‘এসেছে শরৎ…’ এই ডাক কানে এলেই দূরদেশে থেকেও বাঙালির মন যেন হঠাৎ ছুটে যায় বাংলার আকাশে। কাশফুল, শিউলি, ঢাকের শব্দ আর মায়ের আগমনী— সবই ভিড় জমায় স্মৃতির অলিন্দে। আর কেমব্রিজে? সেখানে পুজো আসার আড়াই মাস আগেই শুরু হয়ে যায় আমাদের দুর্গাপুজোর ব্যস্ততা।
২০২৬-এ সেই পুজো পা দিল পঁচিশ বছরে।
শুরুটা ২০০২ সালে। ক্যাম নদীর তীরে, কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শহরে, মাত্র কয়েকটি বাঙালি পরিবার ও কিছু ভারতীয় ছাত্রছাত্রীর ছোট্ট উদ্যোগে শুরু হয়েছিল এক দিনের দুর্গাপুজো। বিদেশের মাটিতে মাকে ঘরে আনার সে আয়োজন ছিল যেন এক টুকরো কলকাতাকে দূরদেশে ফিরিয়ে আনা। পুজো, ভোগ, সন্ধ্যারতি, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান— সব মিলিয়ে প্রথম বছরেই তৈরি হয়েছিল এক অদ্ভুত আপনজনের আবহ।
তার পর ধীরে ধীরে তৈরি হল ইন্ডিয়ান কালচারাল সোসাইটি বা আইসিএস। জায়গা বদলেছে, পুজোর পরিধি বেড়েছে, বেড়েছে মানুষ। কখনও স্কুল, কখনও গির্জা, কখনও ডারউইন কলেজ— বিভিন্ন জায়গায় হয়েছে মায়ের আরাধনা। ২০০৭-এ পুজো পৌঁছল কেমব্রিজের প্রাণকেন্দ্র ‘গিল্ডহল’-এ। প্রকাশিত হল পুজোর বার্ষিকী। সে বছরই এই দুর্গাপুজো প্রথম ‘সিটি কাউন্সিল’-এর অনুদান পায়। সেই ট্র্যাডিশন আজও চলেছে। ২০০৮-এ এল নতুন প্রতিমা, পুজো হল দু’দিনের। দর্শনার্থীর সংখ্যা ছুঁল প্রায় চারশো। ২০১৬-তে পুজো হল আড়াই দিনের। ষষ্ঠীর বোধন থেকে সপ্তমীর কলাবউ স্নান— উৎসব আরও একটু কাছে নিয়ে এল বাংলাকে।
তার পর আরও দশ বছর পার হয়ে গিয়েছে। এই দশ বছরে বদলে গিয়েছে মানুষ। যে শিশুরা এক দিন মায়ের সামনে পুষ্পাঞ্জলি দিয়েছিল, তারা আজ কেউ কর্মজীবনে, কেউ সংসারে ব্যস্ত। তাদের মা-বাবারা হয়ে গিয়েছেন কাকু-কাকিমা, মাসি-মেসো। আর আমরা? আইসিএস পরিবারের পুরনো দাদু-দিদিমা! কত প্রিয় মানুষ এই চলার পথে হারিয়ে গিয়েছেন। আবার কত নতুন মুখ এসে ভরিয়ে দিয়েছে পরিবার। ক্যাম নদীর জলের মতোই বয়ে চলেছি আমরা, সময়কে সঙ্গে নিয়ে, স্মৃতিকে বুকে রেখে।
২০১৭-তে আমাদের পুরনো প্রতিমার জীবনে এল এক আশ্চর্য অধ্যায়। কুমোরটুলির সেই প্রতিমা, যেটি দশ বছর ধরে কেমব্রিজের পুজোর কেন্দ্রবিন্দু ছিল, স্থান পেল এখানকার ‘মিউজ়িয়াম অব আর্কিয়োলজি অ্যান্ড অ্যান্থ্রোপলজি’তে। আজও সেই প্রতিমা সেখানে ‘আ কেমব্রিজ গডেস’ হিসেবে সংরক্ষিত।
রাজধানী লন্ডন থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত কেমব্রিজের দুর্গোৎসব এই অঞ্চলের অন্যতম প্রধান দুর্গাপুজো। আশপাশের বেশ কয়েকটি এলাকাতেও বারোয়ারি দুর্গাপুজোর আয়োজন হয়। যেমন, পিটারবরোয় দু’টি পুজো ছাড়াও নরফোক, নরউইচ, ইপসউইচ, চেমসফোর্ড শহরেও দুর্গাপুজো অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে।
শুরুতে যেটি ছিল মাত্র কয়েকটি পরিবারের পুজো, আজ এই পুজোর দর্শনার্থীর সংখ্যা দু’হাজার পেরিয়েছে। কিন্তু সংখ্যাই তো এই গল্পের আসল কথা নয়। আসল কথা, এক প্রজন্ম থেকে আর এক প্রজন্মের হাতে পুজোর প্রদীপটি পৌঁছে দেওয়া। কচি কচি হাতে পুষ্পাঞ্জলি, বড়দের হাতে কাঁসর-ঘণ্টা, ঢাকের বাদ্যি, আর তার মাঝখানে মায়ের মুখ। দূরদেশে থেকেও আমরা যেন বারবার খুঁজে পাই আমাদের ঘর।
ক্যাম নদী বয়ে যায়। ঋতু বদলায়। কিন্তু শরৎ এলেই মনে হয়, মা
আবার আসছেন।