আট বছরের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান। ৩১ মিনিট ১০ জনে খেলে মহমেডান স্পোর্টিংয়ের বিরুদ্ধে পিছিয়ে পড়েও ৩-২ গোলে রুদ্ধশ্বাস জয়। কলকাতা লিগে চ্যাম্পিয়ন মোহনবাগান।
ম্যাচ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বারাসত স্টেডিয়ামের গ্যালারির এক দর্শকের কাছ থেকে সবুজ-মেরুন পতাকা নিয়ে দৌড়তে শুরু করা রাজ বাসফোরের সঙ্গে যোগ দিলেন মোহনবাগানের জয়ের অন্যতম নায়ক সায়ন বন্দ্যোপাধ্যায়। আর এক নায়ক সাহাল আব্দুল সামাদ রীতিমতো ক্লান্ত নিজস্বীর আবদার মেটাতে। এর পরেই কোচ বাস্তব রায়কে শূন্যে ছুড়ে উৎসবে মাতলেন সায়নরা। বারাসত স্টেডিয়াম তখন মুখরিত ‘জয় মোহনবাগান’ ধ্বনিতে। স্টেডিয়ামের বাইরে মোহনবাগানের টিম বাসের সামনে সবুজ-মেরুন মশাল জ্বালিয়ে উৎসব শুরু করে দিয়েছেন শ’খানেক সমর্থক। এর পরে শুরু হল আর্লিং হালান্ডদের উল্লাসের ভঙ্গিতে ‘ভাইকিং রো’। এ তো শুধু মোহনবাগানের ৩১তম লিগ জয় নয়, অনেক
সমালোচনার জবাবও।
ডুরান্ড কাপের ফাইনালে ইস্টবেঙ্গলের কাছে হার। সুপার সিক্সে ওঠা নিয়েও সংশয় তৈরি হয়েছিল। তার পরে লিগের ডার্বিতে মূল দলের আট ফুটবলার খেলানো সত্ত্বেও ১-১ ড্র। মোহনবাগান সমর্থকদের অনেকেই আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন লিগ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার। কিন্তু ফুটবলারদের উপরে আস্থা রেখেছিলেন কোচ বাস্তব রায়। তাই জাতীয় শিবিরে অভিষেক সিংহ, অনিরুদ্ধ থাপা, আপুইয়া, মেহতাব সিংহকে ছাড়লেও রেখে দিয়েছিলেন সাহাল ও মনবীরকে।
মহমেডানের বিরুদ্ধে প্রথম একাদশে লালিয়ানজ়ুয়ালা ছাংতে-সহ মূল দলের সাত জনকে রেখে দল সাজিয়েছিলেন বাস্তব। খেলা শুরুর সাত মিনিটের মধ্যে বক্সে ঢুকে পাস দিয়েছিলেন কিয়ান নাসিরি। কিন্তু সাহাল বল মারলেন গোলরক্ষক নিখিল ডেকার হাতে। ১৬ মিনিটেও সুযোগ নষ্ট করেন তিনি। গ্যালারিতে এক মোহনবাগান
সমর্থক বলেই ফেললেন, ‘‘কী লাভ হল সাহালকে রেখে?’’ ১০ মিনিটের মধ্যেই সাহাল প্রমাণ করলেন তাঁর উপরে আস্থা রেখে ভুল করেননি কোচ। বক্সের মধ্যে মনবীর পাস দিয়েছিলেন ছাংতেকে। তিনি বল ভাসিয়ে দেন দ্বিতীয় পোস্টে। বিনা বাধায় গোল করেন সাহাল। ৪২ মিনিটে সবুজ-মেরুন জনতার উৎসব থামিয়ে ১-১ করে দিলেন লালরেমসাঙ্গা ফানাই।
মোহনবাগান ও মহমেডান ম্যাচে যে দল জিতবে, তারাই চ্যাম্পিয়ন হবে। কিন্তু ড্র হলেই আবারও স্বপ্নভঙ্গের যন্ত্রণা। কারণ, ইস্টবেঙ্গল পাঁচ গোলের ব্যবধানে কোল ইন্ডিয়াকে হারালেই যে চ্যাম্পিয়ন হয়ে যাবে। প্রথমার্ধেই মশালবাহিনী ২-০ এগিয়ে যাওয়ায় মোহনবাগান সমর্থকদের চিন্তা বেড়ে গিয়েছিল। দ্বিতীয়ার্ধের খেলা শুরু হওয়ার ১৪ মিনিটের মধ্যে তাঁদের রক্তচাপ কয়েকগুন বাড়িয়ে দিয়ে লাল কার্ড দেখেন গোলরক্ষক দীপ্রভাত ঘোষ। পেনাল্টি বক্সের মধ্যে রেমসাঙ্গার কোমর জড়িয়ে ধরে ফেলে দেন তিনি। পেনাল্টি থেকে ৬৩ মিনিটে ১-১ করেন মহীতোষ রায়।
তীরে এসে কি ফের তরী ডুববে মোহনবাগানের? লিগ জিততে হলে আরও দু’টি গোল করলেই হবে না। গোল খাওয়াও চলবে না। দীপ্রভাত লাল কার্ড দেখার পরেই কিয়ানের পরিবর্তে সায়ন নামেন। ছাংতেকে তুলে গোলরক্ষক সৈয়দ জ়াহিদ বুখারিকে নামান বাস্তব। মহীতোষের গোলের সাত মিনিটের মধ্যেই ২-২ করে দিলেন সাহাল।
বাঁ-প্রান্ত থেকে রবিলাল মাণ্ডির ভাসিয়ে দেওয়া বল মনবীর হেড করে দেন সাহালকে। মোহনবাগান তারকার হেড ক্রসবার ছুঁয়ে গোলে ঢুকে যায়। কিন্তু ইস্টবেঙ্গলও যে ততক্ষণে ৫-০ এগিয়ে গিয়েছে। আরও একটা
গোল চাই।
এ বার জ্বলে উঠলেন সায়ন। ৭৩ মিনিটে সাহালের পাস থেকে বক্সে ঢুকে বাঁ-পায়ের শটে ৩-২ করে বুঝিয়ে দিলেন, ইস্টবেঙ্গল থেকে তাঁকে ছিনিয়ে এনে ভুল করেনি মোহনবাগান। তবে ম্যাচের পরে মহমেডানে শিবিরের অভিযোগ, সাহাল অফসাইডে ছিলেন। পুনরায় এই ম্যাচ দেওয়ারও দাবি তুলেছেন ক্লাব কর্তারা।
মোহনবাগান: দীপ্রভাত ঘোষ, রাজ বাসফোর, রাহুল ভেকে, শুভাশিস বসু, রবিলাল মাণ্ডি, লালিয়ানজ়ুয়ালা ছাংতে (সৈয়দ জ়াহিদ বুখারি), দীপক টাংরি (অভিষেক সূর্যবংশী), সন্দীপ মালিক, সাহাল আব্দুল সামাদ (সুহেল আহমেদ বাট), কিয়ান নাসিরি (সায়ন বন্দ্যোপাধ্যায়) ও মনবীর সিংহ (আলেক্স সাজি)।
মহমেডান: নিখিল ডেকা, অর্পিত ছেত্রী, হীরা মণ্ডল (আকাশ দাস), দীনেশ মেইতেই, জুয়েল আহমেদ মজুমদার, রাহুল নস্কর (শিবম সর্দার), টাংভা রাগুই (লালংগাইসাকা), লালরেমসাঙ্গা ফানাই (অ্যাডিসন সিংহ), মহীতোষ রায়, ইসরাফিল দেওয়ান ও লালথানকিমা।