ঘুম ভাঙতেই হঠাৎ খুব কান্না পেল বিলাসের।
এত কান্না কোথায় থাকে, এই সাতাত্তর বছর বয়সেও ভেবে পান না বিলাস। ছোটবেলায় অন্ধ বাবাকে যখন শরৎচন্দ্র পড়ে শোনাতেন, বাবাও কাঁদতেন, তিনিও। বাড়ির বাছুর মরে গেল, ছোট্ট বিলাস কেঁদে আকুল। পুজোয় ঠাকুর দেখতে বেরিয়ে প্যান্ডেলের বাইরে দেখলেন, ছেলে কোলে ভিক্ষে চাইছে মা। বিলাস বাড়ি ফিরলেন চোখ মুছতে মুছতে। এই সে দিনও ছেলের কিনে দেওয়া মোবাইলে ফিরে দেখলেন তারসানাইয়ের সুরে অপুর কোলে কাজলের ঝাঁপিয়ে পড়া। ‘সংসার’ মাথায় উঠল, বুড়ো বিলাস কাঁদলেন।
জানলার পর্দা ঠেলছে রোদের শিশু। হাতে তার এক গামলা নীল রং। বিলাসের কানে আসছে বাইরের ঘরে দু’বছরের নাতির অর্থহীন সংলাপ। তবু বিলাসের একা লাগছে খুব। একটু আগে ঘুমের মধ্যে যারা তাঁর সঙ্গে ছিল, তারা কেউ আর নেই। চেষ্টা করলেও আর তাদের দেখতে পাবেন না কোনও দিন।
ছোটবেলার স্বপ্ন দেখছিলেন বিলাস। মফস্সল শহরের রাস্তা ধরে চলেছে তাঁদের ‘মিছিল’। ঠাকুর দেখার মিছিল। তাঁদের একান্নবর্তী পরিবারের লোকসংখ্যা পঞ্চাশের বেশি। বাড়ির কোনও ঠিকানা নেই, ‘বসুবাড়ি’ আর পোস্ট অফিসের নাম লিখলে সেখানে আজও পৌঁছে যায় চিঠি। সেই ‘ঠিকানাহীন’ বাড়ি থেকে তাঁরা ভাইবোনেরা মিলে যখন পুজোর সন্ধেয় ঠাকুর দেখতে বেরোতেন, দূর থেকে মিছিলের মতোই দেখাত! এ পাড়া, সে পাড়া ঘুরতে ঘুরতে মিছিলে ভিড়ে যেত বন্ধুবান্ধব, পরিচিতেরাও। লোকে দূর থেকে বলত, ‘ওই আসছে বসুবাড়ি’। বড় পুকুরের ধার, নতুন বাজার হয়ে রেলব্রিজের তলা দিয়ে ছোট রাস্তা ধরে গার্লস স্কুলের মাঠের পুজো। রাস্তাটা বড় ভাল লাগত বিলাসের। একটা মণ্ডপের আলোর সুতো শেষ হয়ে বেশ খানিকটা পথ আধো-অন্ধকার। বিলাসদের সেই শহরে এমনিতেই আসার তাড়া থাকে শীতের। আর পুজো আসতে অক্টোবর হয়ে গেলে সন্ধের হাওয়া রীতিমতো শিরশিরে। সেই হাওয়ায় চাপ বেঁধে থাকত ফুলের গন্ধ। বড় হয়ে বিলাস জেনেছেন, ফুলের নাম ছাতিম।
দেশের বাড়ি যাওয়া হয় না বহু দিন। তবু আজ ঘুমের মধ্যে বিলাস ছাতিমের গন্ধ পাচ্ছিলেন। দেখতে পাচ্ছিলেন নিজেকে, বিট্টুকে। বিট্টু তাঁর ভাগ্নে। দু’জনে প্রায় সমবয়সি। বিলাস আর বিট্টু হাঁটছিলেন ওঁদের দলটার আগে-আগে। পিছন থেকে কচিদার মিঠে গলার গান ভেসে আসছিল। বুনোদা সাইকেল হাঁটাচ্ছিল, সোনাদা ওকে বিড়ি ধরিয়ে দিচ্ছিল। মেনিদি, বিবিদি আর ওদের বন্ধু সুধাদি, করুণাদিরা দলের মাঝখানে। কলকল করে কথা বলছিল ওরা। একটু একটু শুনতে পান বিলাস। সুবীরদাকে নিয়ে কথা হচ্ছে। সুবীরদা ঢাক বাজাচ্ছিল আশ্রমের পুজোয়। করুণাদিকে দেখে নাকি হেসেছে। ছাতিম-গন্ধ বুকে নিয়ে হঠাৎ ইচ্ছে করেই মনে মনে একা হয়ে যান কিশোর বিলাস। হাঁটেন আকাশপাতাল ভাবতে ভাবতে। নিজেকে বড়-বড় লাগে। কচিদার গান, মেনিদিদের গালগল্প আবছা হয়ে আসে। মনে হয় কেউ নেই চারপাশে।
তার পর স্বপ্ন ভাঙে। বিলাস দেখেন, শহরতলির বহুতলে নিজের ঘরে, নিজের বিছানায় তিনি একা। মেনিদি, কচিদা, বুনোদারা কেউ নেই। সেই কবে পৃথিবীর মায়া কাটিয়েছে ওরা। বিট্টুটাও তো গত বছর হঠাৎ করেই... বিট্টুর সঙ্গে এখন নিশ্চয়ই দেখা হয় ওর বাবার। তিনি যখন মারা যান, বিট্টু তখন মাতৃগর্ভে। বসুবাড়ির ঠাকুর দেখার মিছিলে যারা হেঁটেছিল, বিলাসকে নিয়ে তাদের মধ্যে বড়জোর তিন-চার জন বেঁচে আছে আজও।
বিলাস কান্নাটা আসতে দিলেন।
ক্লাস ফাইভ-সিক্সে পড়ার সময়ে মহালয়ার দিনে ডায়েরিতে অর্ক লিখেছিল, ‘কে জানত এ বারের বর্ষা এত লম্বা হবে? তবু আকাশ আজ অবশেষে নীল। বর্ষাকালের সবটুকু কালো রং কে যেন মুছে দিয়েছে।’ জেঠিমা সেই ডায়েরি পড়ে মাথায় হাত বুলিয়ে হেসে বলছিলেন, “হুমম? পুরো রচনাবই?”
বিলাস বসুর একমাত্র পুত্র অর্ক মুখ ফুটে বলতে পারেনি, ‘বই থেকে টুকিনি জেম্মা, বাবার থেকে শিখেছি।’
নিচু ক্লাসে অর্কর স্কুলের রচনাগুলো একটা পুরনো ডায়েরিতে লিখে দিতেন বিলাস! সেই রচনা মুখস্থ করে বাংলা পরীক্ষা দিতে যেত অর্ক। আজ বিলাস জানেন, রচনা খাতা নিমিত্তমাত্র। অর্কর অজানতেই তার হৃদয় খুঁড়ে নিয়মিত সার-জল দিয়েছেন তিনি। বছর দশেকের অর্ক এক ঝলমলে ষষ্ঠীর সকালে বাবাকে বলেছিল, “দেখো, চারপাশে কেমন একটা গন্ধ। কিছুতেই বুঝতে পারছি না গন্ধটা কিসের।”
বিলাস হেসেছিলেন, “ওটাকেই তো বলে পুজো-পুজো গন্ধ! এ গন্ধ যার পাওয়ার, সে ঠিকই পায়।”
লোকে বলে, বাদলমেঘ থেকে নাকি মনখারাপ ঝেঁপে আসে। শরৎমেঘেও কি মনখারাপ নেই? শরতের নীলাকাশের পেঁজা তুলো হঠাৎ মনকেমনের সুতো হয়ে কার কোন অতলে টান দেবে, কেউ বলতে পারে না! এই যেমন বিলাস একটু আগে কাঁদছিলেন। বরাবরই পুজো যত কাছে আসে, বিলাসের মন জুড়ে একটা ব্যথা ছড়িয়ে পড়ে। বয়সকালে ব্যথা বাড়ে। মেলে না উপশম।
অর্ক এসে জিজ্ঞেস করে, “রেডিয়োটা এ বছরও সারাতে দেবে? কী লাভ? মনে নেই, গত বছর তিনটে পাড়া থেকে তিনটে সময়ে লাউডস্পিকারে ‘মহিষাসুরমর্দ্দিনী’ চালিয়েছিল? এটায় ‘জাগো দুর্গা’ বাজছে, তো ওটায় সবে ‘আশ্বিনের শারদপ্রাতে’। মিলেমিশে একাকার। শুনতে পারবে শান্তি করে?”
বিলাস বলেন, “দেখা যাক, সারিয়ে তো রাখ।”
বিলাসের ছোটবেলায় দেশের বাড়িতে মহালয়া মানে ছিল মহা-আয়োজন। আগের রাতেই বড় রেডিয়োটা এনে রাখা হত মাঝের ঘরে। শতরঞ্চি পাতা হত পরিপাটি করে। রেডিয়ো চালিয়ে দিয়ে মেজবৌদি সবার জন্য কালো কফি করত। রাঙাদা থাকলে ধূপ জ্বালিয়ে দিত ঘরের কোণে। বিলাস চোখ কচলে গুটিগুটি এসে মাঝের ঘরে বসতেন। কফি করা থেকে শতরঞ্চি পাতা, সবেতেই মেজবৌদির সঙ্গে হাত লাগাত দাদা। তার পর সবাই এসে মাঝের ঘরে জুটতে শুরু করলেই দাদা ঘুমিয়ে পড়ত। ও আবার উঠত ‘রূপং দেহি’ শুরু হলে। দাদা, ছোড়দা, গদাইদা মিলে বেরিয়ে যেত জিলিপি আনতে। বসুবাড়িতে মহালয়ার দিনে জিলিপি আসবেই। একচোট জিলিপি খাওয়ার পরে দল বেঁধে পুলের ধারে বেড়াতে যাওয়া। সে-ও এক মিছিল। দু’ধারের গাছগুলো মাথায়-মাথায় মিলে আর্চের মতো ঢেকে রাখত সরু পিচরাস্তাটাকে। পুলের ধারে কাশের বন। পাশে ধানের খেত।
মনে মনে ফের দেড়শো কিলোমিটার পাড়ি দেন বিলাস। আগে পুজোর ছুটি পড়লে এক সঙ্গে দেশের বাড়ি যাবেন বলে কলকাতার নানা জায়গা থেকে ভাইবোনেরা হাওড়া স্টেশনের বড় ঘড়ির তলায় জড়ো হতেন। চড়ে বসতেন লোকাল ট্রেনে। কখনও কখনও গোটা পথটা গান গাইতে গাইতে যেতেন ওঁরা। এই সব গল্প অর্ক শুনেছে আশৈশব, দেখেছেও কিছুটা। তাই আজ তালাবন্ধ সেই পৈতৃক বাড়ির কথা উঠলে চোরা-কষ্ট পায় অর্ক, সে কথা বিলাস বোঝেন।
মাঠেঘাটে নয়, ওই বাড়িতেই অর্ক প্রথম সত্যিকারের কাশফুল চিনেছিল। এক বার পুজোয় বাড়ি গিয়ে ও দেখে, ছোটজেঠুর হাতের কল্কা আঁকা ফুলদানি-কলসিতে গোছা গোছা তুলোর মতো ফুল সাজানো। কী ফুল ওগুলো?
মেনিপিসি বলেছিল, “কাশফুল।”
ম্যাজিক বাক্সের মতো সেই বন্ধ বাড়ির কোন কোণে শূন্য ফুলদানি আজও পড়ে আছে, কে জানে। মেনিপিসি নেই, ছোটজেঠু নেই, মেজোজেঠিমা নেই। অথচ পুলের ধারে কাশফুল আজও ফোটে। পরিযায়ী মেঘেরা আজও খবর নিতে আসে বসুবাড়ির। পুজোর ছুটিতে দেশের বাড়ি গেলে বিলাসের কড়া হুকুম ছিল, ষষ্ঠী থেকে দশমী অর্ককে বইখাতা ছুঁতে বলা যাবে না। তবে সে বাড়িতে সমবয়সি সঙ্গীর অভাব। অর্ক তাই একা-একাই সারা দিন উঠোনে ঘুরত, আমগাছতলায় শুয়ে বই পড়ত, কানে আসত আশ্রমের পুজোর ঢাক। আর শিখত একা-একা মানিয়ে নেওয়া। পুজোর ছুটির আগে হওয়া হাফ-ইয়ারলি পরীক্ষায় অঙ্কে কুড়ি নম্বর ছেড়ে আসার কথা মনে পড়ত আচমকা। ছুটির পরেই সেই খাতা বেরোবে। হুশ করে এসে কেমন নির্দয়ের মতো চলেও যাচ্ছে পুজোটা! মনের কী দায় আছে ভাল থাকার!
তা এ সব কথা কি শুধু রচনা বইয়েই থাকে? আর রচনা তো মানুষেই লেখে। হ্যাঁ, কিছু কথা থাকে, যেগুলো হাজার পাতা লিখেও বোঝানো যায় না। অষ্টমীর অঞ্জলি দিয়ে ফিরে কাউকে দিনে-রাতে কেন মনে পড়তে শুরু করে, এড়াতে চাইলেও কেন চোখকে টানে চোখ, এক-একটা সকালে কেন নিজেকে ভীষণ ভালবাসতে ইচ্ছে করে, মন ভিজে ওঠে ভীষণ স্নেহে বা কৃতজ্ঞতায়, হঠাৎ কেন একা বা ভিড়ের মধ্যে কান্না পেয়ে যায়, এ সব কে কবে আগাগোড়া বোঝাতে পেরেছে! ওই যে পুজো-পুজো গন্ধ, তাকেই কি কালি-কলমে পুরোটা ধরতে পেরেছে কেউ? পুজোর গন্ধ তো শুধুই শিউলি ফুল আর ধূপধুনোর নয়। তাতে কি রোদের গন্ধ, টাটকা হাওয়ার গন্ধ, মেঘের গন্ধ, প্যান্ডেলের বাঁশ-কাপড়ের গন্ধ, নতুন জামা, নতুন পুজোসংখ্যার গন্ধও মিশে নেই?
“পুজোর গন্ধ নিয়ে গবেষণা করতে যাস না, থই পাবি না।”— আড্ডায় অর্ককে বলেছিল তিন্নি। অর্কর বইয়ের নেশা অনেকটাই ওর দশ বছরের বড় জেঠতুতো দিদি তিন্নির থেকে পাওয়া। ভাইকে তিন্নি বলেছিল, “খুব গভীর ভাবে ভাবলে দেখবি, প্রতিটা বছরের পুজো ঘিরে আনন্দ আর কষ্টের অনুপাতটা প্রায় সমান-সমান। আনন্দের প্রায় পুরোটাকেই তুই দেখতে পাবি, ছুঁতে পারবি। যে কষ্টগুলো বাইরে থেকে এসে তোকে ধাক্কা দেবে, তাদেরও দেখতে পাবি। কিন্তু অনেকগুলো কষ্ট আসবে তোরই ভিতর থেকে। কেন আসছে, ঠিক বুঝবি না। কিন্তু দেখবি, সেই কষ্টগুলোই দলে ভারী।”
অর্ক মিলিয়ে নিয়েছিল তিন্নির কথা। দেবীপক্ষে গভীর রাতে বাড়ির বারান্দায় একা দাঁড়িয়ে আলোয় সাজানো নীচের গলিটার দিকে চেয়ে অন্তত একদিন অকারণ মনখারাপ হয়নি, এমন কোনও পুজো নেই।
এ কথা তো আর নতুন করে কাউকে বোঝানোর নেই যে, পুজোর প্রস্তুতিকে পুজোর ফ্রেমের মধ্যে না-রাখাটা দস্তুরমতো অন্যায়। দশমী ধরলে শেষের পাঁচটা দিন যাকে বলে ‘ক্লাইম্যাক্স’। কিন্তু ষষ্ঠী থেকে দশমী যদি নাটকের চূড়ান্ত অভিনয় হয়, তা হলে আগের অন্তত মাস দেড়েকের মহড়াটাকেও তো গুনতে হবে! ওই সময়টার মধ্যে পুজোর বাজার করা আছে, সেই পর্ব সারতে সারতে ক্লান্ত হয়ে পড়লে রেস্ত গুনে সাধ্যমতো রেস্তরাঁয় দু’দণ্ড জিরিয়ে দু’টি খাওয়া আছে, রেডিমেডে যাঁদের চলে না, তাঁদের দর্জির দোকানে একপ্রস্ত ছোটাছুটি আছে, পুজোসংখ্যা কেনা অথবা না-কেনা আছে, প্রয়োজন বোধ করলে জরুরি ভিত্তিতে রূপচর্চা বা শারীরচর্চা আছে এবং চূড়ান্ত পাঁচ দিনের কর্মসূচি মোটামুটি ছকে ফেলা আছে। প্রবাসীদের ঘরে ফেরা বা পুজোয় ঘর ছেড়ে বাইরে পাড়ি দেওয়ার পরিকল্পনা থাকলে টিকিটের ঝামেলা চুকিয়ে ফেলতে হবে অনেক আগেই। এ তো আর রেলস্টেশনের ‘ঘটাং ঘটাং’ ছাপমারা খয়েরি পিচবোর্ডের চৌকো টুকরো নিয়ে দিকশূন্যপুরের ট্রেনে চড়ে বসা নয়!
এই সব ক’টা সিঁড়ির ধাপে এক পরত করে নতুন স্মৃতি জমা হয় প্রতিটি পুজোয়। আর সেই সিঁড়ির ফাটলেই পিঁপড়ের মতো বাসা করে মনকেমনেরা। শেষ কবে পুজোর বাজার করেছিলাম বাবা-মায়ের সঙ্গে? সে বার শহরতলি থেকে ট্রেনে করে শিয়ালদহে এসে নেমেছিলাম। সেখান থেকে বাসে ধর্মতলা। আগের রাতে উত্তেজনায় ঘুম আসছিল না। মটকা মেরে শুয়ে বাবা-মায়ের কথা শুনেছি। খরচ বড্ড বেড়ে যাচ্ছে। তবু পরের দিন বাবা সবার জন্য জামাকাপড় কেনার পরেও ধর্মতলার বিখ্যাত দোকানের মোগলাই পরোটা খাইয়েছিল। হাঁটু অপারেশনের পরে বাবা তো এখন বাসেই চড়তে পারে না। ধকল পোষায় না মায়েরও। আমাদের এক সঙ্গে আর ফেরা হয় না মোগলাই পরোটার দিনগুলোয়।
“বেশি নাটক হয়ে যাচ্ছে!” স্মৃতি থেকে ভেসে উঠে নিজেকেই শাসন করে তিন্নি। অবশ্য নাটক যে এতে একেবারেই নেই, এমন নয়। পুজোর আগের একটা মাস তিন্নির হইহই করে কাটত সত্যিকারের নাটকের মহড়ায়। তাদের স্কুলে প্রতি সেপ্টেম্বরে সব ক’টা ক্লাসকে নিয়ে এক সপ্তাহ ধরে চলত চল্লিশ মিনিটের নাটকের প্রতিযোগিতা। আর তার সমান্তরালেই এগোত স্কুলের বার্ষিক অনুষ্ঠানের তোড়জোড়, যেটা পুজোর ছুটি পড়ার আগের দিন হত শহরের বড় কোনও প্রেক্ষাগৃহে। সেই অনুষ্ঠানে হত বড় নাটক, সব শ্রেণির ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে। দুটো নাটকেই থাকত তিন্নি। এক বার কলকাতার এক বড় নাট্যগোষ্ঠী তাদের স্কুলে কর্মশালা করিয়েছিল। ফিরবে আর সেই সব দিন? পার্ট মুখস্থ করার ফাঁকে স্কুলের গেট থেকে টুক করে কিনে আনা ঘটি-গরমের ঠোঙা, সরু প্লাস্টিকের প্যাকেটে এক টাকা দামের রঙিন বরফের ‘পেপসি’, নাটকে লাগবে বলে বাড়ি থেকে আনা পুরনো টেলিফোন সেট, মায়ের শাড়ি, ভাইয়ের খুদে কি-বোর্ড— ফিরবে? বার্ষিক অনুষ্ঠানের নাটক করাতেন রাজেন স্যর। প্রচণ্ড রেগে যেতেন রিহার্সালে। রাজেন স্যর মারা গিয়েছেন তিন্নি স্কুল ছাড়ার কিছু দিনের মধ্যেই। অবসর নেওয়া তখনও বাকি ছিল।
পুজোর মুখেই তিন্নির জন্মদিন। কাকুর অফিসে সব ক’টা পত্রিকার পূজাবার্ষিকীর দুটো করে কপি আসত। পুজোর জামাকাপড় দিতে এসে কাকিমা ঝোলাব্যাগ থেকে বার করত ছোটদের পত্রিকাটা— তিন্নির জন্মদিনের আগাম উপহার। প্রথম পাতায় কালো কালিতে কাকুর মুক্তাক্ষরে লেখা ‘শুভ জন্মদিন তিন্নিবুড়ি’। জন্মদিনে কাকু-কাকিমা আজও ভিডিয়ো-কল করে চল্লিশের চৌকাঠে দাঁড়ানো তিন্নিকে। দিল্লিতে বসে একটু চেষ্টাচরিত্র করে কয়েকটা বাংলা পূজাবার্ষিকী এখনও জোগাড় করে ফেলে তিন্নি। কিন্তু সে-সব বইয়ে কাকিমার ঝোলাব্যাগের জর্দার গন্ধ, কাকুর হাতের লেখা কই?
সব জট পাকিয়ে যাচ্ছে। রবিবারের সকালে ড্রয়িংরুমের মেঝেতে বসে এসির ঠান্ডাতেও ঘেমে ওঠে সঞ্জয়। ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’-এর গানের ক্যাসেটের ফিতেটা বিচ্ছিরি ভাবে জড়িয়ে গিয়েছে ক্যাসেট প্লেয়ারে। ছোটবেলায় সঞ্জয়ের প্রিয়তম ক্যাসেট ছিল এটা। অনেক দিন পরে একটা ক্যাসেট প্লেয়ার পেয়ে নিজের পুরনো ক্যাসেটের ঝুলি খাটের তলা থেকে বার করে একের পর এক চালাচ্ছিল সঞ্জয়। এক-একটা ক্যাসেট খুলছিল, আর সিনেমার মতো ওর চোখের সামনে খুলে যাচ্ছিল ফেলে আসা জীবনের একটা করে পাতা।
এই তো হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের রবীন্দ্রসঙ্গীত, বাবার কিনে দেওয়া প্রথম ক্যাসেট। বুবুদার কাছ থেকে ধার করে এনে আর কখনও ফেরত না-দেওয়া কিশোরকুমারের ‘আমার পূজার ফুল’। স্বপন বসুর লোকগীতি, ভাইফোঁটায় মুন্নিদি দিয়েছিল। জন্মদিনে দাদার দেওয়া কবীর সুমনের ‘তোমাকে চাই’, টিউশন পড়ে ফেরার পথে আর সকলের চোখ এড়িয়ে রেশমীর দেওয়া ‘চন্দ্রবিন্দু’। রেশমী সম্পর্কটা শেষ করেছিল থার্ড ইয়ারে, পঞ্চমীর সকালে। সে বছরের পুজোর রাতগুলো ছটফট করে জেগে কেটেছিল সঞ্জয়ের। তবু ক্যাসেটটা প্রাণে ধরে ফেলে দিতে পারেনি। গুপী গাইনের ক্যাসেট ক্লাস টু না থ্রি-তে পড়ার সময়ে পুজোর নতুন জামার সঙ্গে পাঠিয়েছিল মাসি। ইনলে কার্ডে আবছা হয়ে আসা মাসির হাতের লেখা। গুপী-বাঘাকে যন্ত্রে চড়ানোর আগে সঞ্জয় খেয়াল করেনি, অব্যবহারে জ্যাম হয়ে গিয়েছে তাদের ক্যাসেটের একটা চাকা।
এই সময়েই ছেলেকে সাঁতারের ক্লাসে পৌঁছে দিয়ে তিন্নি বাড়ি ফেরে। টেপরেকর্ডারটা ওরই, পড়ে ছিল কলকাতার বাড়িতে। গত বারের ছুটিতে গিয়ে সেটাকে সারিয়ে-সুরিয়ে এনে দিয়েছিল সঞ্জয়কে। বলেছিল, “এটাকে তোমার থেকেও একটু বেশি ভালবাসি। সাবধানে রেখো।”
সঞ্জয়ের দশা দেখে হেসে ফেলে তিন্নি। পাশে বসে পড়ে আলতো হাতে, অনেকটা সময় নিয়ে ক্যাসেটটাকে ছাড়িয়ে আনে প্লেয়ার থেকে। ছেলের পেনসিলবাক্স থেকে একটা পেনসিল এনে গোটাতে থাকে এলোমেলো ধূসর ফিতে।
চেয়ে থাকে সঞ্জয়। বিয়ের এত বছর পরেও তিন্নিকে দেখে ও মাঝে মাঝে অবাক হয়। প্রথম আলাপের পরে ছুটির দিনে সঞ্জয় আর তিন্নির যখন দেখা হত, এক-এক সময়ে তিন্নিই কথা বলে যেত অনর্গল। এক বার সপ্তমীর কলকাতায় হাঁটতে বেরিয়েছে দু’জনে। তিন্নি বলছিল ফেলে আসা পুজোর জন্য ওর মনখারাপের কথা। সঞ্জয় শান্ত গলায় বলেছিল, “রাগ না-করলে একটা কথা বলি শোনো। আমাদের মনকেমন খাঁটি, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু মনে রাখতে হবে সেটা মধ্যবিত্ত, শহুরে মনকেমন। এই বৃত্তের বাইরের মানুষগুলোকে আমরা কতটা চিনি? ওই যে বেলুনওয়ালা, গেটের মুখে বিজ্ঞাপনের লিফলেট বিলোনো লোকটা, লিফলেটগুলো শেষ হলে হয়তো বৌ-বাচ্চাকে কয়েকটা ঠাকুর দেখিয়ে আনবে... ধরেই নাও ওদের কাছে পুজোর দিনে এক প্লেট মোগলাই পরোটাও বিলাসিতা। তুমি-আমি অন্তত সেটুকু পেয়েছি। আবার উচ্চবিত্ত, ক্ষমতাশালীরা যে পুজো কাটায় বা কাটিয়েছে, তা আমাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে।”
হাঁটতে হাঁটতে ছোটবেলায় পড়া একটা গল্পের কথা তিন্নিকে বলেছিল সঞ্জয়। সেই গল্পে এক বুড়ো ঢাকির সঙ্গে তার ছোট্ট নাতিও এল পুজোর কলকাতায়। দাদুর ঢাকের সঙ্গে কাঁসি বাজায় সে। বড় হয়ে ঢাকি হবে, এই তার সাধ। কলকাতায় আসার আগে ছেলেটা বন্ধুদের বলেছে, সে পাতালরেলে চড়বে, বড় বড় হোটেলে পোলাও-কালিয়া খাবে। শেষে কোনও সাধই পূরণ হয় না। গ্রামের ছেলে ফিরে আসে গ্রামে।
হঠাৎ সামনে লাঠি হাতে পাজামা-পাঞ্জাবি পরা ভদ্রবেশী এক বৃদ্ধ। হাতে একটা লজেন্সের জার। তিন্নিকে বলেন, “দুটো লজেন্স কিনে সাহায্য করবে দিদিভাই? বুড়োবুড়িকে দেখার কেউ নেই।”
পার্স খালি করে বৃদ্ধের হাত ভরিয়ে দিয়েছিল তিন্নি। তার পরেই পাশের গলিতে ঢুকে অঝোর কান্না।
সঞ্জয় আজও বুঝতে পারে না, রক্তমাংসের তিন্নি না তিন্নির মন, কোনটাকে সে বেশি ভালবাসে।
দীপা কিন্তু খুব ভালবাসেন সঞ্জয়কে। বাড়ির ছোট জামাইটি তাঁরই মতো গানপাগল। কলকাতায় এলে ফ্রি-স্কুল স্ট্রিট, লেনিন সরণির দোকান চষে খুড়শাশুড়ির জন্য লং প্লেয়িং রেকর্ড কিনে আনবেই সঞ্জয়। ঠিক যেমন পুজোর আগে বম্বে (তখনও মুম্বই হয়নি) থেকে ফিরেই দীপার জন্য রেকর্ড কিনে আনতেন অনিলদা। সে বছরের পুজোর গানের রেকর্ড। অনিলদা দীপার দাদার বন্ধু। দীপাদের পুরো দলটাকে নিয়ে দাদা-অনিলদা বেরোতেন ঠাকুর দেখতে। এক বার মনে আছে, পুজোর নতুন জুতো পরে ফোস্কা পড়েছিল পায়ে। সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে দাদা-অনিলদা একটু এগিয়ে গেলেই দীপা আর তাঁর ছোট বোন নীলিমা সঙ্গে সঙ্গে জুতো খুলে হাতে নিয়ে খালি পায়ে হাঁটছিলেন। দেখতে পেয়ে দাদা ধমক দিতেই আবার হাতের জুতো পায়ে!
সেন্টার টেবিলে সকালের বাসি খবরের কাগজ। একটু আগে সেই কাগজেই দীপা পড়ছিলেন, সুন্দরবনের এক বাবা জঙ্গল থেকে মধু আনতে নৌকা ভাসানোর আগে মেয়েকে বলে গিয়েছিল, ফিরে এসেই কিনে দেবে পুজোর জামা। বাবাকে বাঘে নিল। কিন্তু পাঁচ বছরের মেয়ে আর নদীর ধার থেকে নড়ে না— “বাবা আসবে, জামা কিনতে যাব।”
মনটা ঘোরাতে দীপা রেকর্ডের আলমারি খুলে বসেছেন মেঝেয়। পরম যত্নে মুছছেন কালো চাকতিগুলো। চোখও মুছছেন। বাবার সঙ্গে পুজোর কোনও স্মৃতি নেই দীপার। বাবাকে যখন হারিয়েছেন, তাঁর বয়স তখন আড়াই।
হঠাৎ পিঠে দুটো ছোট্ট চাপড়। কখন পিছনে এসে দাঁড়িয়ে একগাল হাসছে অর্কর ছেলে রিয়ো। তাঁর একমাত্র নাতি। পুত্রবধূ উদিতা নতুন জামাপ্যান্ট পরিয়ে দিয়েছে রিয়োকে। পাড়ার ঠাকুরটা দেখতে বেরোচ্ছে ওরা। ঠাকুর দেখতে উদিতা খুব ভালবাসে। বিলাসের মতোই।
“মা তোমরা তা হলে প্যান্ডেলে গিয়ে...” বলতে বলতে ঘর থেকে বেরিয়ে থমকে যায় উদিতা। ততক্ষণে অর্কও তৈরি।
“রেডি হওনি মা?”
“না রে, কাল যাব। আজ তোরা ঘুরে আয়।”
উদিতার মুখের দিকে তাকায় অর্ক। উদিতা বলে, “বাবা আর রিয়োকে নিয়ে তুমি ঘুরে এসো। আমি একটু মায়ের কাছে থাকি।”
ওরা বেরোয়। অর্কর কোলে রিয়ো, বিলাসের এক হাতে লাঠি, অন্য হাত ছেলের কাঁধে। চার পাশে এত মানুষ, এত আলো, এত আনন্দ। তবু কেন যে এত কান্না পাচ্ছে, অর্ক বুঝতে পারে না।