জোড়া বিপদ
পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধের ধাক্কায় ভারতে জ্বালানি ও সামগ্রিক উৎপাদন-ব্যয় ইতিমধ্যেই বিপজ্জনক স্তরে পৌঁছেছে। সেই চাপ যখন ক্রমে সম্পূর্ণ ভাবে খুচরো বাজারে পৌঁছচ্ছে, তখনই এল নিনিয়োর কারণে খাদ্যপণ্যের জোগানে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে। জুনে দেশে বৃষ্টি স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ কম হয়েছে— ১৯০১ সালের পর পঞ্চম সর্বনিম্ন। জুনের শেষ থেকে বৃষ্টি বাড়ায় ঘাটতি কিছুটা কমেছে ঠিকই, কিন্তু খরিফ চাষ এখনও পিছিয়ে, বিশেষত ডাল, তৈলবীজ ও তুলোয়। জুলাইয়েও স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে। এল নিনিয়ো আরও শক্তিশালী হলে বিপদ শুধু খরিফ ফসলে আটকে থাকবে না। বৃষ্টির ঘাটতি এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে শীত যদি অপেক্ষাকৃত উষ্ণ এবং সংক্ষিপ্ত হয়, তবে গম, সর্ষে, ছোলা, মসুর, আলুর মতো রবি ফসলও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অর্থাৎ, এক দিকে যুদ্ধ উৎপাদনের খরচ বাড়াচ্ছে, অন্য দিকে প্রতিকূল আবহাওয়া খাদ্যপণ্যের জোগান কমাতে পারে। মূল্যস্ফীতির দুই উৎস একই সময়ে সক্রিয় হওয়ায় পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক হয়েছে।
অপরিশোধিত তেল ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি পরিবহণের খরচ বাড়ায়, সারের দাম ও কৃষি উৎপাদনের অন্যান্য ব্যয়কে প্রভাবিত করে; সেই অতিরিক্ত খরচ ক্রমে পণ্যের দামে পৌঁছয়। তারই মধ্যে কম বৃষ্টি যদি কৃষি উৎপাদন হ্রাস করে, তবে একই সঙ্গে জোগান কমবে এবং উৎপাদনের খরচ বাড়বে। ভারতের ক্ষেত্রে ঝুঁকিটি আরও বেশি। ভোজ্য তেল এবং ডালের চাহিদা মেটাতে দেশকে বিপুল পরিমাণ আমদানির উপর নির্ভর করতে হয়। অভ্যন্তরীণ উৎপাদনে ঘাটতি হলে আরও আমদানি অনিবার্য; কিন্তু অস্থির আন্তর্জাতিক বাজার এবং টাকার বিনিময় হারের উপরে চাপ সেই পথটিকেও ব্যয়বহুল করে তুলতে পারে। ২০২৩-২৪ সালের শক্তিশালী এল নিনিয়োর সময় এবং তার পরবর্তী পর্যায়ে উচ্চ হারে খাদ্য-মূল্যস্ফীতির ঘটেছিল। ফলে, যুদ্ধ অথবা এল নিনিয়ো— কোনটি বড় বিপদ, সেই তুল্যমূল্য বিচারে না গিয়েও বলা চলে, একটি যে পথে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি করছে, অন্যটি সেই পথকেই আরও প্রশস্ত করতে পারে। জ্বালানি থেকে খাদ্য— মূল্যবৃদ্ধির পরিধি বিস্তৃত হলে রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্কের কাজও কঠিন হবে। সুদের হার দিয়ে সরবরাহের সঙ্কট মেটানো যায় না; অথচ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের দায় তারই। এই দ্বন্দ্ব যত তীব্র হবে, আর্থিক বৃদ্ধির উপরে চাপও তত বাড়বে।
যুদ্ধ থামানো ভারত সরকারের হাতে নেই, এল নিনিয়োও নিয়ন্ত্রণাতীত। কিন্তু, দুই বহিরাগত ধাক্কার অভিঘাত সামলানোর প্রস্তুতি সম্পূর্ণতই নীতিনির্ধারণের প্রশ্ন। মূল্যবৃদ্ধি ঘটে যাওয়ার পরে আমদানি শুল্ক কমানো বা সরকারি ভান্ডারে মজুত খাদ্যপণ্য বাজারে ছেড়ে দাম নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা যথেষ্ট নয়। ডাল ও ভোজ্য তেলের জোগান নিশ্চিত করা, প্রয়োজনে আগাম আমদানির ব্যবস্থা রাখা, কৃষককে কার্যকর মূল্য-সুরক্ষা দেওয়া, জলসাশ্রয়ী ফসলে চাষের প্রণোদনা বাড়ানো এবং ফসল বিমা ও গ্রামীণ কর্মসংস্থান প্রকল্পকে বাস্তবে কার্যকর রাখার কাজ এখনই করতে হবে। দীর্ঘ দিন ধরে ডাল ও ভোজ্য তেলে আমদানি-নির্ভরতা কমাতে না-পারা কৃষি অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতা; অনুকূল আবহাওয়ায় তাকে আড়াল করা যায়, সঙ্কটের সময়ে নয়। কেন্দ্রীয় সরকার উচ্চ আর্থিক বৃদ্ধিকে তার অর্থনৈতিক সাফল্যের প্রধান প্রমাণ হিসাবে তুলে ধরেছে। এ বার পরীক্ষা, সেই বৃদ্ধি অর্থনীতির ধাক্কা সহ্য করার ক্ষমতা কতখানি বাড়িয়েছে। অনুমান, পরিস্থিতি সম্পূর্ণ হাতের বাইরে গেলে কেন্দ্রীয় সরকার যুদ্ধ ও এল নিনিয়োকে দায়ী করবে। কিন্তু, খাদ্য-মূল্যস্ফীতি ফের দীর্ঘস্থায়ী হলে সমস্ত দায় আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি এবং প্রকৃতির ঘাড়ে চাপানো চলে না। ধাক্কা বহিরাগত হতে পারে; তার অভিঘাত কতখানি অসহনীয় হয়ে ওঠে, সেই প্রশ্নের উত্তর বহুলাংশ অর্থনৈতিক পরিচালনার উপরে নির্ভরশীল।