Save শিলিগুড়ি, জলপাইগুড়ি as your preferred edition?
Unsave শিলিগুড়ি, জলপাইগুড়ি as your preferred edition?
শিলিগুড়ি, জলপাইগুড়ি
  • Change Page
  • Change Date
  • Change Edition
  • Back to Online Edition

Anandabazar e-paper 18th Oct 2026

  • Change Edition
  • Change Date
  • Change Page
Choose Edition
  • কলকাতা
  • বর্ধমান
  • আসানসোল দুর্গাপুর
  • পুরুলিয়া বাঁকুড়া
  • বীরভূম
  • নদিয়া
  • মুর্শিদাবাদ
  • উত্তর, দক্ষিণ ২৪ পরগনা
  • হাওড়া, হুগলি
  • শিলিগুড়ি, জলপাইগুড়ি
  • উত্তরবঙ্গের উত্তরে
  • পশ্চিম মেদিনীপুর-ঝাড়গ্রাম
  • পূর্ব মেদিনীপুর
  • উত্তরবঙ্গের দক্ষিণে
Choose Page
  • page-1.html
    Page 1
  • page-2.html
    Page 2
  • page-3.html
    Page 3
  • page-4.html
    Page 4
  • page-5.html
    Page 5
  • page-6.html
    Page 6
  • page-7.html
    Page 7
  • page-8.html
    Page 8
  • page-9.html
    Page 9
  • page-10.html
    Page 10
  • page-11.html
    Page 11
  • page-12.html
    Page 12
  • page-13.html
    Page 13
  • page-14.html
    Page 14
  • page-15.html
    Page 15
  • page-16.html
    Page 16
  • page-17.html
    Page 17
  • page-18.html
    Page 18
  • page-19.html
    Page 19
  • page-20.html
    Page 20
  • page-21.html
    Page 21
  • page-22.html
    Page 22
  • page-23.html
    Page 23
  • page-24.html
    Page 24
Change Date
Select a date
  • Confirm
  • প্রথম পাতা
  • অবকাশ
  • রাজ্য
  • সম্পাদকের পাতা
  • রাজ্য/দেশ
  • দেশ/বিদেশ
  • দেশ/বিদেশ/ব্যবসা
  • শিলিগুড়ি/জলপাইগুড়ি
  • উত্তরবঙ্গ
  • খেলা
  • ইত্যাদি
  • রবিবাসরীয়
  • প্রথম পাতা
  • অবকাশ
  • রাজ্য
  • সম্পাদকের পাতা
  • রাজ্য/দেশ
  • দেশ/বিদেশ
  • দেশ/বিদেশ/ব্যবসা
শিলিগুড়ি/জলপাইগুড়ি উত্তরবঙ্গ খেলা ইত্যাদি রবিবাসরীয়
Back To
সম্পূর্ণ পাতা
শিলিগুড়ি, জলপাইগুড়ি Page 24
Sunday, 18 Oct, 2026

Share Article

facebook
X
Whatsapp

মাফিয়া সমাচার

সুপ্রিয় চৌধুরী

একই সঙ্গে নিউ ইয়র্ক, বিশেষত, আমেরিকা জোড়া ইটালিয়ান, আইরিশ, ইহুদি সিন্ডিকেটে যুক্ত হল এই ত্রয়ীর নামটাও। মায়ার ল্যানস্কি, বেঞ্জামিন ‘বাগসি’ সেগাল আর অবশ্যই চার্লি ‘লাকি’ লুসিয়ানো।

এদের মধ্যে জো ‘দ্য বস’ মাসেরিয়া-র গ্যাংয়ে আন্ডারবস হিসেবে কাজ শুরু করল লুসিয়ানো। কিন্তু দু’জনের চরিত্র আর কর্মপদ্ধতিতে ছিল আকাশ-পাতাল তফাত। লুসিয়ানো বেপরোয়া, চটজলদি সাফল্যে বিশ্বাসী, ইটালীয় বা অ-ইটালীয় সব গোষ্ঠীর সঙ্গেই সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলতে আগ্রহী, একই সঙ্গে দলের সবাই যাতে
তাদের ন্যায্য প্রাপ্য পায়, সে বিষয়ে সর্বদা সচেতন।

অন্য দিকে মাসেরিয়া। স্থিরমস্তিষ্ক, ধৈর্যশীল, অতীব কূটবুদ্ধিসম্পন্ন এবং সীমাহীন লোভী, সর্বদা অন্যদের ভাগ কেড়ে নিজের পকেট ভরার নীতিতে বিশ্বাসী, আবার অ-ইটালীয় গোষ্ঠীগুলির সঙ্গে সম্পর্ক রাখার ক্ষেত্রে চূড়ান্ত অনিচ্ছুক। আমেরিকার অন্ধকার জগতে লুসিয়ানোদের মতো উঠতি ছেলেপুলেরা মাসেরিয়ার মতো প্রবীণ ও রক্ষণশীল ডনদের আড়ালে ডাকত ‘ওল্ড মুস্ট্যাশ পিট’, অর্থাৎ গুঁফো বুড়ো বলে।

লুসিয়ানোর সাহস, দাপট, গ্যাং-এ প্রবল জনপ্রিয়তা, ঝড়ের গতিতে অন্ধকার জগতে উত্থান, এ-সবই রীতিমতো চিন্তায় ফেলে দেয় মাসেরিয়াকে। অবিলম্বে লুসিয়ানো নামক পথের কাঁটাকে উপড়ে ফেলতে গোপনে সচেষ্ট হয় সে।

এ-সবের মাঝখানে এক দিন শীতকালের এক সন্ধেয় নিউ ইয়র্কের সাউথ অ্যাভিনিউ মোড়ে দাঁড়িয়ে ছিল লুসিয়ানো। হঠাৎই সামনে এসে ব্রেক কষে একটা কালো লিমুজ়িন। গাড়ি থেকে লাফ দিয়ে নামে সশস্ত্র তিন চার জন। আগ্নেয়াস্ত্র ঠেকিয়ে জোরজবরদস্তি গাড়িতে তুলে নেয় লুসিয়ানোকে। মুখে সেলোটেপ সেঁটে গাড়ির মধ্যেই চলে বেধড়ক মার আর ছুরিকাঘাত। অবশেষে ঘণ্টাখানেক বাদে রক্তাক্ত, অজ্ঞান অবস্থায় কিলোমিটার পাঁচেক দূরে এক নির্জন সমুদ্রসৈকতে লুসিয়ানোকে ফেলে রেখে চলে যায় দুষ্কৃতীরা। কিছুক্ষণ বাদে জ্ঞান ফিরে পেয়ে প্রায় মরণাপন্ন অবস্থায় ধুঁকতে ধুঁকতে নিকটবর্তী পুলিশ স্টেশনে গিয়ে উপস্থিত হয় লুসিয়ানো। সেখানে হাজারো জেরার মুখেও আততায়ীদের সম্পর্কে একটি শব্দও বেরোয়নি তার মুখ দিয়ে। ফলে এক প্রকার বাধ্য হয়েই তাকে হাসপাতালে পাঠায় পুলিশ।

হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েই লুসিয়ানো দ্বারস্থ হয় তার অভিন্নহৃদয় বন্ধু মায়ার ল্যানস্কির। খোঁজ নিতে বলে, কার বা কাদের হাত রয়েছে এই ঘটনার পিছনে। অবিলম্বে সক্রিয় হয় ল্যানস্কি। দু’-চার দিনের মধ্যেই এক বিশ্বস্ত সূত্র মারফত খবর আসে, এই হামলার পিছনে হাত রয়েছে মাসেরিয়ার। কাণ্ডটা ঘটিয়েছে ওর ভাড়াটে গুন্ডারাই।

খবর পাওয়ামাত্র স্যালি মারানজানোর সঙ্গে যোগাযোগ করে ল্যানস্কি। পুরো নাম সালভাতোর মারানজানো। নিউ ইয়র্ক শহরের আর এক দুঁদে ইটালিয়ান মাফিয়া ডন। মাসেরিয়ার সঙ্গে যার সম্পর্ক সাপে-নেউলে। এলাকা আর ধান্দার দখল নিয়ে হামেশাই গ্যাং ওয়ার লেগে থাকতো দু’দলের মধ্যে। এহেন মারানজানোর সঙ্গে মিলে নিখুঁত এক ‘অপারেশন মাসেরিয়া’ প্ল্যান আঁটে ল্যানস্কি আর লুসিয়ানো। সঙ্গে যোগ দেয় ‘বাগসি’ সেগাল। মাসেরিয়ার লোভ আর হাতটান নিয়ে বেশ ক্ষোভ ছিল দলের মধ্যে। এক সঙ্গে কাজ করার কারণে তথ্যটা জানা ছিল লুসিয়ানোর। স্থির হল, এই সুযোগটাকেই কাজে লাগাতে হবে। মাসেরিয়ার সর্বক্ষণের দুই দেহরক্ষীকে উৎকোচের বিনিময়ে বশ করবে মারানজানো। বাকি দায়িত্ব বাগসি, ল্যানস্কি আর লুসিয়ানোর। মারানজানোর কাছেও এ প্রস্তাব ছিল অত্যন্ত আকর্ষণীয়। লোকক্ষয় নেই, শক্তিক্ষয় নেই, নেই পুলিশের নজরে পড়ার সম্ভাবনা। শুধুমাত্র অর্থ বিনিয়োগ, আর তাতেই কেল্লা ফতে। বরাবরের দুশমনকে জাহান্নামে পাঠানোর ব্যবস্থা একদম পাকা।

এর সপ্তাহখানেক পর, কনি আইল্যান্ডের এক রেস্তরাঁয় বসে গোগ্রাসে চিজ় স্প্যাগেটি খাচ্ছিল চিরকেলে পেটুক মাসেরিয়া। পাশে রাখা জাগ থেকে ঢেলে গ্লাসের পর গ্লাস ওয়াইন গিলছিল ঘোঁতঘোঁত করে। খেয়ালই করেনি, কখন যেন চুপিসাড়ে পাশ থেকে সরে গেছে দেহরক্ষী ছেলেদুটো। এর মিনিটকয়েক বাদে রেস্তরাঁর দরজা ঠেলে ঢুকল ‘বাগসি’ সেগল, মায়ার ল্যানস্কি আর চার্লি লুসিয়ানো। তিন জনের হাতেই খোলা লুগার অটোম্যাটিক। পরমুহূর্তেই বুলেটে বুলেটে ঝাঁঝরা হয়ে রেস্তরাঁর মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল মাসেরিয়ার নিষ্প্রাণ দেহটা!

মাসেরিয়ার মৃত্যুর পর গোটা নিউ ইয়র্ক আন্ডারওয়ার্ল্ডের দখল নিতে সচেষ্ট হল মারানজানো। শহরের আরও পাঁচটা প্রথম সারির মাফিয়া গোষ্ঠী— যথাক্রমে জেনেভিস, গ্যাম্বিনো, বোনানো, কলোম্বো আর লুচেসি পরিবারকে নিয়ে গড়ে
তুলল বিশাল এক ‘ক্রাইম সিন্ডিকেট’। সিন্ডিকেটের মধ্যমণি, স্বঘোষিত ‘বস অব দ্য বসেস’ সালভাতোর মারানজানো।

ও দিকে মাসেরিয়ার মৃত্যুর পর পুরো গ্যাংয়ের নিয়ন্ত্রণ চলে এসেছিল লুসিয়ানোর হাতে। লুসিয়ানোকেও তার সিন্ডিকেটের অন্তর্ভুক্ত করতে প্রবল ভাবে সচেষ্ট হয় মারানজানো। কিন্তু সে প্রস্তাব ফিরিয়ে দেয় লুসিয়ানো। স্বাধীন ভাবে কাজ করাই তার পছন্দ, সেটা স্পষ্ট জানিয়ে দেয় মারানজানোকে।

লুসিয়ানোর এই প্রত্যাখ্যান ভাল ভাবে নেয়নি মারানজানো। তার লক্ষ্য শুধু নিউ ইয়র্কের নিয়ন্ত্রণই নয়, সমগ্র আমেরিকার অপরাধজগতের একচ্ছত্র সম্রাটের আসনে নিজেকে অধিষ্ঠিত করা। সেই লক্ষ্যে তার পথের কাঁটা দু’জন। শিকাগোর আল কাপোন, আর নিউ ইয়র্কের চার্লি লুসিয়ানো। সেই কাঁটা দূর করতে সুকৌশলে কাপোন আর লুসিয়ানোকে নিজের ডেরায় আলোচনার জন্য আমন্ত্রণ জানায় মারানজানো। আর তলায় তলায় প্রস্তুত রাখে ‘ম্যাড ডগ’ কোল নামে কুখ্যাত এক আইরিশ ভাড়াটে খুনিকে। কিন্তু এই চক্রান্তের খবর আগেই পৌঁছে যায় লুসিয়ানোর চিরবিশ্বস্ত সঙ্গী মায়ার ল্যানস্কির কাছে। কোল ঘটনাস্থলে পৌঁছনোর আগেই এফবিআই এজেন্টের ছদ্মবেশে সেখানে পৌঁছে যায় ল্যানস্কির পাঠানো চার পেশাদার ঘাতক, এবং নির্মম ভাবে হত্যা করে মারানজানোকে।

জো মাসেরিয়াকে হত্যার মধ্যে দিয়ে শুরু হয়েছিল মার্কিন দেশের অপরাধ-ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর গোষ্ঠী-যুদ্ধ, যা ‘ক্যাস্টেলামেয়ার ওয়ার’ নামে বিখ্যাত অথবা কুখ্যাত হয়ে আছে আজও। আমেরিকার প্রায় প্রতিটি মাফিয়া পরিবার কোনও না কোনও পক্ষ নিয়ে এই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল। সীমাহীন হিংসা আর রক্তপাতে সিক্ত, দীর্ণ এ সংঘর্ষের সমাপ্তি ঘটে সালভাতোর মারানজানোর হত্যার মধ্যে দিয়ে। অত্যন্ত আশ্চর্যজনক ভাবে মারানজানো-হত্যার বদলা নিতে প্রত্যাঘাতে নামেনি নিউ ইয়র্কের বাকি পরিবারগুলো। কারণ একতরফা ভাবে মারানজানোর নিজেকে ‘বস অব দ্য বসেস’ ঘোষণা করে দেওয়াটা একদমই মেনে নিতে পারেনি তারা। তাদের এই গোপন ক্ষোভের আঁচটা ভালই জানা ছিল লুসিয়ানোর।

মারানজানো হত্যার পর নিউ ইয়র্ক আন্ডারওয়ার্ল্ডে খুব দ্রুত মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত হয় লুসিয়ানোর নামটা। মাসেরিয়ার পাঠানো অপহরণকারীদের নির্মম প্রহার আর উপর্যুপরি ছুরিকাঘাতের পরও অলৌকিক ভাবে বেঁচে গিয়েছিল সে। এক চুলের জন্য মারানজানোর পেশাদার ঘাতকের বুলেট ছুঁতে পারেনি তাকে। ক্যাসিনো আর রেসের মাঠেও তার জুয়া-ভাগ্য ছিল অসামান্য। এই সব মিলিয়ে নামের মাঝখানে বসে যায় ‘লাকি’, এই পদবিটা। অন্ধকারজগতের আকাশে নতুন উদীয়মান সূর্য। চার্লি ‘লাকি’ লুসিয়ানো!

ড্রাগ, বুটলেগিং (মদের চোরাচালান) আর জুয়ার ধান্দার বাইরেও লুসিয়ানোর সবচেয়ে পছন্দের এলাকা ছিল নারীমাংসের কারবার। একই সঙ্গে নিজেও চরম বেশ্যাসক্ত ছিল সে। ফলে এক বার সিফিলিস ও বার ছয়েক গনোরিয়ার মতো যৌনব্যাধিতে আক্রান্ত হয়
এই বাহুবলী।

অন্ধকারজগতে আধিপত্য ও দাপট, দুটোই বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিউ ইয়র্ক শহরের সিংহভাগ বেশ্যালয়ের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নিতে সচেষ্ট হয় লুসিয়ানো। লালবাতি-পাড়ার যে সব মালকিন তার কর্তৃত্ব মেনে নিতে চায়নি, অনতিবিলম্বে তাদের জায়গা হল হাসপাতালের বিছানায়, অথবা কবরে। যারা মেনে নিল, তাদের জীবন হয়ে গেল ক্রীতদাসীরও অধম।

লুসিয়ানোর আধিপত্যের এই বজ্রকঠিন দেওয়ালে প্রথম হাতুড়ির ঘা পড়ল টমাস ডুয়ি নামে আদ্যন্ত সৎ এক স্পেশাল প্রসিকিউটর আর তার অধীনস্থ গোটা কুড়ি আধিকারিকের একটি তদন্তকারী দলের হাত ধরে। লুসিয়ানো-নিয়ন্ত্রিত একের পর এক লালবাতি-মহল্লায় হানা দিয়ে বহু মালকিন, দালাল, গুন্ডা আর যৌনকর্মীকে নিজেদের হেফাজতে নিল তারা। তাদের জেরা করে পাওয়া গেল বহু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, উদ্ধার হল একাধিক গোপন নথি। এর উপর ভিত্তি করে লুসিয়ানোর বিরুদ্ধে এমন মজবুত মামলা সাজালেন ডুয়ি সাহেব, যার ফাঁস কেটে বেরোনো সম্ভব হল না প্রবল ক্ষমতাশালী মাফিয়া ডনের পক্ষেও। যদিও নিজেকে নির্দোষ প্রমাণের বহু চেষ্টা করেছিল লুসিয়ানো, কিন্তু লাভ হয়নি কোনও। শেষ শুনানি আর রায়দানের মাঝখানেই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল ললাটলিখন। চার্লি ‘লাকি’ লুসিয়ানো ইজ় নট দ্যাট লাকি এনি মোর। বিচারের রায়ে নিদেনপক্ষে তিরিশ বছর সাজা এক প্রকার নিশ্চিত দুঁদে এই মবস্টারের।

সাজা ঘোষণার পর আমেরিকার অন্যতম কুখ্যাত জেল ডানেমোরায় ঠাঁই হয় লুসিয়ানোর। সেখানে সাত ফুট বাই সাত ফুট স্যাঁতসেতে, চরম অস্বাস্থ্যকর এক নির্জন, প্রায়ান্ধকার সেলে দিনের মধ্যে ১৬ থেকে ১৮ ঘণ্টা আটকে থাকতে হত তাকে। নারকীয় এই দুর্ভোগ-পর্বটা চার্লির জীবনে চলেছিল বছর ছয়েক। যতক্ষণ না তার অভিন্নহৃদয় বন্ধু মায়ার ল্যানস্কি বিপুল পরিমাণ উৎকোচের বিনিময়ে কারা-কর্তৃপক্ষকে বশ করে তার পরিবার আর অন্ধকারজগতের ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের সঙ্গে নিয়মিত গোপন সাক্ষাৎকারের ব্যবস্থা করে দেয়। এর ফলে বহির্জগতের সঙ্গে আবার যোগাযোগ স্থাপিত হয় চার্লির, যা এক মৃতসঞ্জীবনী সুধার মতো কাজ করে তার জীবনে।

ল্যানস্কির আর একটা অমোঘ চাল ফের আশার আলো দেখায় চার্লিকে। সালটা ১৯৪২। পৃথিবী জুড়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দাপাদাপি। মিত্রপক্ষের অন্যতম শরিক আমেরিকা। আর বিরুদ্ধপক্ষ, মানে অক্ষশক্তির জার্মান সর্বাধিনায়ক হিটলারের প্রধান সহযোগী ইটালির ফ্যাসিস্ট শাসক বেনিটো মুসোলিনি।

এমতাবস্থায় মার্কিন প্রশাসনের কিছু শীর্ষকর্তার কাছে এক অভিনব প্রস্তাব রাখে ল্যানস্কি। সিসিলি আর নেপলস, এই দুই দ্বীপপুঞ্জে ইটালীয় এবং জার্মান বাহিনীর সমস্ত গতিবিধির খবর ওখানকার স্থানীয় মাফিয়া ডনদের মাধ্যমে মার্কিন নৌবাহিনীর গোয়েন্দা দফতরকে জানাবে লুসিয়ানো। কারণ সিসিলি আর নেপলসের ভূমিপুত্র ওই সব ডনদের মধ্যে চার্লির প্রভাব প্রশ্নাতীত। বিনিময়ে চার্লিকে স্থানান্তরিত করতে হবে তুলনামূলক ভাবে অনেক বেশি বাসযোগ্য আর নিরাপদ কোনও জেলে।

ল্যানস্কির প্রস্তাবটা মনে ধরল আমেরিকান কর্তাদের। যার নিট ফল, ১৯৪২ সালের মে মাসে নিউ ইয়র্কের কমস্টকে গ্রেট মিডো জেলখানায় এক স্পেশাল সেলে বদলি করে আনা হল চার্লিকে। সমস্ত আধুনিক সুযোগসুবিধাযুক্ত এই সেলকে রাতারাতি পরিণত করা হল চার্লির ব্যক্তিগত ওয়ারলেস ট্রান্সমিশন সেন্টারে। গ্রেট মিডোর ওই বিশেষ সেলে বসেই সে নিয়মিত যোগাযোগ রাখত সিসিলি আর নেপলসের তাবড় ডনদের সঙ্গে। এই গোপন সূত্রে পাওয়া মূল্যবান আর একান্ত গোপন সব তথ্য পরমুহূর্তেই পৌঁছে যেত আমেরিকান নৌবাহিনীর গোয়েন্দা কর্তাদের টেবিলে। মুসোলিনির ‘লৌহমুষ্টি’ শাসনের জাঁতাকলে পড়ে ওই দুই দ্বীপপুঞ্জে স্থানীয় মাফিয়া ও কামোরা পরিবারগুলোর কী হাঁড়ির হাল হয়েছিল, সে বৃত্তান্ত বিশদে লিখেছি এ প্রতিবেদনের প্রথমেই। ফলে মুসোলিনিকে উৎখাত করতে তারাও খুব স্বাভাবিক ভাবেই সব রকম সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল তাদের দেশোয়ালি ভাইয়ের দিকে। চার্লি ‘লাকি’ লুসিয়ানো প্রুভড হিমসেল্ফ লাকি ওয়ান্স আগেন!

অতঃপর ১৯৪৬ সাল। যুদ্ধ শেষ। পরাজিত অক্ষশক্তি। গণরোষে নিহত ফ্যাসিস্ট স্বৈরশাসক বেনিটো মুসোলিনি। তাকে তার জন্মভূমিতে ফিরে যেতে দেওয়া হোক, সেখানেই সে তার শেষ জীবনটা কাটাতে চায়— চার্লির এহেন আবেদনে সাড়া দিল আমেরিকান প্রশাসন।

অবশেষে ১৯৪৬ সালের ১০ মে। যুদ্ধে মার্কিন প্রশাসনকে সাহায্যের পুরস্কার মিলল। গ্রীষ্মের এক রোদ-ঝলমলে সকালে ‘লাকি’ লুসিয়ানোকে নিয়ে নিউ ইয়র্কের বন্দর ছেড়ে ইটালির উদ্দেশে রওনা দিল এস এস লরা কিন নামে জাহাজ।

স্বদেশে ফেরার পর লুসিয়ানোর উপর একাধিক নিষেধাজ্ঞা চাপায় নতুন ইটালীয় সরকার। যার মধ্যে অন্যতম দু’টি শর্ত— বাসস্থান থেকে পাঁচ কিলোমিটারের বেশি দূরত্বে কখনও যেতে পারবে না সে। ফের যুক্ত হতে পারবে না কোনও ধরনের অপরাধের সঙ্গে। প্রথম নির্দেশটি আমৃত্যু মেনে চলেছিল লুসিয়ানো। সিসিলির প্রাসাদোপম ভিলায় নিজের পরিবার আর প্রাণাধিক প্রিয় পোষ্য বোস্টন টেরিয়ার সারমেয় দু’টির সঙ্গে অধিকাংশ সময় কাটত তার। দ্বিতীয় নির্দেশটি কোনও দিনই মেনে চলেনি সে। ইটালিতে বসেই ফোনের মাধ্যমে সুদূর আমেরিকায় তার অপরাধ সাম্রাজ্য পরিচালনা করে গিয়েছিল নিয়মিত।

১৯৬২ সাল। ফের একবার মার্কিন মুলুকে ফিরেছিল চার্লি ‘লাকি’ লুসিয়ানো। তবে কফিনবন্দি হয়ে। নিজের বাড়ির ড্রয়িংরুমে তার আত্মজীবনীকার এক লেখকের সঙ্গে বইয়ের বিষয়ে আলোচনা করার সময় আচমকাই তীব্র হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে তৎক্ষণাৎ মৃত্যু হয় আমেরিকান আন্ডারওয়ার্ল্ডের এই বেতাজ বাদশার। তার শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী বিশেষ বিমানে উড়িয়ে এনে নিউ ইয়র্ক শহরের সেন্ট জন কবরখানায় রাজকীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয় ‘লাকি’ লুসিয়ানোকে।

ইহুদি শাসন, হাঙর দ্বীপ ও
লা-ভেগা স্বপ্ন

১৯ শতকের পোল্যান্ড। দেশে জারতন্ত্রের শাসন। চরম জাতিবিদ্বেষী সে শাসনে পোলিশ ইহুদি নাগরিকদের জীবন একেবারে দুর্বিষহ। সমগ্র ইউরোপেই ইহুদিরা মূলত ব্যবসার উপর নির্ভরশীল। পোল্যান্ডও তার ব্যতিক্রম নয়। আর সেই ব্যবসার উপরই সেখানকার জার শাসকরা চাপিয়ে দিয়েছিল মাত্রাছাড়া করের বোঝা আর অজস্র বিধিনিষেধ। একসময় অবস্থা এতটাই অসহনীয় পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছিল যে, স্থানীয় ইহুদি সম্প্রদায়ের মধ্যে অনেকেই ভাবতে শুরু করেছিল, অনেক হয়েছে, এবার এদেশ ছেড়ে অন্যত্র পাড়ি দেওয়া দরকার। যাদের মধ্যে অন্যতম, আমাদের এই পর্বের মূল চরিত্র মায়ার ল্যান্সকির বাবা, ম্যাক্স জানস্কি। ১৯১০ সালে তথাকথিত উজ্জ্বল ভবিষ্যতের সন্ধানে স্ত্রী ও তিন শিশু সন্তানকে স্বদেশে রেখে আমেরিকায় পাড়ি দেয় ম্যাক্স। আর এর ঠিক দু’বছর পর স্ত্রী-সন্তানদেরও নিয়ে আসে সেখানে। জ্যেষ্ঠ পুত্র মায়ারের বয়েস তখন মাত্র দশ।

উদ্বাস্তু ইটালিয়ানদের চোখ থেকে আমেরিকা নামক স্বপ্নের ঘোর কেটে গেছিল অচিরেই। ওই একই হাল হল অভিবাসী ইহুদিদেরও। কোনও মতে এ দেশে এসে পড়লেই যে দুধ-ঘিয়ের সাগরে সাঁতার কাটা যায় না, পেটের ভাত আর এক একটি পেনি জোগাড় করার জন্য নিয়মিত চোয়াল চেপে নাছোড় লড়াই চালাতে হয় নিত্যদিন, এ বোধোদয় হতে বেশি দিন লাগেনি ম্যাক্স ও তার পরিবারের।

প্রতিদিন উদয়াস্ত দারিদ্রের সঙ্গে এই কঠোর সংগ্রাম ক্রমাগত হতাশ করে তুলছিল মায়ারকে। স্কুলে আসা-যাওয়ার পথে পাড়ার মোড়ে মোড়ে জুয়ার আড্ডাগুলো চোখে পড়ত তার। অনতিবিলম্বে ওই সব আড্ডায় নিয়মিত আনাগোনা শুরু হয় তার। পুঁজি বলতে টিফিনের জন্য বাড়ির দেওয়া কষ্টার্জিত দু’-এক পেনি মাত্র। একটা বিষয়ে নিজের ক্ষমতা দেখে নিজেই বিস্মিত হয়ে যায় মায়ার। জুয়ার টেবিলে তার স্বাভাবিক এবং অলৌকিক দক্ষতা। খুব সহজে চটজলদি রোজগারের একটা রাস্তা খুলে যায় এই ইহুদি কিশোরের সামনে। কিছু দিনের মধ্যেই নিজে একটা জুয়ার ঠেক খোলে সে।

তবে এই রোজগারের পথটা কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। এলাকার ডাকাবুকো এক ইটালিয়ান কিশোর। নাম চার্লি লুসিয়ানো। সমবয়সি বেশ কিছু ছেলেছোকরার একটা দলের সর্দার। পথে লুসিয়ানোকে দু’-এক পেনি তোলা না দিয়ে স্কুলে যাওয়ার সাহস বা ক্ষমতা ছিল না ইহুদি পড়ুয়াদের। এছাড়াও ওই সব জুয়ার ঠেকগুলোতেও ‘প্রোটেকশন মানি’ আদায়ের জন্য নিয়মিত হানা দিত চার্লি লুসিয়ানো ও তার দলবল। লুসিয়ানোর জীবনে এই প্রথমবার তাকে তোলা দিতে অস্বীকার করল মায়ার ল্যানস্কি। ঘটনার অভিঘাতে প্রাথমিক ভাবে বিস্ময়স্তব্ধ হয়ে গেল লুসিয়ানো! তার পর তাদের ধুন্ধুমার মারামারি এবং শেষ অবধি চরম শত্রুতা থেকে চিরস্থায়ী বন্ধুত্ব শুরু হওয়ার কাহিনি আগেও বলেছি।

স্কুলে লেখাপড়ায় মোটামুটি ভালই ছিল মায়ার। তবুও ক্লাস নাইনে ওঠার পর মাত্র ১৫ বছর বয়সে দুম করে স্কুল ছেড়ে দিল একদিন। ছেলে বেয়াড়া পথে চলে যাচ্ছে বুঝতে পেরে আশঙ্কিত হল মায়ারের পরিবার। স্থানীয় এক গাড়ির কারখানার মালিককে ধরে তার ছেলেকে সেখানে শিক্ষানবিশির কাজে লাগিয়ে দিল মায়ারের বাবা ম্যাক্স। মনে আশা, ছেলে বড় হয়ে একদিন ভাল কারিগর হবে। কিন্তু সে কাজে আদৌ মন টিকল না মায়ারের। কারখানায় এক সপ্তাহে যা মাইনে পাবে, তার দ্বিগুণ সে এক রাতে জুয়ার ঠেক থেকে কামিয়ে নিতে পারে অনায়াসে। ফলে কারখানার চাকরিকে রাতারাতি বিদায় জানিয়ে ফের অন্ধকার জগতের আলো-আঁধারি গলিগুলোয় ঘোরাফেরা শুরু করল মায়ার। জুয়ার ধান্দার পাশাপাশি ড্রাগ পেডলিং, বেশ্যাবাড়ির দালাল-কাম-গুন্ডা, সব ধরনের কালো কারবারেই নিজস্ব বৈশিষ্ট্যের সাক্ষর রাখতে শুরু করল সে। এই সময় স্থানীয় এক লালবাতি এলাকায় একটা খুনের মামলায় জেলে যেতে হয় মায়ারকে। যদিও কিছুই প্রমাণ হয়নি শেষ পর্যন্ত। কিন্তু খুনের অভিযোগ আর কারাবাস— এই দুই মিলিয়ে নিউ ইয়র্ক আন্ডারওয়ার্ল্ডে মায়ারের সম্মান গেল বেড়ে।

ছেলেবেলা থেকেই একটা ব্যাপার খুব ভাল করে খেয়াল করেছিল মায়ার। এলাকার ইয়াঙ্কি, আইরিশ বা ইটালিয়ান ছোকরাদের দলগুলোর হাতে রাস্তাঘাটে ইহুদি ছেলেপুলেরা মার খায় একটাই কারণে। তারা সঙ্ঘবদ্ধ নয়। ফলে এলাকায় পায়ের মাটি মজবুত করার পাশাপাশি আর একটা বিষয়ে সবিশেষ মনোযোগ দিল মায়ার। এলাকার ইহুদি ছেলেদের নিয়ে একটা ‘প্রোটেকশন সিন্ডিকেট’ গড়ে তোলা। এ রাস্তায় সে পাশে পেয়ে গেল তার ছোট ভাই জেক, মাইক ওয়েসেল, রেড লেভিন, তাবো স্যান্ডলার, ডক স্ট্যাচার, সর্বোপরি বেঞ্জামিন বা বেনি ‘বাগসি’ সেগলকে। যে পরবর্তী কালে শুধুমাত্র বাগসি সেগল নামে মার্কিন মুলুকে আন্ধেরি দুনিয়ার এক মহাতারকা হয়ে উঠবে।

মায়ার আরও যেটা খেয়াল করেছিল, সেটা হল বড়সড় চেহারার বাগসির লাগামছাড়া দুঃসাহস ও অপরিসীম দৈহিক শক্তি। প্রায় বিনা প্ররোচনাতেই কোমর থেকে বন্দুক বার করে ফেলত বাগসি। যার সামনে কেন্নোর মতো গুটিয়ে যেত প্রতিপক্ষ। বিপরীতে মায়ারের বরফের মতো ঠান্ডা মাথা, উপস্থিত বুদ্ধি আর তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা। এই জোড়া ফলার মুখে দখল হয়ে যেতে শুরু করল একের পর এক টিনএজার জুয়ার ঠেকগুলো। বাগসি আর মায়ার, কারও বয়সই ষোলো ছাড়ায়নি তখনও।

মায়ারের বুদ্ধির উপর বাগসির ভরসা আরও বেড়ে গেল এক দিনের একটা ঘটনায়। একটা জুয়ার ঠেকের দখল নিতে ধুন্ধুমার স্ট্রিট ফাইট চলাকালীন তার চিরাচরিত স্বভাব অনুযায়ী পকেট থেকে আগ্নেয়াস্ত্র বার করে বিপক্ষের দিকে উঁচিয়ে ধরে বাগসি। আর ঠিক তখনই অদূরেই শোনা যায় টহলদার পুলিশ ভ্যানের সাইরেন। চূড়ান্ত উপস্থিত বুদ্ধির পরিচয় দিয়ে বাগসির হাত থেকে পিস্তলটা নিয়ে সবার অলক্ষে পাশেই একটা আবর্জনার ড্রামে ফেলে দেয় মায়ার। তার পর দলবল নিয়ে সরে পড়ে সেখান থেকে। পরে এক সময় এসে উদ্ধার করে নিয়ে যায় অস্ত্রটা।

জুয়ার ঠেকগুলোর দখল নেওয়ার পাশাপাশি সুদের কারবারি, দোকানদার, বড় বড় ক্যাসিনোর মালিক, রেস আর নাম্বার গেমের বুকিদের কাছ থেকেও নিয়মিত ‘প্রোটেকশন মানি’ আদায়ে মন দিল বাগসি আর মায়ার। ছেলের বেচাল দেখে তাকে গাড়ি কারখানায় অ্যাপ্রেন্টিসের চাকরিতে লাগিয়ে দিয়েছিল মায়ারের বাবা। ব্যাপারটা তার পছন্দ না হলেও কাজটা খুব মন দিয়ে শিখেছিল সে। সেই বিদ্যেই এবার কাজে লেগে গেল কালো ধান্দায়। তোলা আদায়ের সঙ্গে সঙ্গে গাড়ি চুরিও হয়ে উঠল মায়ার-বাগসি গ্যাংয়ের আয়ের অন্যতম পথ। কালে-দিনে সে কারবার এতটাই ফুলেফেঁপে উঠল যে, একটা বিশাল ওয়্যার হাউস খরিদ করতে হল তাদের। আন্ডারওয়ার্ল্ডে নাম হয়ে গেল ‘ট্রান্সপোর্টেশন এক্সপার্ট’ গ্যাং। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ওই গ্যারেজই হয়ে উঠেছিল মায়ার-বাগসি জুটির কালো ধান্দার সদর দফতর।

অন্ধকার জগতে উত্থানের পথে মায়ারের পরিচয় হয় এমন একজনের সঙ্গে, আমেরিকার বাহুবলী মহলে যার খ্যাতি ছিল ‘দ্য ব্রেন’ নামে।

‘দ্য ব্রেন’-এর আসল নাম আর্নল্ড রথস্টেইন। আক্ষরিক অর্থেই প্রখর বুদ্ধির অধিকারী এই ইহুদি বাহুবলীর কাজের মূল ক্ষেত্র ছিল ক্যাসিনো, রেসের মাঠ, চড়া সুদে টাকা খাটানো আর একাধিক অভিজাত বেশ্যালয়ের নিয়ন্ত্রণ। নিজের অধীনে বিশাল এক গুন্ডাবাহিনী আর রাজনৈতিক মহলের উঁচুতলায় ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ। অবাধ বিচরণ আইনের অলিন্দেও। ওঠাবসা তাবড় তাবড় সব আইনজীবী আর বিচারপতিদের সঙ্গে। এহেন রথস্টেইন সম্পর্কে একটি প্রবাদ প্রচলিত ছিল মার্কিন আন্ডারওয়ার্ল্ডে—‘আইনি বা প্রশাসনিক স্তরে কোনও সমস্যার সমাধান না হলে ‘ব্রেন’-এর কাছে যাও। কাজ হয়ে যাবে।’

১৯২০ সালে মার্কিন সরকার মদ্যপানের উপর নিষেধাজ্ঞা চাপালে আমেরিকার অন্যান্য মাফিয়া গোষ্ঠীপতিদের মতো রথস্টেইনও খুব ভাল করেই বুঝে গিয়েছিল, এতে আখেরে লাভ হবে তার মতো কালো ধান্দার কারবারিদেরই। কারণ এ রসের রসিকরা মদ্যপান বন্ধ করবে না কিছুতেই। ফলে চোরাপথে মদ ঢুকবে বাইরে থেকে। সে কাজ
তাদের মতো খলিফারা ছাড়া আর করবেটাই বা কে!

তবে অন্যদের চিন্তাভাবনার সঙ্গে মৌলিক স্তরে এই ইহুদি মব বসের একটা পার্থক্য ছিল। সে বুঝেছিল, মালটি যদি সরেস দেওয়া যায়, তা হলে খদ্দের টাকা দিতে পিছপা হবে না। দামটা সেখানে কোনও ব্যাপারই নয়। ফলে অন্যান্য মাফিয়া গোষ্ঠী যখন কানাডার সীমান্ত পেরিয়ে চোরাপথে মার্কিন মুলুকে সস্তা হুইস্কি ঢোকাতে ব্যস্ত, তখন রথস্টেইন স্কটল্যান্ড থেকে খাঁটি স্কচ আনানোর ধান্দায় মনোনিবেশ করে। এই কাজে দেশের উচ্চকোটির, বিশেষত প্রশাসনিক কর্তা, বিচারপতি আর আইনজীবীদের থেকে প্রচুর সহায়তা পায় সে। কারণ তারা সকলেই দুনিয়া সেরা এই মদিরার অনুরাগী ছিলেন।

পরবর্তী কালে তার এই চোরাই স্কচের ধান্দাকে আরও উন্নত স্তরে নিয়ে যায় রথস্টেইন। স্কটল্যান্ডের দু’-একটি নামী স্কচ-নির্মাতা সংস্থার বেশ কয়েক জন অভিজ্ঞ কর্মীকে মোটা পারিশ্রমিকের বিনিময়ে ভাঙিয়ে আনে সে। নিউ ইয়র্কের দু’টি গোপন ডেরায় গড়ে তোলে নিজস্ব বেআইনি স্কচ ডিস্টিলারি। বিশ্বের নামী নামী স্কচ কোম্পানিগুলোর নকল লেবেলও ছাপা হত সেখানে। শুরু হয়ে যায় গোটা নিউ ইয়র্ক জুড়ে ‘রথস্টেইন স্কচ’-এর ফলাও কারবার।

দূরদর্শী এই ইহুদি মব বস আর একটা ব্যাপার খুব ভাল বুঝেছিল। এই কারবার নিউ ইয়র্ক এবং নিউ ইয়র্কের বাইরে ছড়িয়ে দিতে গেলে তার তিন জনকে প্রয়োজন। নিউ ইয়র্কে লাকি লুসিয়ানো, মায়ার ল্যানস্কি আর শিকাগোয় আল কাপোন। এই তিন জনকে আলাদা ভাবে শহরের এক বিলাসবহুল পাঁচতারা হোটেলে আমন্ত্রণ জানিয়ে প্রত্যেকের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা সারে রথস্টেইন। স্থির হয়, ডিস্টিলারির যাবতীয় দায়ভার রথস্টেইনের। অন্য দিকে প্রোডাক্ট ডিস্ট্রিবিউশনের দায়িত্বে তিন জন। কাপোন, লুসিয়ানো আর ল্যানস্কি। গোটা মার্কিন মুলুক জুড়ে প্রায় প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা পেয়ে যায় এই ‘কার্টেল অব ফোর স্কচ কোম্পানি’।

ক্রমশ

পূর্বানুবৃত্তি: জনি তোরিওর অবসরের পর কার্টেলের একচ্ছত্র সম্রাট হয়ে ওঠে আল ‘স্কারফেস’ কাপোন। ১৯২৫-২৬ সালে নর্থ রিভারসাইড গ্যাংয়ের অন্তত ৫০ জন গ্যাংস্টার তার হাতে নিহত হয়। পরে আলোচনার মাধ্যমে শান্তিচুক্তি হলেও ব্রুনো স্পালুসির হত্যার পরও কাপোন প্রতিশোধ না নিয়ে অপেক্ষা করতে থাকে। ১৯২৭ সালের মে মাসে তদন্তের নির্দেশের পর সে মিয়ামিতে সদর দফতর সরিয়ে নেয়। এর পর ঘটে ‘ভ্যালেন্টাইন’স ডে ম্যাসাকার’। পরে দলের দুই বিশ্বাসঘাতক কাপো স্ক্যালেসি ও আলসিইমিকে হত্যা করে কাপোন। তার বিরুদ্ধে তদন্তে নামেন এলিয়ট নেস। দীর্ঘ সংগ্রামের পর ১৯৩১ সালের মে মাসে কর ফাঁকির দায়ে কাপোনের ১১ বছরের কারাদণ্ড হয়। ১৯৩৯ সালে মুক্তির পর ১৯৪৭ সালের ২৫ জানুয়ারি তার মৃত্যু হয়। অন্য দিকে, ‘বাগস’ মোরান ক্রমে শক্তি ও অর্থ হারিয়ে ছোটখাটো অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। ১৯৫৭ সালে কারাবাসকালে ফুসফুসের ক্যান্সারে তার মৃত্যু হয়। চার্লি ‘লাকি’ লুসিয়ানো ১৮৯৭ সালে সিসিলিতে জন্মায়। দারিদ্রের কারণে পরিবার আমেরিকায় এলে ছোটবেলা থেকেই সে অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। মায়ার ল্যানস্কি ও বেঞ্জামিন সেগালের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে, তারা ‘ফাইভ পয়েন্ট গ্যাং’ তৈরি করে।

সম্পূর্ণ পাতা