উৎস পশ্চিমে
সোমা মুখোপাধ্যায়ের প্রবন্ধ ‘কিছুই কি নেই বাকি’ প্রসঙ্গে কিছু কথা। বাংলায় রাজনৈতিক বিতর্ক, সংঘাত ও হিংসার দীর্ঘ ইতিহাস থাকলেও ডিম, কাদা বা টমেটো ছুড়ে প্রকাশ্যে কাউকে হেনস্থা করার নজির প্রায় নেই বললেই চলে। এই ধরনের প্রতিবাদের উৎস মূলত ইউরোপীয় রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে। সেখানে প্রতীকী প্রতিবাদ হিসাবে ডিম বা টমেটো নিক্ষেপের ঘটনা দেখা গিয়েছে। তবে কোনও গণতান্ত্রিক সমাজেই এ ধরনের আচরণ গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। আইন নিজের পথে চলবে— এটাই সভ্য সমাজের মূলনীতি। সবচেয়ে নিন্দিত ব্যক্তিও যেন আইনের কাঠামোর মধ্যেই বিচার ও শাস্তি পান, তা নিশ্চিত করা প্রশাসনের দায়িত্ব।
সুপ্রিয় দেবরায়
বরোদা, গুজরাত
উত্তরণের পথ
শহর জুড়ে হকার উচ্ছেদ অভিযান পুনরায় এক জটিল আর্থ-সামাজিক বিতর্ককে সামনে এনেছে। ফুটপাত দখলমুক্ত করে নাগরিকদের নির্বিঘ্ন চলাচলের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া যেমন জরুরি, তেমনই লক্ষ লক্ষ ক্ষুদ্র বিক্রেতার জীবিকা রক্ষা করাও রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব। দুর্ভাগ্যজনক ভাবে, আলোচনাটি প্রায়শই ‘উচ্ছেদ’ বনাম ‘উচ্ছেদ নয়’— এই দ্বৈত তর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়। অথচ সমস্যাটি আরও গভীর ও বহুমাত্রিক।
সময়ের সঙ্গে এই অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি নগরজীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। আজ হকাররা এমন এক সমান্তরাল বাজারব্যবস্থা গড়ে তুলেছেন, যেখানে কম দামে পণ্যপ্রাপ্তি, সহজলভ্যতা এবং দরদামের সুযোগের কারণে একটি বৃহৎ ও স্থায়ী ক্রেতাগোষ্ঠী তৈরি হয়েছে। বৃহৎ শপিং মল বা সংগঠিত বাজারে যে দরদামের সুযোগ থাকে না, হকারদের বাজারে তা এখনও বিদ্যমান।
একই সঙ্গে এটাও সত্য যে, অনিয়ন্ত্রিত হকারি পথচারীদের দুর্ভোগ বাড়ায়, যান চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে এবং নাগরিক পরিসর সঙ্কুচিত করে। তাই সমস্যাটিকে শুধু আইন-শৃঙ্খলা বা সৌন্দর্যায়নের প্রশ্ন হিসাবে দেখলে চলবে না। এটি কর্মসংস্থান, নগর পরিকল্পনা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং মানবিক মর্যাদারও প্রশ্ন। অন্যান্য জটিল সামাজিক সমস্যার মতোই বিষয়টিকেও বৃহত্তর সমাজ-অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে বিচার করতে হবে এবং হকার সম্প্রদায়কে উন্নয়নের মূল স্রোতের অংশীদার হিসাবে গড়ে তোলার উদ্যোগ চাই।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, হকার সমস্যা আসলে কর্মসংস্থান ও সামাজিক গতিশীলতার সমস্যা। প্রশ্ন হল— আগামী বিশ বছরে আমরা কি এমন একটি সমাজ গড়ে তুলতে পারব, যেখানে হকারের সন্তান অনিশ্চয়তার পেশায় আসতে বাধ্য হবে না? আজও বহু হকার পরিবার স্টেশন-সংলগ্ন এলাকা, ফুটপাত বা অস্থায়ী ঝুপড়িতে বসবাস করে। তাঁদের সন্তানদের অনেকেই মানসম্মত শিক্ষা, স্বাস্থ্যপরিষেবা এবং দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ থেকে বঞ্চিত। ফলে দারিদ্রের উত্তরাধিকার এক প্রজন্ম থেকে আর এক প্রজন্মে বহমান থাকে।
এই কারণেই স্টেশনে ফল, চা, আনাজ বা সামান্য খাদ্যসামগ্রী বিক্রি করে কোনও মতে পরিবার চালানো মানুষদের উপর অতিরিক্ত আর্থিক বোঝা চাপানোর পরিবর্তে তাঁদের সন্তানদের শিক্ষার সুযোগ, বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ, দক্ষতা উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসুরক্ষার উপর জোর দেওয়া প্রয়োজন। লক্ষ্য হওয়া উচিত, তাঁদের পরবর্তী প্রজন্ম যেন বৃহত্তর অর্থনীতির অংশ হয়ে বিকল্প ও মর্যাদাপূর্ণ জীবিকার সুযোগ পায়।
এ কথাও মনে রাখা প্রয়োজন, পর্যাপ্ত পুনর্বাসন ও বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা ছাড়া বৃহৎ আকারে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হলে তার সামাজিক অভিঘাত সুদূরপ্রসারী হতে পারে। হাজার হাজার পরিবার হঠাৎ জীবিকাহীন হয়ে পড়লে অর্থনৈতিক হতাশা, বেকারত্ব এবং সামাজিক অস্থিরতা বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সমাজের উপর আরও গভীর হতে পারে। তাই উচ্ছেদের আগে পুনর্বাসনের বাস্তবসম্মত এবং স্বচ্ছ রূপরেখা থাকা আবশ্যক।
এই জটিল সমস্যার সমাধান শুধুমাত্র প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে সম্ভব নয়। অর্থনীতিবিদ, সমাজবিজ্ঞানী, নগর পরিকল্পনাবিদ, বিভিন্ন চেম্বার অব কমার্স, হকার সংগঠন, নাগরিক প্রতিনিধি, অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এবং অভিজ্ঞ পুলিশ আধিকারিকদের অংশগ্রহণে একটি বিস্তৃত আলোচনা প্রয়োজন।
অলোককুমার মুখোপাধ্যায়
সোদপুর, উত্তর ২৪ পরগনা
কোথায় মানুষ?
মানবিকতা যেন দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে। কোথাও অসহায় শিশু ও নারী সীমান্তে অনাহারে কাঁদছে, কোথাও মানুষকে জুতোর মালা পরিয়ে ঘোরানো হচ্ছে, কোথাও আবার সামান্য অপরাধের জন্য অসামঞ্জস্যপূর্ণ শাস্তি দেওয়া হচ্ছে। ব্যক্তি-কুৎসা, ব্যক্তিগত আক্রোশ এবং বিভ্রান্তিকর প্রচার আজ সমাজমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, যা দেশ, রাজ্য ও সমাজ— সকলের পক্ষেই অত্যন্ত ক্ষতিকর।
কিন্তু এক সময় তো এই সমাজেই মানবিক বোধ, সহানুভূতি, সংবেদনশীলতা এবং অন্যের পাশে দাঁড়ানোর মমত্ববোধ ছিল। আজ তবে সেই মূল্যবোধগুলি কোথায় হারিয়ে গেল? মানবিক মানুষের সংখ্যা কি সত্যিই সমাজে ক্রমশ কমে আসছে? যদি তা-ই হয়, তবে নিঃসন্দেহে আমরা এক গভীর সামাজিক সঙ্কটের দিকে এগিয়ে চলেছি। মানবিকতার এই অবক্ষয় রোধ করা আজ শুধু রাষ্ট্রের নয়, সমাজের প্রতিটি মানুষেরও দায়িত্ব।
স্বপন আদিত্য কুমার বিশ্বাস
অশোকনগর, উত্তর ২৪ পরগনা