পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পালাবদলের পর অর্থনীতি নিয়ে আশাবাদ বেড়েছে। নতুন সরকার শিল্পায়ন করবে, বড় বিনিয়োগ আনবে, কেন্দ্রের সঙ্গে সমন্বয় বাড়াবে— এমন প্রত্যাশা অনেকের। নির্বাচনী ইস্তাহারেও উৎপাদন শিল্পের পুনরুজ্জীবন, শিল্পপার্ক, লজিস্টিক্স হাব, গভীর সমুদ্রবন্দর, মহাসড়ক এবং দীর্ঘ দিন ধরে আটকে থাকা রেল ও মেট্রো প্রকল্প দ্রুত সম্পূর্ণ করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হল, বাংলার অর্থনীতি কি এত দিন অপেক্ষা করতে পারবে?
শিল্পায়ন অবশ্যই প্রয়োজন। পশ্চিমবঙ্গের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার শিল্প ছাড়া সম্ভব নয়। কিন্তু বৃহৎ শিল্প প্রকল্পের একটি নিজস্ব সময়চক্র রয়েছে। জমি, অনুমোদন, পরিকাঠামো, অর্থায়ন— সব মিলিয়ে তার ফল দৃশ্যমান হতে অনেক বছর লেগে যায়। শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, গোটা ভারতেই উৎপাদন শিল্পকে জিডিপির বড় চালিকাশক্তিতে পরিণত করার চেষ্টা বহু বছর ধরে চলছে। কিন্তু নানা প্রণোদনা সত্ত্বেও উৎপাদন শিল্পের অংশীদারি খুব বেশি বাড়েনি। তার উপরে বিশ্ব অর্থনীতির অনিশ্চয়তা, পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির ঝুঁকি এবং আন্তর্জাতিক পুঁজির সতর্ক অবস্থান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
এই পরিস্থিতিতে বাংলার সামনে একটি সমান্তরাল কিন্তু পৃথক প্রশ্ন উঠে আসে— শিল্পায়নের দীর্ঘ পথের পাশাপাশি কি এমন কোনও অর্থনৈতিক কৌশল আছে, যা তুলনামূলক ভাবে দ্রুত বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক গতি তৈরি করতে পারে? সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে কলকাতার দিকে তাকাতেই হয়।
রাজ্যের অর্থনীতি নিয়ে আলোচনা হলেই আমরা প্রায়শই কলকাতাকে স্বতঃসিদ্ধ ধরে নিই। কলকাতাই পশ্চিমবঙ্গের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক সম্পদ। রাজ্যের আপেক্ষিক অর্থনৈতিক অধোগতি সত্ত্বেও কলকাতা মহানগর অঞ্চল এখনও দেশের অন্যতম বৃহৎ নগর-অর্থনীতি। উত্তর-পূর্ব ভারত, বাংলাদেশ, নেপাল এবং ভুটান-সংলগ্ন বিস্তীর্ণ অঞ্চলের অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসাবে কলকাতার ঐতিহাসিক ভূমিকা এখনও অনেকাংশে অক্ষুণ্ণ। সমস্যা হল, শহরটির শক্তিগুলি আমরা অনেক সময় ব্যবহার করতে পারিনি।
বেঙ্গালুরু, দিল্লি বা মুম্বইয়ের তুলনায় কলকাতায় জমি ও আবাসনের খরচ এখনও তুলনামূলক ভাবে কম। দক্ষ মানবসম্পদের অভাব নেই। তথ্যপ্রযুক্তি খাত সম্প্রসারিত হচ্ছে। শিক্ষাগত ভিত্তি শক্তিশালী। ভৌগোলিক অবস্থান কৌশলগত। বন্দর, রেল এবং বিমান যোগাযোগের একটি ঐতিহাসিক পরিকাঠামোও রয়েছে। অর্থাৎ সম্পদের ঘাটতি নয়, মূল সমস্যা নীতিগত জড়তা এবং পুরনো নগর-শাসনকাঠামো। এই কারণেই কলকাতার নগর পুনর্নবীকরণকে কেবল নগর উন্নয়নের প্রকল্প হিসাবে দেখলে ভুল হবে। এটিকে অর্থনৈতিক কৌশল হিসাবে দেখতে হবে।
প্রথম যে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন, তা হল আরবান ল্যান্ড সিলিং অ্যান্ড রেগুলেশন অ্যাক্ট বা ইউএলসিআরএ। জরুরি অবস্থার সময় প্রণীত এই আইনের উদ্দেশ্য ছিল নগর জমির কেন্দ্রীভবন রোধ করা। কিন্তু পরবর্তী অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, বহু ক্ষেত্রে আইনটি পরিকল্পিত উন্নয়নের চেয়ে জটিলতা বেশি তৈরি করেছে। সংসদ ১৯৯৯ সালে আইনটি কার্যত প্রত্যাহারের পথ খুলে দেয়। অধিকাংশ রাজ্য সেই পথে হাঁটলেও পশ্চিমবঙ্গ ব্যতিক্রম থেকে যায়। এর ফলে কলকাতার জমির বাজার ধীরে ধীরে ক্ষুদ্র এবং খণ্ডিত উন্নয়নের দিকে সরে গিয়েছে। শহর বেড়েছে, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে পরিকল্পনা ছাড়া। ফলে আজ একলপ্তে বৃহৎ জমি জোগাড় করা অত্যন্ত কঠিন। অথচ আধুনিক অর্থনীতির বহু ক্ষেত্র— গ্লোবাল কেপ্যাবিলিটি সেন্টার, ডেটা সেন্টার, প্রযুক্তি পার্ক বা সমন্বিত টাউনশিপ— এই ধরনের জমিই চায়। জমি না পেলে বিনিয়োগও আসে না।
দ্বিতীয় বড় প্রশ্ন কলকাতার পরিত্যক্ত শিল্পভূমি। এক সময় হুগলি শিল্পাঞ্চল ছিল এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ শিল্পবলয়। ব্যান্ডেল থেকে বজবজ পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে ছিল পাটকল, এঞ্জিনিয়ারিং কারখানা এবং অসংখ্য শিল্পপ্রতিষ্ঠান। শিল্পের পতনের পর সেই সব জমির বড় অংশ আজও কার্যত অচল। আইনি জটিলতা, নীতিগত অনিশ্চয়তা এবং প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা তাদের অর্থনৈতিক ব্যবহারকে বাধাগ্রস্ত করছে। এই পরিস্থিতি শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, নগর ক্ষয়ও তৈরি করেছে। মূল্যবান জমি অকেজো পড়ে আছে, অথচ শহর নতুন বিনিয়োগের জন্য জমি খুঁজছে।
বিশ্বের বহু শহর এই সমস্যার অন্য সমাধান খুঁজেছে। লন্ডনের ক্যানারি ওয়ার্ফ তার অন্যতম উদাহরণ। এক সময়ের পরিত্যক্ত ডকল্যান্ডস অঞ্চল আজ বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক কেন্দ্র। কলকাতার পরিস্থিতি অবশ্য আলাদা, কিন্তু নীতিগত শিক্ষা একই। পরিত্যক্ত শিল্পভূমিকে নতুন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রে পরিণত করা সম্ভব। এই জমিগুলির একাংশে প্রযুক্তি পার্ক, গ্লোবাল কেপ্যাবিলিটি সেন্টার, ডেটা সেন্টার, গবেষণা প্রতিষ্ঠান বা স্টার্ট-আপ পরিকাঠামো গড়ে তোলা যেতে পারে। একই সঙ্গে কিছু অংশে সবুজ পরিসর, পার্ক, খেলার মাঠ এবং জনপরিকাঠামো তৈরি করা যেতে পারে। লক্ষ্য হওয়া উচিত জমির সর্বোত্তম ব্যবহার, কেবল রিয়াল এস্টেট সম্প্রসারণ নয়।
নগর পুনর্নবীকরণ মানে অনিয়ন্ত্রিত নির্মাণ নয়। ভারতের একাধিক শহর ইতিমধ্যেই তার মূল্য দিয়েছে। বেঙ্গালুরু এবং দিল্লির অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে যে, জমি-ব্যবহারের পরিবর্তন যদি বাহ্যিক পরিকাঠামো উন্নয়নের থেকে দ্রুত হয়, তা হলে যানজট, দূষণ, জলসঙ্কট এবং জীবনমানের অবনতি অনিবার্য হয়ে ওঠে। কলকাতার সামনে তাই দ্বৈত চ্যালেঞ্জ। এক দিকে অর্থনৈতিক স্থবিরতা কাটাতে হবে, অন্য দিকে নগর বিশৃঙ্খলার পুনরাবৃত্তি এড়াতে হবে।
সেই কারণেই শহরের জন্য একটি নতুন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা জরুরি। বর্তমান পরিকল্পনা কাঠামোর বড় অংশই দুই দশক আগের বাস্তবের উপরে দাঁড়িয়ে। এর মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তন, ডিজিটাল অর্থনীতি, দূরবর্তী কর্মসংস্থান, ডেটা পরিকাঠামো, নতুন ধরনের নগর পরিবহণ— সবই বদলে গিয়েছে। কলকাতার প্রয়োজন এমন একটি সমন্বিত নগর-অর্থনৈতিক পরিকল্পনা, যেখানে ভূমি ব্যবহার, পরিবহণ, আবাসন, জলবায়ু সহনশীলতা, বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থানকে এক সঙ্গে ভাবা হবে। ভারতে নগর পুনর্নবীকরণকে এখনও অনেক সময় সৌন্দর্যায়নের সমার্থক হিসাবে দেখা হয়। রাস্তা রং করা, পার্ক সংস্কার করা বা নদীর ধারে আলোকসজ্জা বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান পরিস্থিতিতে কলকাতার পুনর্নবীকরণকে তার চেয়ে অনেক বড় অর্থে দেখতে হবে। এটি মূলত একটি অর্থনৈতিক প্রকল্প।
শিল্পায়ন বাংলার দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। কিন্তু কলকাতার কৌশলগত পুনর্নবীকরণ তুলনামূলক ভাবে দ্রুত বিনিয়োগ টানতে পারে, নতুন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সৃষ্টি করতে পারে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারে। অর্থাৎ শিল্পায়ন এবং নগর পুনর্নবীকরণ— এই দুইকে পরস্পরের বিকল্প হিসাবে নয়, পরস্পরের পরিপূরক হিসাবেই দেখতে হবে।
বাংলার অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবনের আলোচনা তাই কারখানার গেটেই শেষ হয় না। তার একটি বড় অংশ নির্ভর করছে কলকাতা নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করতে পারে কি না, তার উপরে। সুপরিকল্পিত সংস্কার এবং আধুনিক নগর শাসনের মাধ্যমে পুনরুজ্জীবিত কলকাতা আবারও শুধু বাংলার হৃদয় নয়, পূর্ব ভারতের অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে।