এক কাপ গরম চা হাতে বসে আছি হোমস্টের ব্যালকনিতে। বৃষ্টির ঝমঝম শব্দের মধ্যেও শুনতে পাচ্ছি দার্জিলিং বুশ ফ্রগের একটানা ডাক। হোমস্টের গা ঘেঁষে বয়ে চলেছে ঝালংখোলা নদী। এই বৃষ্টিতে তার কী গর্জন! আমরা এসেছি কালিম্পং জেলার রঙ্গো গ্রামে। পোকামাকড়ের সন্ধানে আসা এখানে। নেওড়া ভ্যালি জাতীয় উদ্যানের পাশে অবস্থিত এই জায়গার জীববৈচিত্র বেশ সমৃদ্ধ। পাহাড় থেকে সমতল সবই সেজে ওঠে এই বর্ষায়। তাই সব বর্ষায় পাহাড়ে যেতে না পারলেও ঘরের কাছেপিঠে ছুটে যাই নবরূপা প্রকৃতির শোভা দেখতে।
প্রখর গ্রীষ্মের পর যখন পৃথিবীর বুকে মুক্তোর মতো ঝরে পড়ে বৃষ্টির ফোঁটা, তখন সত্যিই হৃদয় নেচে ওঠে ময়ূরের মতো। বৃষ্টির ফোঁটায় যেন নতুন করে প্রাণের সঞ্চার হয় প্রকৃতিতে। বৃষ্টিভেজা প্রতিটি ঝরা পাতার নীচে প্রাণের স্পন্দন অনুভূত হয়। ভিজে জঙ্গলের পথে হেঁটে যেতে যেতে মুগ্ধ হই তার রূপে আর গন্ধে। প্রচলিত মতে, বর্ষায় পোকামাকড়ের বাড় বাড়ে। বিভিন্ন কীটপতঙ্গ, যারা আত্মগোপন করেছিল মাটির নীচে বা পাতার তলায়, তারা বেরিয়ে আসে। বর্ষার আবহাওয়া তাদের জীবনধারণের প্রতিটি চাহিদা পূরণ করে। রংবেরঙের পতঙ্গ তাদের ডানা মেলে উড়ে বেড়ায় মনের আনন্দে। রঙিন ডানার প্রজাপতি বা জলফড়িঙের ঝাঁক মাতিয়ে রাখে বৃষ্টিভেজা সারাটা দিন।
পোকামাকড়ের জীবন সম্পর্কে কৌতূহলী যাঁরা, তাঁদের পোয়াবারো এই বর্ষায়। বৃষ্টি থামার পর মেঘের চাদর সরিয়ে রোদের ঝিলিক দিতেই দেখি প্রজাপতির মেলা বসেছে মাটিতে। মাড পাডলিং চলছে। প্রজাপতি তার তৃষ্ণা নিবারণ করছে। ভেজা মাটিতে থাকা জলের সঙ্গে মিশ্রিত খনিজ লবণ তার শরীর শুষে নিচ্ছে। এই লবণ সে তার সঙ্গিনীকে উপহার দেবে মিলনকালে। বর্ষা আসার সঙ্গে সঙ্গে এক দল ফড়িঙের আবির্ভাব হয় আকাশ জুড়ে। এরা গ্লোব স্কিমার। আফ্রিকা থেকে ভারত, এই ভ্রমণপথ অতিক্রম করে এসে এসেছে পরিযায়ী হয়ে বর্ষার বার্তা নিয়ে। বর্ষা ঢোকার সময়ের রকমফেরে তাদেরও আসা-যাওয়ার সময় বদলায়। এ যেন এক অদৃশ্য ঘড়ি, যা নিয়ন্ত্রণ করছে সব কিছু। প্রবল বৃষ্টির মধ্যে ফড়িংদের আশ্রয় নিতে দেখেছি বড় পাতার তলায়। আবার প্রখর রোদে শরীরের পিছনের অংশ বেঁকিয়ে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের কৌশলও এদের আয়ত্তে। শুধু প্রজাপতি বা ফড়িং নয়, নানা পতঙ্গের মেলা বসে যায় আমাদের আশপাশের ঝোপ-জঙ্গলগুলোয়। পাতার উপর বসা হভার ফ্লাই-টার দিকে ধীরপায়ে এগোচ্ছে সবুজ লিংক্স মাকড়সা। এমন গায়ের রং যে পাতায় মিশে গেছে। যেমন টগর ফুলের উপর বসা সাদা রঙের কাঁকড়া মাকড়সাটাকে আলাদা করার উপায় নেই। এদেরও মজার সময় এই বর্ষা। চারপাশে কত শিকার। ব্লু-বটল ফ্লাইয়ের বাড়বাড়ন্ত দেখার মতো এই বর্ষায়। অন্য সময় এদের তেমনটা দেখা যায় না। নীলচে সবুজ রঙের এই মাছিটাকে বেশি দেখি পাকা আমের খোসায় বসে থাকতে। তবে শিকারি পতঙ্গ রবার ফ্লাইয়ের রঙের বাহার না থাকলেও তাকে অগ্রাহ্য করা যায় না। শিকার করতে ওস্তাদ এই মাছিটাকে এক দিন দামোদরের চরে ছোট ছোট বালির টুকরো বইতে দেখেছিলাম, পটার ওয়াস্প যে ভাবে কাদার ঢেলা বানিয়ে নিয়ে যায় বাসা বানানোর জন্য, সে ভাবে। বর্ষায় নদীর চরের মাঝে জমা জলে নানা পতঙ্গের ভিড় দেখার মতো। পটার ওয়াস্প, পেপার ওয়াস্প— এরা মনের মতো জায়গা পেলেই বাসা বানিয়ে নেয়। যদিও এদের সবার বাসা বানানোর ধরন আলাদা। বর্ষার দিনে পোকামাকড় দেখতে বেরিয়ে বৃষ্টিতে ভেজা জুয়েল বাগ দেখলে মন ভাল হয়ে যায়। এত সুন্দর রঙের বাহার পোকাটার! তবে এই বর্ণ-ছটায় টাইগার বিটল, লেডি-বাগ বিটল, পামকিন বিটল, টর্টয়েস বিটল, ব্লু মিল্কউইড বিটল— এরাও কিছু কম যায় না। তবে এই সময় পার্থেনিয়াম গাছে উপচে পড়ে পার্থেনিয়াম বিটল। রঙের দিক থেকে আকর্ষণীয় হলেও জ্বালা ধরানোয় এক্সপার্ট ব্লিস্টার বিটল। বর্ষার মরসুমে গুবরে পোকা বা ডাং বিটলের আহ্লাদ দেখার মতো। এরা গুলি পাকিয়ে দু’পায়ে ভর দিয়ে যখন ঢেলা বয়ে নিয়ে যায়, তখন কুর্নিশ করি এদের বুদ্ধিমত্তাকে। প্রায়ই রাতে আমার কাজের ঘরে এক দল মৌমাছি এসে জুটে যায় পাশের গাছের মৌচাক থেকে। শুধু মৌমাছি কেন, নানা ধরনের মথ, বিটল, বাগ, প্ল্যান্ট হপার, ফ্রগ হপার আসে বর্ষারাতে আলোর টানে। আকন্দ গাছের পাতায় বসে থাকতে পছন্দ করে ফ্রগ হপাররা, অন্য দিকে ট্রি-হপারদের পছন্দ কুলগাছের কাঁটাযুক্ত ডালগুলো। বৃষ্টির মধ্যে জঙ্গলে বনঝিঁঝির ডাক শুনে সত্যিই মনে হয় বর্ষার একটা নিজস্ব সুর আছে— আর বনঝিঁঝির ডাক যেন বর্ষাবরণের সঙ্গীত।
বর্ষায় শুধু যে সবুজ রং জেগে ওঠে তা নয়, নানা রঙিন ফুলে ভরে যায় সবুজ দিগন্ত। আর এই ফুল ফোটানোর কাজ করে গাছ আহ্বান জানায় পরাগমিলনকারী পতঙ্গদের। বর্ষাভেজা সন্ধ্যায় আলোর টানে ঘরে আসা বাদলা পোকারা বয়ে আনে বর্ষাবরণের আমন্ত্রণপত্র। বর্ষারাতের অন্ধকারে জোনাকির আলো দেখে মনে হয় যেন তারারা নেমে এসেছে পৃথিবীর বুকে। বর্ষা, প্রকৃতির অকৃপণ সৌন্দর্য উপভোগের সেরা সময়। দু’-এক পশলা বৃষ্টি হলেই চোখের আড়ালে থাকা ছোটদের দুনিয়ার বাসিন্দারা এক এক করে প্রকৃতির খোলা রঙ্গমঞ্চে এসে উপস্থিত হয় নিজেদের কারসাজি দেখাতে। আমি বার বার পাহাড়ে ছুটে যাই এই প্রকৃতির সার্কাসের দর্শক হতে।
আবার ফিরে যাই উত্তরবঙ্গের পাহাড়ি নদীর ধারে। সারা রাত বৃষ্টির পর ভোর-ভোর বেরিয়েছিলাম বৃষ্টিস্নাত গাছগুলোয় রোদ পোহাতে আসা পতঙ্গদের দেখব বলে। একটা ছোট্ট বুনো ফুলে বসে ছিল এক দল রেড পিয়েরো প্রজাপতি। আর এক ধরনের প্রজাপতি ট্যাবি বসেছিল ভেজা দেওয়ালে। একটা গুল্মে বসে আছে ইন্ডিয়ান মাউন্টেন ডার্ট ড্যামসেলফ্লাই। এর মধ্যে কোথা থেকে জানি না, আমার প্যান্টের উপর এসে বসেছে একটা শিংওয়ালা ট্রি-হপার। সামনের বৃষ্টি-জমা জলে বসে আছে নানা রঙের জলফড়িং আর বাঁশফড়িং। নদীর ধার বরাবর উপরে উঠতে গিয়ে দেখি, ডান পাশে পাথরের গায়ে ঝোপের মধ্যে একটা রিডটেল ড্যামসেলফ্লাই নিজেকে লুকিয়ে রেখেছে আলো-আঁধারিতে। পতঙ্গেরা নানা উপায়ে নিজেদের লুকিয়ে রাখে। কেউ নিজেকে মিশিয়ে নেয় পারিপার্শ্বিক পরিবেশে, আবার কেউ নকল করে অন্যকে। রোদ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রজাপতিদের উৎফুল্লতা বেড়ে ওঠে। আলোর ঝিলিকে নেচে গেয়ে বেড়াচ্ছিল ওরা। ইয়েলো জেজাবেল, রেড অ্যাডমিরাল, চকলেট অ্যালবাট্রসদের সঙ্গী হয়েছে সেলাররাও। সন্ধার সময় দেখি আমাদের হোমস্টের চৌহদ্দির মধ্যে এসে জুটেছে একটা স্মল গ্রিন আউলেট প্রজাপতি। রাতে আলোর টানে ছুটে আসছে চারপাশের বহ্নিপতঙ্গেরা, আলোর স্রোতে ঝাঁপ দেবে বলে। তবে এ-সব দেখে সত্যি মনে হয় বর্ষা সুন্দর। বর্ষায় প্রাণবন্ত প্রকৃতি অপরূপ সুন্দর।
তবে এই সৌন্দর্য কত দিন আমরা উপভোগ করতে পারব তা জানি না। দিন দিন কমে আসছে জোনাকির আলোর পরিসর। পরাগমিলনের কান্ডারি পতঙ্গরা হারিয়ে গেলে হয়তো আর ফলবে না ফসল, ফুটবে না ফুল, হাসবে না প্রকৃতি। জমিতে কীটনাশকের প্রভাবে প্রাণ হারাচ্ছে হাজারো কীটপতঙ্গ। জলা ও ফাঁকা জমির ধ্বংসের সঙ্গে সঙ্গে বাসা হারাচ্ছে পোকামাকড়ের দল। পৃথিবীতে আবহাওয়া বদলাচ্ছে দ্রুত। ঠিক সময়ে বর্ষা আসে না এখন। কোথাও বৃষ্টির দেখা নেই, তো কোথাও বানভাসি। আর এর সঙ্গে সঙ্গে বদলাচ্ছে কীটপতঙ্গের আচারব্যবহার, জীবনশৈলী। একটা জলফড়িং তার জীবন কাটায় জলে ও স্থলে। তাই তাকে জীববিজ্ঞানীরা ব্যবহার করেন জৈব নিয়ামক হিসাবে। তাদের মধ্যেও লক্ষ করা গেছে পরিবর্তনের প্রভাব। বেশ কিছু প্রজাতি এখন ‘এন্ডেমিক’ নির্দিষ্ট স্থানে। কারণ তাদের বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় রসদ শুধু ওই অঞ্চলেই সীমিত থেকে গেছে। সেই সব স্থানও ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলছি আমরা, লোভের বশে। এমন চলতে থাকলে হয় চিরকালের জন্য হারাব প্রজাপতি ফড়িঙের নৃত্য বা ঝিঁঝির সঙ্গীত। ঠিক যেমন হারানোর দোরগোড়ায় বর্ষারজনীর গায়ক
ব্যাং-রাজপুত্ররা।
ছবি: লেখক