ধর্ষক সেনাদের হত্যা করে সঙ্গীদের নিয়ে অকুস্থল থেকে সরে পড়ে ভিত্তোরিয়ো, অনতিবিলম্বেই আত্মগোপন করে পালেরমো আর সিসিলির পাহাড়-জঙ্গল ঘেরা দুর্গম অঞ্চলে। আর সেখান থেকেই গেরিলা কায়দায় যুদ্ধ চালিয়ে যেতে থাকে ফরাসি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে।
ভিত্তোরিয়োর বীরত্ব ও সাহসিকতায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সিসিলি, পালেরমোর আরও বহু অঞ্চলে একাধিক সংগঠন গড়ে ওঠে স্থানীয় যুবকদের উদ্যোগে। ‘মোরতে আলা ফ্রাঁসিয়া/ ইতালিয়া আনেলা!’— এই স্লোগান দিতে দিতে সঙ্ঘবদ্ধ ভাবে শত্রুপক্ষের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ত তারা। প্রতিটি গোষ্ঠী বা সংগঠনেরই একটিমাত্র পরিচয়— ‘মাফিয়া’। একদা বিদেশি শাসকের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধে নামা এই গোষ্ঠী বা সংগঠনগুলিই কী ভাবে দীর্ঘ কালপর্যায়ে পরিণত হয়েছিল এক-একটি কুখ্যাত অপরাধচক্রে, এক অসহায় মায়ের আর্তনাদ বা বিদ্রোহের একটি স্লোগান কোন পথে সমার্থক হয়ে উঠেছিল এক অন্ধকার জগতের সঙ্গে, তার সাক্ষী ইতিহাস!
প্রিয় পাঠক, এখানে মাফিয়া, কামোরা বা মাফিয়াতন্ত্রের উদ্ভবের সময়কাল নিয়ে স্পষ্টতই একটি মতভেদ চোখে পড়বে আপনাদের। প্রথমোক্ত দু’টি মত অনুযায়ী, এর উদ্ভবকাল সতেরো বা আঠারো শতকের গোড়ার দিকে। অথচ নাইজেলা ধর্ষণকাণ্ড বা দ্রোয়েত্তোর বিদ্রোহ, সেই বিদ্রোহের পরিব্যাপ্তি, এই সব কিছুই ঘটেছিল বুরবোঁ শাসনকালে, অর্থাৎ ত্রয়োদশ শতকে। সব ক’টি মতকেই এক্ষেত্রে পাশাপাশি সাজিয়ে রাখলাম নির্মোহ এবং নিরপেক্ষ দৃষ্টির স্বার্থে।
মুসোলিনি-দাওয়াই
সিসিলি আর নেপলসের বুকে দীর্ঘ কয়েক শতক ধরে চলে আসা মাফিয়া সাম্রাজ্যের বিজয়রথ প্রথম বারের জন্য কঠিন বাধার সম্মুখীন হয় দশম দশকের শেষভাগে।
সেটা ১৯১৮ সাল। ইটালির শাসনক্ষমতায় এল বেনিটো মুসোলিনির ফ্যাসিস্ট পার্টি। মুসোলিনির দীর্ঘ স্বৈরাচারী ফ্যাসিস্ট শাসন, দমন-পীড়ন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তাঁর ভূমিকা, এ-সব নিয়ে বহু বিরোধিতা ও সমালোচনা রয়েছে সারা বিশ্ব জুড়ে। সেটা খুবই স্বাভাবিক। তবে এত সব কিছুর মধ্যেও একটি কাজ বোধহয় মুসোলিনি ভালই করেছিলেন। সেটি— দেশের বুক থেকে মাফিয়া নামক ভাইরাস নির্মূল করার সৎ এবং আন্তরিক প্রচেষ্টা।
ক্ষমতায় এসেই নেপলস আর সিসিলি, এই দু’টি প্রদেশের দিকে নজর দিলেন মুসোলিনি। প্রশাসনিক কাঠামোয় বহু অদলবদল ঘটিয়ে সিসিলি আর নেপলসের অপরাধ দমন বিভাগের শীর্ষে নিয়ে এলেন পুলিশ কমিশনার সিসেরে (সিজ়ার) মোরিকে। এই মোরি আদতে সিসিলির বাসিন্দা। আর তাঁর মায়ের জন্মস্থান নেপলসে হওয়ার কারণে দু’টি প্রদেশকেই চিনতেন হাতের তালুর মতো।
প্রায় এক মাস ধরে সিসিলি আর নেপলসে দীর্ঘ পরিদর্শন সেরে রোমে ফিরে এলেন মোরি। সঙ্গে একটি বিশদ সমীক্ষার খতিয়ান। যা একই সঙ্গে চরম উদ্বেগজনক এবং ভীতিপ্রদ। ওই দুই প্রদেশে সরকারি আইন বা শাসনের আর কিছুমাত্র অবশিষ্ট নেই। পুরোটাই মাফিয়া আর কামোরাদের নিয়ন্ত্রণে। ৯০ শতাংশ কর্মচারীই উৎকোচের বিনিময়ে মাথা বিকিয়ে বসে আছে সংগঠিত এই দুর্বৃত্ত গোষ্ঠীগুলোর কাছে। এর বাইরে সামান্য কিছু সৎ এবং সাহসী আধিকারিক, যাঁরা এই অপরাধচক্রের বিরুদ্ধে সক্রিয় থাকার চেষ্টা করছেন, তাঁদের কাজ করতে হচ্ছে প্রাণ হাতে নিয়ে। গোটা সিসিলি আর নেপলস জুড়ে অধিকাংশ বাড়ির সামনে ফুট চার-পাঁচেকের দেওয়াল তোলা। সেই সব দেওয়ালের গায়ে একাধিক ছিদ্র। যার আড়ালে দাঁড়িয়ে তাদের ‘লুপারা’ (রাইফেলের ব্যারেল কেটে ছোট করা শটগান) থেকে গুলি চালাত মাফিয়া গুন্ডারা। এ ছাড়াও প্রতিটি বাড়ির উঠোনে অজস্র ‘কনিগ্লিয়ো গ্যালেরিয়া’ (মাফিয়াদের সাঙ্কেতিক ভাষায় এর মানে, খরগোশের গর্ত)। এঁকেবেঁকে চলে গিয়েছে মাইল মাইল দূরে কোন অজানায়। বিপদ বুঝলেই সেই গোপন সুড়ঙ্গপথে পিঠটান দিত দুর্বৃত্তরা। ফলে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনে তখনও বেঁচেবর্তে থাকা কিছু সৎ কর্মী ওই সব অঞ্চলে খানাতল্লাশি করতে গিয়ে পড়তেন মহা সমস্যায়। ক্ষয়ক্ষতি, বা বলা ভাল হতাহতের পাল্লাটা তাঁদের দিকেই ঝুঁকে থাকত বেশি। ফলে ক্রমাগত ব্যর্থ হতে হতে মনোবল হারিয়ে ফেলছিলেন তাঁরা।
এ রকম একটা অবস্থায় দায়িত্ব নিয়েই সিসেরে মোরি বেশ কয়েকটা গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ করলেন। সমস্ত অসৎ ও দুর্নীতিগ্রস্ত পুলিশকর্মীকে বরখাস্ত অথবা অন্যত্র বদলি করে নতুন কর্মী নিয়োগ করলেন। দফতরের পুরনো, বিশ্বস্ত, সৎ আর সাহসী কর্মীদের অগ্রাধিকার দিয়ে সামনের সারিতে নিয়ে এলেন। পুরনো আর নতুন, এই দুইয়ের মিশ্রণে অত্যাধুনিক সমরাস্ত্রে সজ্জিত একটা স্পেশাল অ্যান্টি-মাফিয়া কমব্যাট ফোর্স গঠন করলেন। দুই দ্বীপপুঞ্জের সর্বত্র মাফিয়া বা কামোরাদের হাতে অত্যাচারিত পরিবারগুলোর মধ্যে থেকে এমন লোকজনদের খুঁজে বার করলেন, যাঁরা ওই দুর্বৃত্তদের খবর স্পেশাল ফোর্সের কাছে পৌঁছে দিতে আগ্রহী— প্রধানত দু’টি কারণে। এক, অর্থ; দুই, মাফিয়াদের প্রতি তাঁদের প্রত্যেকের ব্যক্তিগত ক্রোধ আর অপরিসীম ঘৃণা।
অতঃপর তাঁর এই সম্মিলিত শক্তি নিয়ে সিসিলি, নেপলসের সর্বত্র মাফিয়া আর কামোরাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন মোরি। প্রথমেই ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হল প্রতিটি বাড়ির সামনে গুন্ডাদের গুলি চালানোর ঢাল হিসেবে ব্যবহৃত দেওয়ালগুলো। বুজিয়ে দেওয়া হল মাটির তলায় মাইলের পর মাইল লম্বা অসংখ্য ‘খরগোশের গর্ত’। সোর্স বেসগুলো থেকে খবরও আসতে শুরু করল খুব দ্রুত। অতঃপর আসরে নামল বিশেষ অ্যান্টি-মাফিয়া কমব্যাট ফোর্স— আগেকার মতো দুর্বল, ঢিলেঢালা নয়, অত্যাধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত এক দুর্ধর্ষ বাহিনী। এই ভয়ঙ্কর ঝটিকা-আক্রমণের মুখে পড়ে কবরের মাটি ধরে নিল শয়ে শয়ে মাফিয়া আর কামোরা গ্যাংস্টার। কুখ্যাত সব ডন আর তাদের সাঙ্গোপাঙ্গদের জায়গা হলো গরাদের পিছনে। সব দেখেশুনে প্রমাদ গুনল বাকিরা। ‘আপনি বাঁচলে বাপের নাম’, এই চিরন্তন মন্ত্র জপতে জপতে দেশ ছেড়ে পালিয়ে মার্কিন মুলুকে আশ্রয় নিল অন্ধকার জগতের বহু খলিফা। উজ্জ্বল ভবিষ্যতের সন্ধানে তাদের বহু ভাই-বেরাদর অনেক আগেই পাড়ি জমিয়েছিল সে দেশে। পুরনো আর নতুন, এই দুইয়ের মিশেলে গড়ে উঠল এক সুবিশাল অপরাধ-সাম্রাজ্য। ইটালিয়ান-আমেরিকান মাফিয়া। অর্গানাইজ়ড ক্রাইম সিন্ডিকেটের এক নয়া সংজ্ঞা। ম্যানহাটন, নিউ ইয়র্ক, শিকাগো, ব্রুকলিন, নেভাডা… এক-একটা প্রদেশে ও জায়গায় এক অথবা একাধিক গোষ্ঠী। মাফিয়াদের নিজস্ব জবানে, ‘ফ্যামিলি’। এই সব পরিবারের কার্যকলাপ আমেরিকান আইন ও প্রশাসনের উদ্বেগ বাড়িয়ে দিল বহুগুণ। সঙ্গে সাধারণ মানুষের শিরদাঁড়ায় ঠান্ডা স্রোত বইয়ে দেওয়ার মতো এক-একটা নাম! অন্ধকার দুনিয়ার বেতাজ বাদশা সব। কালক্রমে প্রবাদপ্রতিম হয়ে ওঠা আমেরিকান আন্ডারওয়ার্ল্ডের এই সমস্ত ডন আর গ্যাংস্টারদের সম্পর্কে দু’-চার কথা বলব এ বার। শোনাব তাদের হাড় হিম করে দেওয়া সব কার্যকলাপের কাহিনিও।
ভ্যালেন্টাইনস ডে ম্যাসাকার
তারিখটা ছিল ১৪ ফেব্রুয়ারি। ১৯২৯। আমেরিকার শিকাগো শহর। সকাল থেকেই অঝোরে তুষারপাত। হাড় ফুটো করে দেওয়া ভয়াবহ ঠান্ডার কামড়। তাপমাত্রা হিমাঙ্কের আট ডিগ্রি নীচে। শহরের উত্তর প্রান্তে লিঙ্কন পার্কের একটা ওয়্যারহাউস বা বিশাল গ্যারেজ কাম গোডাউনে জড়ো হয়েছিল শিকাগোর কুখ্যাত আইরিশ মব বস জর্জ ‘বাগস’ মোরান-এর নর্থ সাইড গ্যাংয়ের ছয় সদস্য। যাদের পরিচয়— ১) পিটার গুজেনবার্গ ও ২) ফ্র্যাঙ্ক গুজেনবার্গ— সম্পর্কে সহোদর ভাই। দু’জনেই মোরান গ্যাংয়ের নৃশংস পেশাদার খুনি। যাদের নাম শুনলে রক্ত ঠান্ডা হয়ে যেত উত্তর শিকাগোর ব্যবসাদারদের। ৩) অ্যালবার্ট ক্যাচলেক— মোরানের সবচেয়ে বিশ্বস্ত সহচর। ৪) অ্যাডাম হেয়ার— ঘোড়দৌড়, গ্রে হাউন্ড রেস, নাম্বার গেম-সহ মোরানের যে কোনও জুয়ার ধান্দার প্রধান বুকমেকার (বুকি) এবং বিজ়নেস ম্যানেজার।
৫) রাইনহার্ড শ্যুমার— একদা প্রথিতযশা চিকিৎসক; পরবর্তী সময়ে পেশা ছেড়ে দিয়ে পুরোপুরি মোরানের জুয়ার ধান্দায় ভিড়ে যায়। ৬) অ্যালবার্ট ওয়েইনস্যাঙ্ক— মোরানের লন্ড্রি বা ডাইং-ক্লিনিং ধান্দার পুরোটাই সামলাত সে; পোশাকআশাক, চলনবলনে সব সময় নকল করত মোরানকে। দু’জনের চেহারাতেও সাদৃশ্য ছিল অনেকটাই। আর এই ছ’জনের সঙ্গে ওই গ্যারেজ-কাম-ওয়্যারহাউসেই ছিল সপ্তম ব্যক্তি, ৭) জন মে— মোরানের গ্যারেজ মেকানিক এবং একই সঙ্গে ওয়্যারহাউসের সুপারভাইজ়ার। এ ছাড়াও ছিল ‘হাইবল’। জনের পোষ্য। জার্মান শেফার্ড (অ্যালসেশিয়ান) প্রজাতির সারমেয়।
একটি বিশেষ উদ্দেশ্যে সেদিন লিঙ্কন স্ট্রিটের ওয়্যারহাউসে জড়ো হয়েছিল মোরান গ্যাংয়ের ওই সদস্যরা। কানাডার সীমান্ত পেরিয়ে চোরাপথে বেশ কয়েক ট্রাক হুইস্কি ঢোকার কথা ছিল এ পারে। বাকি রাস্তাটুকু নির্বিঘ্নে পাড়ি দিয়ে চালানটা নিয়ে এসে কী ভাবে ঢুকিয়ে দেওয়া যাবে এই গুদামে, তা নিয়েই আলোচনা চলছিল গ্যাংয়ের সদস্যদের মধ্যে। গাড়ির কারিগর মে, শেষ মুহূর্তে খুঁটিয়ে দেখে নিচ্ছিল বিশাল ওয়্যারহাউসের কোণে দাঁড়িয়ে থাকা হেভি-বডি চারখানা ট্রাক।
ঠিক এই সময় সদর দরজায় কড়া নাড়ার বারকয়েক খটখট শব্দ। মুহূর্তে সবার হাত কোমরে! সতর্কপায়ে এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলে দিল পিটার, গুজেনবার্গ ভাইদের এক জন। দরজার সামনে দাঁড়ানো দু’জন। পরনে পুলিশ ইউনিফর্ম। হাতে কোল্ট পুলিশ স্পেশাল রিভলভার। বুকে পুলিশ ব্যাজ। দু’জনের পিছনে রাস্তার উপর দাঁড়ানো একটা কালো ভ্যান।
“পুলিশ!” হাতের আই-কার্ডটা সামনে তুলে ধরলেন আইনরক্ষকদের এক জন। দরজা ছেড়ে সরে দাঁড়াল পিটার। ভিতরে ঢুকে এলেন দু’জন।
ঘটনাস্থল থেকে মিটার বিশেক দূরে দাঁড়ানো একটা কালো ক্যাডিলাক। গাড়ির মধ্যে পাশাপাশি বসা দু’জন। পরনে লং ওভারকোট আর বর্ষাতি। মাথায় ফেডোরা হ্যাট। দু’জনেরই কোলের উপর শোয়ানো দু’টি ফুলি অটোম্যাটিক থম্পসন সাব মেশিনগান। তাঁরা তীক্ষ্ণ নজর রাখছিলেন গোটা প্রক্রিয়াটির দিকে। পুলিশ উর্দিধারী দু’জন গোডাউনের ভিতরে ঢুকে যাওয়ামাত্র ক্যাডিলাকটা চালিয়ে নিয়ে এসে দাঁড় করিয়ে দিলেন কালো ভ্যানটার পিছনে।
ক্রমশ