মাঝে মাঝে অবাক হয় অনুপম। এক দিন সনাতনের ছেলের প্রবল জ্বরে ডাক্তার ডেকে এনেছিল শিউচরণ। ওষুধ লেগেছিল ত্রিশ টাকার। এক কথায় শিউচরণ দিয়েছিল, কোনও দিন ফেরত চায়নি। সনাতন বলেছিল, শিউচরণ সাক্ষাৎ ভগবান। এটাও যেমন সত্যি, আবার দু’চোখে শিউচরণকে দেখতে পারে না রাকেশ। আড়ালে এক হাত নিতেও ছাড়ে না সে। বলে, “বহুত ঘটিয়া আদমি।” অনুপম লক্ষ করেছে, রাকেশের এ-সব কথা পিছনেই। সামনাসামনি শিউচরণের পা টিপে দেয় দুপুরে সে।
শিউচরণ যে এ বাড়ির খুঁটিনাটি খবর রাখে, অনুপম তা জানে। তা বলে সে যে প্রথম দিন একটা কাটা ঘুড়ি ধরেছিল, আর তাও যে শিউচরণের নজর এড়ায়নি, এ কথা তার জানা ছিল না। এক দিন দুপুরে প্রচণ্ড গরমে ঘরের বাইরে দেওয়ালে হেলান দিয়ে বই পড়ছে, হঠাৎ শিউচরণ এসে হাজির। এক গাল হেসে বলল, “এই লেখাপড়াটাই হল না দাদাবাবু...”
“হল না কেন?”
“ভাগ্যে নেই। চোদ্দো বছর বয়সে বিহার থেকে চলে এলাম। জানেন, প্রথম দিন আমিও আপনার মতো একটা কাটা ঘুড়ি ধরেছিলাম।”
“তাই নাকি, তার পর কী করলে?”
“পরদিনও ধরলাম। এই কাটা ঘুড়ি ধরেই তো আমার ব্যবসার হাতে খড়ি।”
“ব্যবসা?”
“হ্যাঁ। সিজিনে রোজ বারো-চোদ্দোটা ঘুড়ি ধরেছি। আমার একটা লম্বা লগা আছে। কাটা ঘুড়ি দেখলেই লগা বাড়িয়ে দিই। সুতো জড়িয়ে নামিয়ে আনি নানা রঙের ঘুড়ি। বিশ্বাস করছেন না?”
অবিশ্বাস করেনি অনুপম। এই লোকটার কণ্ঠস্বরের মধ্যে এমনই এক জোর কাজ করে যে অস্বীকার করার উপায় নেই। হয়তো করেছিল, আর না করলেও অনুপমের তাতে কিছু আসে যায় না। বিস্ময় প্রকাশ করেছিল সে। কিছুটা বাহবা দেওয়ার ভঙ্গিতে বলেছিল, “ব্যাপারটা দারুণ তো!”
উৎসাহে ডগমগ হয়ে উঠল শিউচরণ। কালো চোখ হাসির ঝিলিকে চিকচিক করে উঠল। অনুপম লক্ষ করল, সে এ-সব সাফল্যের কথা কাউকে উজাড় করে বলতে পারে না। বললে হয়তো তার কোনও ক্ষতির সম্ভাবনা আছে। অনুপম সে দিক থেকে সম্পূর্ণ নিরাপদ। তাই সময়ে-অসময়ে তার কাছে চলে আসে। শিউচরণের কাছে শুনেছে, আনন্দদার ঘরে আগে একটা লোক থাকত সপ্তাহে পাঁচ দিন। প্রথম-প্রথম পাঁচ টাকা দিন হিসেবে দাঁও মারত আনন্দদা। এই নাড়ুবাবু ওষুধের কারবার করে বাগরি বাজারে। আগে সপ্তাহে চার দিন আসত, ইদানীং এক দিন মাত্র আসে।
অনুপমের সঙ্গে আলাপ হতে শিউচরণ একটি অসুবিধে থেকে মুক্তি পেয়েছে। সে বিহারে বিবির কাছে মাসে মাসে টাকা পাঠায়। অনেক লোককে দিয়েই সে মানি অর্ডারের ফর্ম লিখিয়ে নিতে পারে, কিন্তু করাতে চায় না। অনুপম জিজ্ঞেস করেছিল, “কেন? কিসের অসুবিধে?”
শিউচরণ একটু দ্বিধায় পড়েছিল যেন। তার পর অত্যন্ত বিনয়ী গলায় বলেছিল, “কত টাকা পাঠাচ্ছি, তা অন্য লোকের জানা কি ঠিক?” উল্টো প্রশ্ন।
“তুমি যখন লিখতে জানো না, আর উপায় কী?”
শিউচরণ চার পাশে তাকিয়ে নিচু গলায় বলল, “আপনি আমার এই কাজটুকু করে দেবেন?”
আপত্তির কোনও কারণ ছিল না অনুপমের। তবে সে স্পষ্ট টের পেয়েছিল, শিউচরণ তাকে অন্য চোখে দেখে। তার সম্বন্ধে শিউচরণের সন্দেহ ক্ষীণ। এ ভাবেই দিন কাটে অনুপমের। কাগজে বিজ্ঞাপন দেখে আবেদনপত্র পাঠায়। বিকেলে একটা টিউশন করে ওর হাতখরচের টাকাটা কোনও মতে উঠে আসে। মাঝে মাঝে নাড়ুবাবু আসে। অনুপম লক্ষ করেছে, ছিপছিপে একটা লোক দু’-তিন বার আনন্দদার খোঁজ করে গেছে।
মাসের শেষে কোনও এক দুপুরে ঠিক এসে হাজির হয় শিউচরণ। প্রতি মাসে টাকার অঙ্কটা লিখতে লিখতে অবাক হয়ে ভাবে অনুপম, অশিক্ষিত একটা লোক সামান্য খিদমতগারি করে মাসে সাতশো টাকা দেশে পাঠায়। নিজের লেখাপড়ার উপর ক্ষীণ একটা অশ্রদ্ধা জন্মায়। এক সময় মনে হয় কোনও চাকরির ইন্টারভিউ বোর্ডে মাইনে নিয়ে প্রশ্ন উঠলে পাঁচ হাজারে থেমে যায়। তার বেশি চাইলে তারা এমন ভাবে তাকায় যেন ন্যায়-অন্যায় বোধশক্তি লুপ্ত হয়ে গেছে তার। মাঝে মাঝে সন্দেহ হয় অনুপমের। সে গোপন চোখে শিউচরণের আপাদমস্তক জরিপ করে। মুখে অবশ্য কিছু বলে না।
৩
সেদিন টিউশন ছিল অনুপমের। বিকেলে হঠাৎ একটা টেলিগ্রাম পেল সে। হাতে পেয়ে প্রথমে সে থরথর করে কেঁপে উঠেছিল, তার পর আস্তে আস্তে খামটা খুলে ধরতেই পর্দার মতো সরে গেল কুড়িটা বছর। মাস তিনেক আগে করা আবেদনের দৌলতে ফাইনাল ইন্টারভিউ। টেলিগ্রামটা এসে পড়েছিল শিউচরণের হাতে। সে বয়ে এনেছে উপরে। প্রথমে বিশ্বাস হচ্ছিল না। বার দুই পড়ার পর মনে মনে আনন্দে লাফিয়ে উঠেছিল অনুপম। শিউচরণ বলল, “কী দাদাবাবু, চাকরির খবর নাকি?”
“না। ইন্টারভিউ। প্রথম।”
তার পর বিকেলের টিউশন বাতিল করল মনে মনে। শিউচরণকে বলল, “চলো, তোমাকে আজ খাওয়াব। সন্ধেবেলা কাজ রেখো না।”
সেই বেরিয়ে আসা। রাত আটটায় ব্রেবোর্ন রোড ধরে ক্যানিং স্ট্রিটের দিকে। কিছুটা এগিয়ে শিউচরণ বলল, “চাকরি পেলে এ বার চলে যাবেন?”
“হয়তো বা,” ছোট্ট উত্তর দিল অনুপম।
হাঁটতে হাঁটতে অনেকটা এগিয়ে যে আলো ঝলমল রাস্তায় উঠল, তার নাম এজ়রা স্ট্রিট। লোকজন কমে এসেছে এ চত্বরে। শিউচরণ কাছেপিঠে নানা হোটেলের খোঁজ দিচ্ছে। কোথায় ভাল চপ, দোপেঁয়াজি, মোগলাই পরোটা পাওয়া যায়। যেতে যেতে হঠাৎ থমকে দাঁড়ায় শিউচরণ। তার পর ডান দিকের একটা বাড়ির দোতলায় তরতর করে উঠে যায়। অনুপমও পিছু-পিছু উঠে আসে উপরে। সামনে একটা ছোট্ট ঘর। তার এক কোণে মাঝবয়সি একটা লোক টেলিফোন-কানে বসে আছে। শিউচরণকে দেখেই ফিসফিস করে বলল, “সাড়ে বারোটায় ত্রিশ জন, দশ জন জেনানা।”
সিঁড়ি দিয়ে তরতর করে নেমে এল শিউচরণ। তার পর বলল, “এখানে একটা খবর আসে আমাদের। বলেছিলাম না, রাতের বেলা শহরটার মজাই আলাদা।”
কিছুই বুঝতে পারে না অনুপম। সে অবাক হয়ে শিউচরণকে দেখে। পাশাপাশি হেঁটে যায় ধর্মতলায়। একটা মাঝারি রেস্তরাঁয় দু’জনে খেয়ে আবার সত্তর নম্বরে ফিরে আসে।
বাড়ি ঢুকে শিউচরণ সোজা চলে যায় নিজের আস্তানায়।
সেদিন আনন্দদা দেশে গেছে। তার হাতে দিদিমাকে চিঠি দিয়েছে অনুপম। জানিয়েছে ইন্টারভিউয়ের খবর। আনন্দদা নেই, নাড়ুবাবু আসবে না আজ। হাত-পা ছড়িয়ে ঘুমোতে পারবে সে। তার মনের মধ্যে এক অদ্ভুত অনুভূতি কাজ করছিল। জামাটা ভাল করে কেচে নিল রাতে। প্যান্টটা ইস্ত্রি করিয়ে আনল সামনের লন্ড্রি থেকে। একটা নতুন ব্লেড কিনল। এ সব টুকিটাকি জিনিস বারবার নাড়াচাড়া করতে করতে মনে মনে ঠিক করল অনুপম, ভাল একটা থাকার জায়গার খোঁজ করতে হবে এ বার।
কিছুতেই ঘুম আসছিল না অনুপমের। কত রাত হয়েছিল খেয়াল নেই। দু’চোখ বুজলে ছোটবেলার নানা স্মৃতি একে একে ভিড় করে আসছিল মাথার মধ্যে। মাঝে মাঝে মায়ের মুখ ভেসে উঠছিল। একা মাদুরের উপর ছটফট করছে, অন্তহীন এক আনন্দ তাকে জাগিয়ে রেখেছে। এক সময় ঘর ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে আসে সে। চারদিকে ফুটফুটে জ্যোৎস্না। দূরে হাওড়া ব্রিজের উপরে লাল টুকটুকে আলো। তিরতির করে হাওয়া বইছে। আজ রাতটুকু শেষ হলে সে পার হয়ে যাবে যেন এক অনিশ্চিত কাল।
এখান থেকে সোজাসুজি তাকালে নীচে বাড়ির প্রধান ফটক। সে দিকে তাকাতেই স্তম্ভিত হয়ে যায় অনুপম। রাস্তার আলো লম্বা লোহার গরাদে এসে পড়েছে। ফটকের বাইরে অনেকগুলো ছায়া আস্তে আস্তে জমা হচ্ছে। এরা কারা? কোথা থেকে এসেছে? এই সব ভাবনার মধ্যে সিঁড়ি দিয়ে মানুষের নেমে যাওয়ার পদশব্দ কানে এল অনুপমের। তার পরই তার স্থিরদৃষ্টি চিরে ফটকের উঁচু খিলের দিকে এগিয়ে যায় একটা হাত। দূর থেকে মনে হয়, হাত নয়, একটা লম্বা লগা। এক মূহূর্ত দেরি না করে অনুপম নীচে নেমে আসে। সিঁড়ির শেষ ধাপে দাঁড়িয়ে সে দেখে— লাল, হলুদ, সবুজ চাদর গায়ে জরাজীর্ণ, দুঃস্থ কিছু মানুষ পা টিপে টিপে ঢুকে পড়ছে সত্তর নম্বরের লম্বা চত্বরে। সার দিয়ে থলে পাতা ছিল আগেই। পোঁটলাপুঁটলি রাখছে মাথার কাছেপিঠে। এই নিঃসম্বল, ছিন্নমূল লোকগুলো আজ রাতের অন্ধকারে কলকাতা শহরে ঢুকে পড়েছে। কাল হয়তো কাকভোরে এরা সকলের অজানতে ছেড়ে চলে যাবে সত্তর নম্বর?
একে একে সবাই বসে পড়লে তাদেরই এক জন এগিয়ে যায় ফটকের কাছে। শিউচরণ। হাত বাড়ায়। এক জন তার হাতে একটা ব্যাগ এগিয়ে দিয়ে বলে, “গিনলো, তিস আদমি, তিস রুপাইয়া।”
৪
হাতে মাত্র একটা টিউশন। খড়দায়। ভোরে উঠে সোজা চলে যেতে হয় শিয়ালদা, সেখান থেকে খড়দা স্টেশনের প্রায় গায়ে লাগোয়া বাড়ি। ছেলেটি রহড়া রামকৃষ্ণ মিশনে পড়ে ক্লাস নাইনে। সপ্তাহে তিন দিন পড়াতে হয়। সকালে তাদের বাড়ি পৌঁছয় সাতটায়। ছেলেটি এতই মেধাবী, তাকে এক বার দেখিয়ে দিলে সে অনায়াসে শিখে যায়। তার উত্তরপত্রে বিশেষ কলম চালাতে হয় না। এই একটি লোভেই তাকে পড়াতে যাওয়া। নইলে এত দূর থেকে তাকে পড়াতে গেলে এক কাপ চা আর একটি থিন অ্যারারুট বিস্কুট কপালে জোটে। ফেরার সময় প্রবল খিদে নিয়ে ট্রেনের দরজার পাশটিতে দাঁড়িয়ে হাওয়া খেয়ে পেট ভরিয়ে নিত। ছাত্রটির নাম অরুণ দাক্ষী।
এক দিন অরুণের বাবা অনুপমকে বললেন, “আমার অফিসের এক সহকর্মীর দুই মেয়ে আছে। বড় মেয়েকে পড়াবেন? আপনার কাছাকাছিই থাকে, আমহার্স্ট স্ট্রিটে।”
অনুপম তো প্রায় লাফিয়ে ওঠে। তবুও নিজেকে সংযত করে বলল, “কোন ক্লাস?”
“নাইন। রাজি হলে আমি আপনাকে ঠিকানা দেব। ওদের বলে দেব।”
অনুপম বলল, “রাজি। তবে সন্ধেবেলা পড়াব। সকালে আমার কাজ আছে।”
“ওঁদের সঙ্গে টাকাপয়সার কথাটা বলে নেবেন।”
দিনটা ছিল চাকরি পাওয়ার চেয়েও বেশি আনন্দের দিন। কারণ এই রোজগারটা হলে অনুপম মেসের খরচা মিটিয়েও গ্রামে মায়ের হাতে কিছু টাকা দিতে পারবে। আর পারবে চাকরির আবেদন করতে। চাকরি না পাওয়া অবধি বেকারদের চাকরির জন্য টাকা খরচ করতে হয় যে!
সত্তর নম্বর নেতাজি সুভাষচন্দ্র রোডের এগারো তলার করোগেটেড চালের ঘর থেকে পটুয়াটোলা লেনের একতলায় মনোময় ঘোষের মেস। এক অলৌকিক পৃথিবী থেকে অন্য এক জটিল জগৎ। অনুপমের চারপাশে না আছে মুটেমজুর, না আছে ব্যবসার সুলুকসন্ধান, না আছে উন্মুক্ত আকাশ। এখানে একটি ঘরের মধ্যে অপেক্ষাকৃত ঠান্ডা বাতাস, চার জন মানুষের চারটি চৌকির উপর বাস। চৌকির এক পাশে একটি টুল। অন্য পাশে একটি ছোট্ট আলমারি। তাতে পাউরুটি, বিস্কুট আর মুড়ির কৌটো রাখা যায়। সকালে চা, দুপুরে লাঞ্চ, রাতে ডিনার। মাঝেসাঝে বিকেলে চা-ও দেয়।
কলকাতা শহরে একটা চৌকিতে শরীরটা এলিয়ে দিয়ে অনুপমের মনে হয়েছিল, শোবার জায়গা যখন পেয়েছি, খাবার সংস্থানও হয়ে যাবে। ফাইনাল ইন্টারভিউয়ে চাকরিটা হাতছাড়া হলেও, চাকরি খুঁজে নিতে খুব একটা সময় লাগবে না। এত লোক যদি রোজগার করতে পারে, ও-ই বা কেন পারবে না? ওর সঙ্গে একটি শতরঞ্চি, একটা টিনের সুটকেস আর কিছু জামাকাপড়। জায়গাটা ওর পক্ষে সুবিধের। বড়বাজার থেকে ট্রামে শিয়ালদা যাওয়ার খরচটা বাঁচে। এখান থেকে হেঁটেই শিয়ালদা।
সেই দিনটার কথা আজও ভুলতে পারে না অনুপম। সকাল থেকে মাথাটা টিপটিপ করছিল। অনেক সময় এমন হয়। বিশেষ করে পেট খালি থাকলে মাথা ধরার একটা রোগ। ফেরার ট্রেনে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছিল সে। প্রবল ভিড়ে সে ভিতরে ঢুকতে পারেনি। দরজার এক পাশে কোনওক্রমে একটু জায়গা পেয়ে দাঁড়িয়েছিল। সোদপুরে এক দল মানুষ ভিড় ঠেলে ভিতরে ঢুকতেই কে যেন তার তলপেটে বসিয়েছিল এক ঘুসি। ব্যস! আচমকা অজ্ঞান হয়ে যায় সে। জ্ঞান ফিরলে দেখে, চারপাশের মানুষরা তাকে দু’হাতে আটকে জলের ছিটে দিচ্ছে। মাথাটা কামরার একটু বাইরে, আর চুলের ভিতর দিয়ে ঝড়ের বেগে বয়ে যাচ্ছে হাওয়া। দক্ষিণ থেকে উত্তরে।
ক্রমশ