’ সেই সূত্রেই ঋতব্রতের নাম উল্লেখ
করেন তিনি।
বক্তৃতায় ঋতব্রতও নিশানা করেছেন কালীঘাটের তৃণমূলকে। নাম না করেও নির্বাচনী পরাজয় অস্বীকার করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে অবস্থান নিয়েছিলেন, তাকে গণতন্ত্র-বিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করেছেন বিরোধী দলনেতা। এ বারের ভোটে জনাদেশ মেনে নিয়ে, দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ‘‘এক ভুঁইফোঁড় মাফিয়ার সীমাহীন দুর্নীতি ও ঔদ্ধত্যের কারণে আমরা হেরেছি!’’ সেই সূত্রে শাসক ও মুখ্যমন্ত্রীর উদ্দেশে তিনি আরও বলেন, ‘‘চার্টার্ড ফ্লাইট-খ্যাত সেই মাফিয়ার কৃতকর্মের ফল যেন সাধারণ মানুষকে ভুগতে না হয়, সরকারকে তা নিশ্চিত করতে হবে।’’ পরে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু যখন অন্যায় ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থান জানান, তাঁর বক্তৃতার মধ্যেই দাঁড়িয়ে কিছু বলতে চেয়েছিলেন কুণাল। মুখ্যমন্ত্রী সুযোগ দিলে কুণাল তখন স্বীকৃত বিরোধী শিবিরে থাকা তৃণমূলের বিধায়কদের একাংশের বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগের তদন্ত নিশ্চিত করতে চেয়েছেন!
অধিবেশনের প্রথমার্ধে বিরোধী হিসেবে কুণালেরা নজর কাড়লেও দ্বিতীয়ার্ধে মুখ্যমন্ত্রীর বক্তৃতা চলাকালীন ওয়াকআউট করে পাল্টা কৌশল নিয়েছেন ঋতব্রতেরা। বিরোধীদের এই অবস্থা দেখে হাসতে হাসতে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‘কালীঘাট তৃণমূল থেকে গেল, আসল দাবি করা তৃণমূল পালিয়ে গেল!’’
বিধানসভার অধিবেশন শেষ হওয়ার পরে রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক (সিইও) নীলম মিনার সঙ্গে দেখা করে তাঁদের নবগঠিত জাতীয় কর্মসমিতির তালিকা জমা দিয়েছেন ঋতব্রতেরা। নির্বাচন কমিশনের নিয়ম মেনে দলের অধিবেশনের পরে নেতৃত্বের কমিটির কথা জানাতে হয়। বিদ্রোহীদের দাবি, নিউ টাউনের একটি হোটেলে সোমবার ‘বিশেষ অধিবেশন’ ডেকে সেই কমিটিই গড়েছেন তাঁরা এবং সেটাই ‘আসল’ তৃণমূল। সূত্রের খবর, এর পরে বিদ্রোহীরা যেতে পারেন জাতীয় নির্বাচন কমিশনে। কালীঘাটপন্থী তৃণমূলের তরফে সোমবারই কমিশনের কাছে পাঠানো হয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে গঠিত জাতীয় কর্মসমিতির তালিকা। যেখানে ফিরহাদ হাকিম, অরূপ বিশ্বাসদের বাদ দেওয়া হয়েছে, তাঁরা বিদ্রোহী শিবিরে চলে যাওয়ায়। কালীঘাটপন্থীদের যুক্তি, তৃণমূল প্রতিষ্ঠার সময় থেকে মমতাই নেত্রী এবং নির্দিষ্ট সময় অন্তর তা কমিশনকে জানানো হয়। এখানে অন্য কোনও তৃণমূলের প্রশ্ন নেই!
কালীঘাটপন্থী তৃণমূলের তরফে বিধানসভার স্পিকারকে আবার চিঠি দেওয়া হয়েছে দলের সচেতক পদে মদন মিত্রের নাম প্রস্তাব করে। ওই পদে আগে ফিরহাদের নাম মনোনীত করে পাঠিয়েছিলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক। কিন্তু ফিরহাদ বিদ্রোহী শিবিরে চলে গিয়েছেন, আর বিধানসভার তরফে বিরোধী দলের সচেতকের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে আখরুজ্জামানকে। অন্য দিকে, কালীঘাটপন্থী তৃণমূলের সব পদ ছেড়ে আগেই মমতাকে চিঠি পাঠিয়েছিলেন তাঁর পুরনো সঙ্গী জ্যোতিপ্রিয় (বালু) মল্লিক। এ বার তিনি এসে দেখা করেছেন ঋতব্রতের সঙ্গে। তবে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু এ দিন বিদ্রোহীদের কয়েক জনকে সাক্ষাতের সময় দিলেও বালুকে দেখা করার
সময় দেননি।
বিভক্ত প্রধান বিরোধী শিবিরের এই অবস্থার মধ্যে সংখ্যায় কম হলেও কিছু প্রশ্ন তুলেছে আইএসএফ, সিপিএম ও কংগ্রেস। মুখ্যমন্ত্রীর উদ্দেশে আইএসএফের নওসাদ সিদ্দিকী জানতে চান, ইস্কনের মতো প্রতিষ্ঠানের হাতে দায়িত্ব দিয়ে সরকার কি মিড-ডে মিলে নিরামিষ খাবারের ব্যবস্থা করছে? সেই সঙ্গেই হকার উচ্ছেদের আগে আইন মেনে পুনর্বাসসন ও ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করার দাবিও তুলেছেন তিনি। সিপিএমের মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘‘রাজ্যপালের ভাষণে বা বাজেটে সরকারের সমকাজে সমবেতনের নীতির প্রতিফলন থাকা উচিত ছিল।’’ বিজেপির সজল ঘোষ তাঁর কেন্দ্রের হাসপাতাল ও রাস্তাঘাটের দুর্দশার কথা উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। একই ভাবে ব্যারাকপুরের বিধায়ক কৌস্তভ বাগচীও তাঁর কেন্দ্রে বন্ধ পাটকল নিয়ে সরকারের
হস্তক্ষেপ চেয়েছেন।