প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্যের পরে। দু’দেশের মন্ত্রীরাও এমন ভাবে সেমিফাইনাল নিয়ে বাগ্যুদ্ধে জড়িয়ে গিয়েছেন যে, মনে হচ্ছে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে না প্রভাব ফেলে। ফ্রান্স-স্পেন শুধুই ফুটবলের লড়াই, এর পরেও কী করে বলবেন? সঁজে লিজ়ের আশেপাশে নিরাপত্তা বাড়িয়ে দিতে হয়েছে। ফ্রান্সের বিদেশমন্ত্রী জঁ নোয়েল বারো পাল্টা বলেছেন, ‘‘স্পেনের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীকে যোগ্য জবাব দেবে আমাদের ফুটবল টিমই।’’ অন্যরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, ‘‘বিশ্বকাপের জন্য যে ২৬ জন ফুটবলারকে দলে নেওয়া হয়েছে, তার ২৩ জনের জন্ম ফ্রান্সে।’’ এখানেই শেষ নয়, এ বারের বিশ্বকাপে ফ্রান্সে জন্ম, এমন প্রচুর ফুটবলার নানা দেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন, সেই হিসাবও তুলে ধরা হচ্ছে। এ বারের বিশ্বকাপে ফ্রান্সে জন্মগ্রহণ করা ১০২ জন ফুটবলার বিভিন্ন দেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করেছেন। অর্থাৎ, এ বারের বিশ্বকাপে খেলা ফুটবলারদের ৮ শতাংশ জন্মসূত্রে ফ্রান্সের সঙ্গে জড়িত। এর মধ্যে অনেক ফুটবলার শুধু জন্মগ্রহণ করাই নয়, বেড়ে ওঠেন ফ্রান্সে, এমনকি কৈশোর পেরিয়ে ফুটবলের পাঠও সেখানে নিয়ে তার পর অন্য দেশের হয়ে খেলতে চলে যান। স্পেনের বিশ্বকাপ দলেও ফ্রান্সে জন্ম হওয়া একজন ফুটবলার আছেন— আমেরিক লাপোর্ত। হাইতি দলে জন্মসূত্রে ১৩ জন ফরাসি ফুটবলার খেলেছেন, ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোতে ১১ জন, সেনেগালে ১০ জন, মরক্কোর হয়ে খেললেন ৬ জন। ‘‘ফ্রান্স ধর্ম বা বর্ণের ভিত্তিতে মানুষকে আলাদা করে দেখে না। ফ্রান্সের হয়ে যারা খেলছে, তারা প্রত্যেকে ফরাসি। জানি বর্ণবিদ্বেষপ্রিয় লোকেদের সেটা ভাল লাগবে না,’’ পাল্টা খোঁচা দিয়েছেন ফরাসি সোশ্যালিস্ট পার্টির প্রধান
অলিভিয়ে ফর।
রাজনৈতিক নেতাদের তরজায় সাময়িক ভাবে আড়ালে চলে গিয়েছে ফুটবলের দ্বৈরথ। না হলে অনেক বেশি হইচই হওয়ার কথা ছিল এমবাপে বনাম ইয়ামাল সাক্ষাৎ নিয়ে। এক জন ফ্রান্সের ফুটবল সম্রাট তো অন্য জন স্প্যানিশ ফুটবলের ‘পোস্টার বয়’। স্পেনের দুর্ভেদ্য রক্ষণ, যারা এখনও পর্যন্ত মাত্র একটি গোল খেয়েছে, তারা কি পারবে এমবাপের রথ থামাতে? ফুটবলমহল যেমন সেই প্রশ্নের উত্তর পেতে কৌতূহলী তেমনই এখনও পর্যন্ত বিশ্বকাপে তুলনামূলক ভাবে শান্ত থাকা ইয়ামাল বড় ম্যাচের নায়ক হয়ে উঠতে পারেন কি না, তা নিয়েও জোর চর্চা। বেলজিয়ামকে হারিয়ে উঠে ইয়ামাল হুঙ্কার ছেড়েছিলেন, ‘‘যদি ফ্রান্স কাউকে ভয় পায় তো সেটা আমাদেরই।’’ ফ্রান্সের আদ্রিয়ে র্যাবো এ দিন পাল্টা বলে গেলেন, ‘‘ইয়ামালের জন্য আলাদা করে কোনও পরিকল্পনা নেই আমাদের। যা আছে পুরো স্পেন দলকে নিয়ে আছে।’’ ইয়ামালের সঙ্গে বার্সেলোনায় খেলেন জুলে কুন্ডে। ‘‘যদি ফ্রান্স কাউকে ভয় পায় তো সেটা স্পেন’’— এই কথার মধ্যে কি ফ্রান্সকে তাচ্ছিল্য করার ইঙ্গিত আছে? অসম্মান করা হল? কুন্দে বলেন, ‘‘আমি ইয়ামালকে খুব ভাল করে চিনি। ও অসম্মান করে না কাউকে। এ ভাবেই আত্মবিশ্বাসী থাকার চেষ্টা করে, দলকে চাঙ্গা রাখে।’’ যদিও ইয়ামালের চেয়েও বেশি করে স্পেনের তুরুপের তাস এখন সুপারসাব মিকেল মেরিনো। বিশ্বাস করা যায়, মাত্র ৯ মিনিট মাঠে কাটিয়েছেন তিনি, তার মধ্যেই দু’টো গোল করে পর-পর দু’দিন জিতিয়েছেন মেরিনো! ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর পর্তুগাল এবং রোমেলু লুকাকুদের বেলজিয়ামের বিরুদ্ধে।
ফরাসি সাংবাদিকদের কয়েক জনের সঙ্গে কথা বলে আবার মনে হচ্ছে, মাঠের এমবাপেকেই এত দিন শুধু দেখছে সকলে। অন্য এক জন এমবাপেও আছেন, যাঁকে স্টেডিয়ামে বসে বা টিভিতে দেখা যাচ্ছে না। দিদিয়ে দেশঁ যদি চাণক্য হন, তা হলে তিনি এমবাপে এই ফ্রান্স দলটার চন্দ্রগুপ্ত। যিনি নিজে বিশ্বকাপে ফরসি বিপ্লবের নকশা স্থির করায় সক্রিয় ভাবে অংশ নিচ্ছেন। দু’টো ছবির কথা ফরাসি সাংবাদিকদের মুখ থেকে শুনলাম। সেনেগালের বিরুদ্ধে প্রথম ম্যাচের পরের দিন দু’টো দলে ভাগ করে ফ্রান্সের অনুশীলন চলছিল। এমবাপে কোনও গ্রুপেই ছিলেন না। তিনি তখন গ্যালারিতে সহকারী কোচেদের সঙ্গে সেনেগাল ম্যাচের বিশ্লেষণে ব্যস্ত ছিলেন। অন্য দৃশ্যটি উড়ানের ভিতরের। ইরাকের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় ম্যাচ খেলে ফিলাডেলফিয়া থেকে বস্টনে তাদের বেসক্যাম্পে ফিরছিল ফ্রান্স দল। এমবাপেকে দেখা যায় কোচিং টিমে দেশঁর ডানহাত গায় স্তেফান এবং মাইকেল ওলিসেকে ডেকে নিয়ে মাঝআকাশেই আলোচনা করছেন। এ বারের বিশ্বকাপে এখনও পর্যন্ত ১৬টি গোল করেছে ফ্রান্স। এমবাপে-দেম্বেলে-ওলিসে-দুয়েদের নিয়ে তৈরি আক্রমণ ভাগকে সেরা মনে করছেন পণ্ডিতরা। দেখা যাচ্ছে, ফ্রান্সের বেশির ভাগ গোল এবং গোলমুখী আক্রমণের নেপথ্যে এমবাপে-ওলিসে জুটি। বোঝাই যাচ্ছে, উড়ানের মধ্যে কী কারণে বিশ্বস্ত সৈনিককে নিয়ে জরুরি বৈঠকে বসেছিলেন সেনাপতি!
দেশঁকে নিয়ে তেমনই শুনছিলাম, কী ভাবে খোলামেলা আবহে তিনি বিশ্বকাপের প্রস্তুতিতে রাখতে চেয়েছেন ফুটবলারদের। বস্টনে শহরের কেন্দ্রস্থলে টিম হোটেল বেছেছেন, অথচ বেশির ভাগ কোচেরা শহর থেকে দূরে, লোকচক্ষুর আড়ালে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। যখন তাঁকে ফরাসি ফুটবল সংস্থার এক শীর্ষ কর্তা জিজ্ঞেস করেছিলেন, শহরের মধ্যিখানে কেন হোটেল চাইছেন, তখন দেশঁ উত্তর দেন, ‘‘আমার টিম তারুণ্যে ভরা, ওদের সিটি সেন্টারে থাকতে হবে। শহর থেকে দূরে থাকলে ওরা ঝিমিয়ে পড়বে।’’ অন্য দলের ফুটবলারদের যখন মাঠের বাইরে দর্শন পাওয়া যাচ্ছে না, ফ্রান্সের ফুটবলারদের তখন বস্টনের সিটি সেন্টারের আশেপাশে ঘুরে বেড়াতে দেখা যাচ্ছে প্রায়ই। ফ্রান্স যে বস্টনকে বেসক্যাম্প হিসেবে বেছে নিয়েছে, তার পিছনে দেশঁর মস্তিষ্ক। উড়ানে অন্যান্য শহরে যেতে বস্টন থেকেই সব চেয়ে কম সময় লাগে। সব এক থেকে দেড় ঘণ্টার যাত্রা। একমাত্র সেমিফাইনাল খেলতে ডালাস যেতেই তিন ঘণ্টা মতো লেগেছে উড়ানে। সেই তুলনায় স্পেনকে প্রায় পনেরো হাজার কিলোমিটার ভ্রমণ করতে হয়েছে, সাড়ে ছাব্বিশ ঘণ্টা মতো আকাশে থাকতে হয়েছে। বিশ্বকাপ শুধু মাঠেই খেলা হয় না, প্রায় দেড় মাস ধরে চলা প্রতিযোগিতায় অন্য দিক থেকে কার কতটা ধকল যাচ্ছে, সেগুলোও অনেক ফারাক গড়ে দেয়।
ফ্রান্সের যদি দেশঁ থাকে, তা হলে স্পেনেরও আছে লুইস দে লা ফুয়েন্তে। তিকিতাকার আবেগ আঁকড়ে পড়ে না থেকে জমাট রক্ষণ আর সুপারসাবের অস্ত্রসজ্জায় স্পেনকে সাজিয়েছেন তিনি। এখনও পর্যন্ত দারুণ সফল তাঁর নকশা। নেশন্স লিগ, ইউরো জিতেছেন, এ বার বিশ্বকাপেও সেমিফাইনাল। এমবাপে-দেম্বেলে-ওলিসেদের বর্গী আক্রমণের সামনে অগ্নিপরীক্ষা তাঁর। দেশঁর মতোই ফুটবলারদের স্বাধীনতা দেওয়ায় বিশ্বাসী তিনি। কয়েক দিন আগে সাংবাদিক সম্মেলনে বলেন, ‘‘যে জিনিস মৌচাকের জন্য ক্ষতিকারক, তা মৌমাছির জন্যও ভাল নয়।’’ বোঝাতে চেয়েছিলেন, আমার যা ভাল লাগে না, তা ছেলেদের উপর চাপিয়ে দেব কেন? রোমান সম্রাট মার্কাস অরেলিয়াস সম্পর্কে একটি বইতে এই কথাটি পড়েছিলেন দে লা ফুয়েন্তে।
বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল শুধু এমবাপে, দেম্বেলে, ইয়ামাল, মেরিনোদের লড়াই নয়। দুই চাণক্যেরও দ্বৈরথ!