অলঙ্ঘনীয়
ভারতের ট্রেন, রেললাইন, স্টেশন চত্বরে পরিচ্ছন্নতা রক্ষা করা বড় কঠিন কাজ। রেললাইনের উপরে প্লাস্টিকের বোতল, স্টেশনে খাবারের প্যাকেট, ফাটা চা কফির কাপ ও তার থেকে গড়ানো তরল, ডাঁই করা আবর্জনা, পানের পিক— এগুলি তো স্বোদ্ভূত নয়, যাত্রীরাই ফেলেন। গত কয়েক মাস নাগাড়ে প্রচার, আধ ঘণ্টায় ময়লা পরিষ্কারের চ্যালেঞ্জ ইত্যদি পদক্ষেপের পর এই ক্ষেত্রটিতে যাত্রীদের আর্থিক দণ্ডের আওতায় আনল পূর্ব রেল। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী স্বচ্ছতার বিধি ভাঙতে দেখলে ২০০ টাকা জরিমানা করা হবে। সিসি ক্যামেরায় তোলা ছবির পাশাপাশি সমাজমাধ্যমেও দোষীর ছবি পাঠানো যাবে। দেশে যখন জন-আচরণ কোনও ভাবেই বদলানো যাচ্ছে না, তখন পরিচ্ছন্নতা বজায়ে প্রযুক্তির ব্যবহার ও আর্থিক শাস্তি লাগবে, উপায় কী। ট্র্যাফিক আইন ভাঙলে যেমন ধরা পড়লে জরিমানা দিতে হয়, তেমনই অন্যান্য নাগরিক সংস্কৃতিতেও শৃঙ্খলার বোধ তৈরিতে জরিমানার ভয় প্রয়োজন।
যাত্রীর আচরণ যেমন সমস্যার উৎস, তেমনই এই পরিস্থিতির জন্য রেলের পরিকাঠামো ও পরিষেবার সীমাবদ্ধতার দায়ও কম নয়। অনেক স্টেশনেই ডাস্টবিন উপচায়, কখনও তা একেবারেই অমিল। দীর্ঘ প্ল্যাটফর্মে শৌচালয় প্রায়ই দূরে থাকে, সংখ্যায় কম হওয়ায় লাইনও পড়ে। আবর্জনা, শৌচালয় নিয়মিত পরিষ্কারের, বা ট্রেন, প্ল্যাটফর্ম সাফাইয়ে গাফিলতির অভিযোগও রয়েছে। ফলে, প্রশাসনের আত্মবীক্ষণও জরুরি। সিসি ক্যামেরা, ওয়টস্যাপের ছবিতে যদি যাত্রীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা করা হয় তবে একই সূত্রে প্রাপ্ত প্রমাণের ভিত্তিতে জানা সম্ভব কোন স্টেশনে ডাস্টবিন পরিষ্কার করা প্রয়োজন, কোন কামরায় জল উপচাচ্ছে, কোথায় শৌচালয় পূতিগন্ধময়। এবং, কোন ঠিকাদার বা কর্মী নিজ দায়িত্ব পালন করেননি তাও জানা সম্ভব। তাঁদের জবাবদিহির বা শাস্তির ব্যবস্থাতেও সমান কঠোরতা ও নিরপেক্ষতার নিদর্শন বজায় রেখে রেলকে নিজ প্রতিশ্রুতিতে অটল থাকতে হবে। দেশের আর এক সমস্যা দুর্নীতি। কর্মীদের জরিমানা করার ক্ষমতা দিলে তা অপব্যবহারের ঝুঁকিও অস্বীকার করা যায় না। অতএব, জরিমানার ডিজিটাল নথি, সিসিটিভির প্রমাণ, অনলাইনে রসিদ সংরক্ষণের ও অভিযোগ জানানোর প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা প্রয়োজন।
বিশ্বের বহু দেশেই প্রশাসন ও নাগরিকের যৌথ দায়িত্বে পরিচ্ছন্নতা রক্ষার নাগরিক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। কড়া জরিমানার মাধ্যমে জনপরিসরে পরিচ্ছন্নতা রক্ষার কর্তব্যবোধ ফেরে ঠিকই, তবে বহু দেশে পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন রক্ষণাবেক্ষণও ত্রুটিহীন। ভিয়েতনাম, রুয়ান্ডার মতো দেশগুলিও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় চমকপ্রদ উন্নতি করেছে। ভারতের পক্ষে তা অসম্ভব হবে কেন? তবে, রেলকে যেমন পর্যাপ্ত সংখ্যায় ময়লা ফেলার পাত্র, নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ নিশ্চিত করতে হবে, তেমনই নাগরিককেও সেই পরিষেবাকে সম্মান করা শিখতে হবে। শৌচালয় যদি স্টেশনের অন্য প্রান্তে থাকে তবে সেখানে হেঁটে যাওয়ার পরিশ্রমটুকু করতে হবে। ডাস্টবিন যদি কামরার দরজার কাছে থাকে তবে আসন থেকে উঠে গিয়েই বর্জ্য ফেলে আসতে হবে। কোনও অজুহাতেই প্ল্যাটফর্ম নোংরা করা বা ব্যবহৃত সামগ্রী জানলা দিয়ে লাইনে ছুড়ে ফেলা যাবে না। জনপরিসর পরিষ্কার রাখা সমাজে বসবাসের একটি মৌলিক শর্ত, যা অলঙ্ঘনীয়।