দুর্গাপূজার অষ্টমী, বেলুড় মঠ লোকে লোকারণ্য। “নরেন এসে বলে কি, ‘মা, আমার জ্বর করে দাও।’ ওমা, বলতে না
বলতে খানিক বাদে হাড় কেঁপে জ্বর এল। আমি বলি, ‘ওমা একি হলো, এখন কি হবে?’ নরেন বললে, ‘কোন চিন্তা নেই মা। আমি সেধে জ্বর নিলুম এই জন্যে যে, ছেলেগুলো প্রাণপণ করে তো খাটছে, তবু কোথাও কি ত্রুটি হবে, আমি রেগে যাব, বকবো, চাই কি দুটো থাপ্পড়ই দিয়ে বসবো। তখন ওদেরও কষ্ট হবে, আমারও কষ্ট হবে। তাই ভাবলুম— কাজ কি, থাকি কিছুক্ষণ জ্বরে পড়ে।’ তারপর কাজকর্ম চুকে আসতেই আমি বললুম, ‘ও নরেন, এখন তা হলে ওঠ।’ নরেন বললে, ‘হ্যাঁ মা, এই উঠলুম আর কি’— বলে সুস্থ হয়ে যেমন তেমনি উঠে বসল।”
এই অদ্ভুত ঘটনাটি মেলে শ্রীমা সারদা দেবীর স্মৃতিচারণে। ‘নরেন’, নরেন্দ্রনাথ তথা স্বামী বিবেকানন্দের মেজাজমর্জি কেমন ছিল, সময়ে সময়ে কেমন খেপে যেতেন তিনি, আবার শান্ত শিশুটিও হতেন পরক্ষণে, বিবেকানন্দ-পরিকরদের কথায়-লেখায় তার ভূরি উদাহরণ ছড়িয়ে আছে। কিন্তু এ-ঘটনাটা যেন তারই মধ্যে ‘বিশেষ’। তাকে বিশিষ্টতা দিয়েছে পটভূমি— দুর্গাপুজো। আর একটু স্পষ্ট করে বললে, বেলুড় মঠের দুর্গাপুজো। আরও সোজাসাপ্টা ধরিয়ে দিলে— ১৯০১ সালে বেলুড় মঠের প্রথম দুর্গাপুজো। এ বছর যার ১২৫ পূর্ণ হতে চলেছে। এ-ই তো সময়— বহতা কালের আয়নায় এক বার ফিরে দেখার, কেমন ছিল মঠের সেই ‘প্রথম’ দুর্গাপুজো, কী তার পৌর্বাপর্য!
এটা মনে রাখা দরকার, ১২৫ বছর আগের বেলুড় মঠের সেই দুর্গাপূজা স্বামী বিবেকানন্দের ‘আয়োজনে এবং সাক্ষাৎ উপস্থিতিতে’ প্রথম এবং শেষ দুর্গাপূজা। পরের বছর, ১৯০২ সালের দুর্গাপুজোয় তিনি দেহাতীত, লোকান্তরিত হয়েছেন জুলাইয়ের গোড়াতেই। এই সময়টায় কয়েক বছর বেলুড় মঠে দুর্গাপূজা হয়েছে ঘটে-পটে, আবার সময়ে ফিরেছে প্রতিমা। ১২৫ বছর তো কম সময় নয়— এই দীর্ঘকাল জুড়ে কলকাতা, বাংলা, ভারত ও বিশ্বে শ্রীরামকৃষ্ণের নামাঙ্কিত মঠ ও মিশনের ক্রমবিস্তারের যে ইতিহাস, তার এক অতি তাৎপর্যময় ঘটনাবিন্দু, ১৯০১ সালে বেলুড় মঠে প্রথম দুর্গাপূজা।
আজ পুজোর সময় কত মানুষ প্রায় নিয়মের মতো করে বেলুড় মঠে যান। পুজো দেখেন, অঞ্জলি দেন, প্রসাদ পান। মঠ প্রাঙ্গণ লোকারণ্য হয়ে ওঠে, কিন্তু ভিড়ও সেখানে সংযত, সংহত। মণ্ডপে উচ্চগ্রামে কথা নেই, রয়েছে ‘বহু জনতার মাঝে অপূর্ব একা’র অনুভব, পুজো-মন্ত্রোচ্চারণ-আচার-উপচার মিলিয়ে এক অনন্য দৃশ্যশ্রাব্য অভিজ্ঞতা। এই কারণেই হয়তো বহু মানুষ বলেন, দুর্গাপুজো তো হয় কতই, বেলুড় মঠের মতো পুজো কই? বেলুড় মঠের দুর্গাপূজা-নির্ঘণ্ট নজরে রাখেন অনেকে, সেই মাফিক (আসলে বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকা অনুসারে) নিজেদের বাড়ি পাড়া ক্লাবের পুজোর সময়সূচি মিলিয়ে নেন। এই সবই আসলে প্রমাণ— বেলুড় মঠের দুর্গাপূজা বঙ্গীয় সমাজে একটা মানস-সূচক (মেন্টাল ইনডেক্স) বা মানক (স্ট্যান্ডার্ড) হয়ে দাঁড়িয়েছে। জীবনে চলতে-ফিরতে আমরা একটা ‘আদর্শ’ বা ‘সুপারলেটিভ’কে চাই, তার নিরিখে নিজেদের মেপেজুখে নিই। শাস্ত্রবিধি, আচার, ব্যবস্থাপনা, সময়জ্ঞান— এই সব মিলিয়ে দুর্গাপূজা বিপুলায়তন এক চ্যালেঞ্জ। তাকে সামলাতে গেলে নিজেদের যে সুরে মেলানো দরকার, বেলুড় মঠের দুর্গাপুজো সেই তারে বাঁধা বলে মনে হয় আমাদের। মঠের পুজো অনেক আগেই সেই ‘সোশ্যাল ভ্যালিডেশন’ বা সমাজমান্যতা অর্জন করেছে, এখন সে এক ‘সোশ্যাল এগজ়েম্পলার’, সমাজের অনুসরণীয় উদাহরণ, মডেল বলা চলে।
আজ এ-সব শুনতে দিব্যি লাগলেও, শুরুর পথটা সহজ ছিল না মোটেই। ১৮৮৬-তেই তিরোহিত শ্রীরামকৃষ্ণ, ১৮৯৭ সালে কলকাতায় তৈরি হল ‘রামকৃষ্ণ মিশন অ্যাসোসিয়েশন’, উত্তরকালের পরিচিত রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন। মাঝের এই এগারো বছর এক অদ্ভুত সময়, তার শুরুর দিকটা সমাজের অগোচরে আত্ম-নির্মাণের কাল। এই পর্বেও বরাহনগরে জীর্ণ ভগ্ন এক বাড়িতে (প্রথম মঠ, ১৮৮৬-৯২) কিন্তু শ্রীরামকৃষ্ণের সন্ন্যাসী শিষ্যরা দুর্গাপুজো করেছেন। প্রতিমা ছিল না সেখানে— তার সামর্থ্যই ছিল না। নরেন্দ্রনাথ তো তার পর বিদেশে গেলেন, আমেরিকা-ইংল্যান্ডে সাড়া ফেলে বিশ্বজয়ী স্বামী বিবেকানন্দ রূপে ফিরলেন স্বদেশে, তার কিছু পরেই রামকৃষ্ণ মিশন প্রতিষ্ঠা করলেন। মঠ তখন আলমবাজারে একটি বাড়িতে (দ্বিতীয় মঠ, ১৮৯২-১৮৯৮)। ১৮৯৭-এর জুন মাসে ভূমিকম্পে সেই বাড়ির ক্ষতি হল বেশ, মঠ উঠে গেল বেলুড়ে গঙ্গার ধারে, নীলাম্বরবাবুর বাগানবাড়িতে (তৃতীয় তথা ‘পুরনো’ মঠ, ১৮৯৮-৯৯)। ১৮৯৮-এর ফেব্রুয়ারিতে স্বামীজির শিষ্যা মিসেস ওলি বুলের অর্থানুকূল্যে একখণ্ড জমি কেনা গিয়েছিল, সেই জমিতে দাঁড়িয়ে থাকা একতলা এক ভগ্নপ্রায় বাড়িকে সারিয়ে গুছিয়ে শুরু হয় বেলুড় মঠ (চতুর্থ ও স্থায়ী মঠ)। উনিশ ও বিশ শতকের সন্ধিক্ষণে এক নতুন যাত্রা।
মঠ তো হল, কিন্তু লোকে পোঁছে কই? হিমালয়ের গিরিগুহার নির্জনে নয়, বাংলার মাটিতে, গঙ্গার ধারে, লোকসমাজের মধ্যিখানটায় তার উপস্থিতি— সেই সমাজের স্বীকৃতি একটা জরুরি ব্যাপার, নইলে টেকা দায়। সন্ন্যাসী কেন সমাজ নিয়ে বিচলিত হবে— এ সেখানে কাজের কথা নয়। যাঁর নামে এত কিছু, সেই শ্রীরামকৃষ্ণ সমাজকে, মানুষকে হতশ্রদ্ধা করেননি কখনও। তিনি, আর সারদা দেবীও, সারা জীবন চলেছেন নানা রকম মানুষকে নিয়ে, থেকেছেন তাঁদেরই মধ্যে— দক্ষিণেশ্বরে, কলকাতায়, জয়রামবাটীতে। বিবেকানন্দের ‘মিশন’-এরও সমাজবিযুক্ত হওয়ার প্রশ্নই ছিল না, ‘বনের বেদান্ত’কে ঘরে, অর্থাৎ লোকসমাজের মাঝে আনাই যখন তাঁর ব্রত। গোড়ার দিকের বেলুড় মঠের কাছে চ্যালেঞ্জ ছিল এই সমাজস্বীকৃতি অর্জন।
বিবেকানন্দের প্রিয় শিষ্য শরচ্চন্দ্র চক্রবর্তীর লেখায় ধরা আছে সেই আবহ: “বেলুড় মঠ স্থাপিত হইবার সময় নৈষ্ঠিক হিন্দুগণের মধ্যে অনেকে আচার ব্যবহারের প্রতি তীব্র কটাক্ষ করিতেন। বিলাত প্রত্যাগত স্বামীজী কর্তৃক স্থাপিত মঠে হিন্দুর আচারনিষ্ঠা সর্বথা প্রতিপালিত হয় না এবং ভক্ষ্যভোজ্যাদির বাছ-বিচার নাই— প্রধানতঃ এই বিষয় লইয়া নানা স্থানে আলোচনা চলিত এবং ঐ কথায় বিশ্বাসী হইয়া শাস্ত্রানভিজ্ঞ হিন্দু নামধারী ইতর ভদ্র অনেকে তখন সর্বত্যাগী সন্ন্যাসিগণের কার্যকলাপের অযথা নিন্দাবাদ করিত। চলতি নৌকার আরোহিগণ বেলুড় মঠ দেখিয়াই নানারূপ ঠাট্টা তামাসা করিতে এবং এমন কি, সময় সময় অলীক অশ্লীল কুৎসা অবতারণা করিয়া নিষ্কলঙ্ক স্বামীজীর অমলধবল চরিত্র-আলোচনাতেও কুণ্ঠিত হইত না।”
এই সমাজ-মানসিক পরিস্থিতিতেই, ১৯০১ সালে বেলুড় মঠে দুর্গাপূজার আকাঙ্ক্ষা, সিদ্ধান্ত ও আয়োজন— স্বামী বিবেকানন্দের। নতুন বেলুড় মঠে যদি দুর্গাপুজো হয় সন্ন্যাসীদের উপস্থিতি ও ব্যবস্থাপনায়, আর তা যদি দেখতে আসে লোকে, তা হলে তাদের ভুল ভাঙবে, নিজের চোখে তারাই নির্ণয় করবে মঠের শাস্ত্র-আচার-নিয়মনিষ্ঠার সত্যতা। দুর্গাপুজো করার এই ইচ্ছা দৃঢ় হল আরও, যখন স্বামীজির এক গুরুভাই (সম্ভবত স্বামী ব্রহ্মানন্দ) স্বপ্নে দেখলেন অদ্ভুত দৃশ্য, স্বয়ং মা দুর্গা গঙ্গার উপর দিয়ে দক্ষিণেশ্বরের দিক থেকে বেলুড় মঠের দিকে আসছেন! সিদ্ধান্ত হল, যে করেই হোক, পুজো করতেই হবে এ বার মঠে। সামাজিক ও আধ্যাত্মিক, দুই প্রণোদনা মিলেমিশে প্রশস্ত করল বেলুড় মঠে প্রথম দুর্গাপুজোর পথ। স্বামীজি শিষ্য শরচ্চন্দ্রকে রঘুনন্দনের ‘অষ্টাবিংশতি-তত্ত্ব’ বইখানা নিয়ে আসতে বললেন এক দিন, দুর্গোৎসব-বিধি পড়ে নেবেন তা থেকে: “এবার মঠে দুর্গোৎসব করবার ইচ্ছা হচ্ছে। যদি খরচার সঙ্কুলান হয় তো মহামায়ার পুজো করব।”
পুজোর তখন মোটে তিন সপ্তাহ বাকি! গঙ্গা পেরিয়ে সেকালের কুমারটুলি ছুটলেন বিবেকানন্দের দূত, প্রতিমার খোঁজে। ও দিকে আসল কাজও তো বাকি— বাগবাজারে আছেন সঙ্ঘজননী শ্রীমা সারদা দেবী, সবার আগে তাঁর অনুমতি নিতে হবে, তাঁর কথা ছাড়া নড়েন-চড়েন না স্বামীজি। সানন্দ অনুমতি মিলল, আর ও দিকে পোটোপাড়াতেও, কী আশ্চর্য, চোখ-জুড়ানো এক দুর্গাপ্রতিমা পাওয়া গেল— তার মালিক নাকি তাকে নিতে আসেনি, বায়না করেও!
১৯০১ সালের ১৭ অক্টোবর— ১৩০৮ বঙ্গাব্দের ৩১ আশ্বিন— ছিল পঞ্চমী। বেলুড় মঠের ঘাটে সে দিন নৌকো ভিড়ল— প্রতিমা এসেছে কুমারটুলি থেকে! সাধু-ব্রহ্মচারীরা মিলে ঠাকুরঘরের নীচের দালানে সযত্নে রাখলেন সেই প্রতিমা। কিছুক্ষণ পরেই বৃষ্টি নামল: ‘আকাশ যেন ভাঙিয়া পড়িল’, ডায়েরিতে লিখেছেন প্রত্যক্ষদর্শী কুমুদবন্ধু সেন। ১৮ অক্টোবর ষষ্ঠীর দিন প্রতিমা আনা হল মণ্ডপে— মঠের জমিতে উত্তর দিকে তৈরি হয়েছিল মণ্ডপ। বেলতলায় হল বোধন। মঠের প্রথম দুর্গাপূজার মূল ব্যবস্থাপক ছিলেন স্বামী ব্রহ্মানন্দ, পূজক ব্রহ্মচারী কৃষ্ণলাল, আর তন্ত্রধারক ঈশ্বরচন্দ্র চক্রবর্তী (স্বামীজিরই আর এক গুরুভাই, স্বামী রামকৃষ্ণানন্দ তথা শশী মহারাজের পূর্বাশ্রমে পিতা)। সারদা দেবী বাগবাজারের বাড়ি থেকে চলে এসেছিলেন মঠে, উঠেছিলেন নীলাম্বর মুখুজ্যের বাগানবাড়িতেই। গোটা পুজোটাই হয়েছিল তাঁর উপস্থিতিতেই নয় শুধু, তাঁরই নামে সঙ্কল্প করে। সন্ন্যাসীর বৈদিক ক্রিয়া-পূজায় অধিকার নেই, সেই শাস্ত্রবিধি মেনে এই ‘সঙ্কল্প’ ব্যবস্থা, এবং ব্রহ্মচারীকে দিয়ে পূজনের রীতি— অনুসৃত আজও।
ইতিহাস হয়ে যাওয়া যে সময়ে আমরা ছিলাম না, তার প্রত্যক্ষদৃষ্ট বয়ান, সেই সময়ের শিল্পীর আঁকা বা তোলা ছবি আমাদের সাহায্য করে সেই না-থাকার আফসোস মেটাতে। শরচ্চন্দ্র আর কুমুদবন্ধু, এই দু’জনের বয়ানে বেলুড় মঠের প্রথম দুর্গাপুজোর বর্ণনা রসজ্ঞ ও জ্ঞানী পাঠকের অজানা নয়। বিশেষত কুমুদবন্ধুর ডায়েরি— অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পেরিয়ে যা ছাপা হয়েছিল ‘উদ্বোধন’ পত্রিকায়— চমৎকার এক চিত্রধারাবিবরণী তুলে ধরে। “পুণ্যসলিলা ভাগীরথীবক্ষে প্রাতঃকালে রসুনচৌকীর সানাই মধুরসুরে নানা রাগিণীতে বাজিতেছিল এবং মাঝে মাঝে ঢাকঢোল দুই কূল পরিপ্লাবিত করিয়া মহামায়ীর পূজাবার্তা বীরগর্বে ঘোষণা করিতেছিল (কুমুদবন্ধু)।” “নহবতের সুললিত তানতরঙ্গ গঙ্গার পরপারে প্রতিধ্বনিত হইতে লাগিল (শরচ্চন্দ্র)।” বেলুড়, বালি, উত্তরপাড়া-সহ কাছাকাছি জায়গাগুলির নৈষ্ঠিক ব্রাহ্মণদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল আলাদা ভাবে— ১২৫ বছর আগের প্রভাবশালী সমাজমনের স্বীকৃতি অর্জনের জন্য সেদিনের শিশু সংগঠনটির দরকার ছিল তা, বোঝা যায়। কিন্তু বৃহত্তর উদ্দেশ্যটি সিদ্ধ হয়েছিল তাতে, এই মানুষেরা এসে নিজেদের চোখে দেখে গিয়েছিলেন, শুদ্ধাচারে নিয়মনিষ্ঠা ভরে কেমন পুজো হচ্ছে মঠে। দুর্গাপুজো ও তার আমন্ত্রণের সূত্র ধরে বেলুড় মঠ সম্পর্কে লোকধারণা বদলাতে শুরু করে।
১২৫ বছর আগে, আজকের দিনে ছিল দুর্গাপুজোর ষষ্ঠী। বেলতলায় বোধন— বিবেকানন্দ প্রাণভরে গাইলেন, ‘গিরি গণেশ আমার শুভকারী/ পূজে গণপতি পেলাম হৈমবতী/ চাঁদের মালা যেন চাঁদ সারি সারি’। এ গান পাওয়া যাবে কথামৃতেও— ১৮৮৪ সালে দুর্গাপুজোর নবমীর দিন দক্ষিণেশ্বরে স্বয়ং শ্রীরামকৃষ্ণের মুখে: ‘ঘরে আসবেন (আনব) চণ্ডী, শুনব কত (কর্ণে শুনব) চণ্ডী/ কত আসবেন দণ্ডী যোগী জটাধারী (আসবে কত দণ্ডী জটাজূটধারী)’...। পরদিন সপ্তমী, “সদানন্দময় পুরুষ স্বামীজীকে এদিক-ওদিক পায়চারি, গল্প ও হাস্যকৌতুক করিতে দেখিয়াছি,” লিখেছেন কুমদবন্ধু। কখনও মণ্ডপে ধ্যানমগ্ন, কখনও গুনগুনিয়ে গাইছেন ‘সদানন্দময়ী কালী, মহাকালের মনমোহিনী।/ তুমি আপনি নাচো, আপনি গাও, আপনি দাও মা করতালি’। অষ্টমীতে ভিড়ে ভিড়াক্কার মঠ প্রাঙ্গণ, “হাজার হাজার নরনারী পূজা দেখিতে ও পুষ্পাঞ্জলি দিতে আসিয়াছে,” আর মঠবাড়ির দোতলার ঘরে জ্বরে পড়ে আছেন বিবেকানন্দ— লেখার শুরুতে উল্লিখিত যে ঘটনাটা। পরদিন সকালে সন্ধিপুজো, দেখা গেল তিনি মণ্ডপে, “উজ্জ্বল জ্যোতির্ময় সহাস্য মুখমণ্ডল— ভাবগম্ভীর ভাবে বসিয়া আছেন,” লিখেছেন কুমুদবন্ধু। সচন্দন বেলপাতা-জবাফুলে অঞ্জলি দিলেন। “যথাবিধি কয়েকটি কুমারীর পূজা হইল— স্বামীজী একজনকে পূজা করিলেন।” এই কুমারীপূজার আর একটি বর্ণনায় পাওয়া যায় এক অতি আশ্চর্য দৃশ্যের বয়ান, এক কুমারীর কপালে রক্তচন্দন পরানোর সময় বিবেকানন্দ অস্ফুটে বলে ওঠেন, “আহা, দেবীর তৃতীয় নয়নে আঘাত লাগেনি তো!”
বেলুড় মঠে প্রথম দুর্গাপুজোর তিন দিনেই বহু লোকসমাগম হয়েছিল। স্বামীজির নির্দেশ ছিল, ‘দরিদ্রনারায়ণ’দের বিশেষ যত্ন করে খাওয়াতে হবে। নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছিল তা। এমনকি, মন্বন্তরের বছর ১৯৪৩-এ যখন দুর্গাপূজা এগিয়ে আসছে, প্রতিমার বদলে ঘটে-পটে পূজা হওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে, তখন রামকৃষ্ণ সঙ্ঘের তৎকালীন অধ্যক্ষ, স্বামী বিবেকানন্দের প্রত্যক্ষ শিষ্য স্বামী বিরজানন্দের চিঠিতে পাওয়া যায় এই নির্দেশ, “পূজা বাবদ যতদূর সম্ভব কম খরচ করে (আন্দাজ ২০০-৩০০ টাকা) বাকি টাকা মঠে আগত, তা সে যত সংখ্যাই হোক— দুঃস্থ, বুভুক্ষু, অনাথ-আতুরদের খাওয়াতে ব্যয় করবে। কেউ যেন নিরাশ হয়ে ফিরে না যায়। শুধু খিচুড়ি পর্যাপ্ত পরিমাণে ব্যবস্থা হবে। তাতেই শাক-সবজি যা কিছু দেবে। অন্য তরকারি মিষ্টান্ন কিছু দরকার নেই। এ খিচুড়ি মায়ের সামনে হাণ্ডা হাণ্ডা করে বিরাট ভোগ দিয়ে তারপর সর্বহারা নারায়ণদের পরিবেশন করতে হবে। এইবার মা এইভাবে পূজাভোগ গ্রহণ করবেন ও আমাদের পূজা সার্থক হবে। আলাদা ব্যবস্থা কারো জন্য নয়।”
পুজো শুরুর মুখে কি কেউ বিসর্জনের কথা বলে তাই? আজ, ২০২৬-এর বেলুড় মঠে দুর্গাপুজোর সবে সপ্তমী, ১২৫ বছর আগের পুজোর বিজয়াদশমীর কথা লিখতে তাই মন বা কলম সরে না। একটি দৃশ্য তবু চোখে ভাসে: গঙ্গাবক্ষে নৌকায় তোলা হয়েছে প্রতিমা, মায়ের সামনে ভাববিভোর হয়ে নাচছেন গুরুভাই স্বামী ব্রহ্মানন্দ, আর মঠের দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে তা দেখছেন স্বামী বিবেকানন্দ। কী ভাবছিলেন তিনি সেই মুহূর্তে, আজ জানার উপায় নেই। তবে যুগান্তকারী আরও অনেক কিছুর মতোই, আর একটি ‘শুরু’ করে দিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলেছে, আজও।