সম্পদ রক্ষায়
দীপঙ্কর ঘোষের “এই ‘ঐতিহ্য’ রক্ষা করবে কে” (১২-৯) প্রবন্ধ প্রসঙ্গে বলতে চাই, বাঁকুড়া জেলা অত্যন্ত ঐতিহ্যপূর্ণ ও সংস্কৃতিসমৃদ্ধ। বিশেষত বিষ্ণুপুরের ইতিহাস, স্থাপত্য, সঙ্গীত ও হস্তশিল্প এই জেলার গৌরব। অথচ দীর্ঘদিনের অবহেলায় এই ঐতিহ্য যেন ক্রমশ মলিন হয়ে পড়ছে। মল্ল রাজবংশের ইতিহাস, পোড়ামাটির মন্দির, রাসমঞ্চ, মদনমোহন মন্দির, জোড়বাংলা মন্দির— সবই বিষ্ণুপুরের অমূল্য সম্পদ। দলমাদল কামানও এই ইতিহাসের একটি উল্লেখযোগ্য নিদর্শন। মল্লরাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায় নির্মিত মন্দিরগুলির টেরাকোটা ফলকে পুরাণ, মহাকাব্য, ধর্মীয় আখ্যানের পাশাপাশি সমকালীন জনজীবনের নানা ছবি ফুটে উঠেছে। বিষ্ণুপুরের বালুচরি শাড়িতেও সেই ঐতিহ্য ও নকশার প্রভাব দেখা যায়। পাশাপাশি বিষ্ণুপুর ঘরানার শাস্ত্রীয় সঙ্গীতেরও রয়েছে নিজস্ব ঐতিহ্য ও আন্তর্জাতিক পরিচিতি। পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন দফতরও বিষ্ণুপুরের টেরাকোটা মন্দির, বালুচরি, সঙ্গীত ও হস্তশিল্পের ঐতিহাসিক গুরুত্বের কথা উল্লেখ করেছে।
ঐতিহ্যকে আন্তর্জাতিক পর্যটনের উপযোগী করে তুলতে আরও পরিকল্পিত উদ্যোগ প্রয়োজন। শুধু মন্দির সংরক্ষণ করলেই হবে না, পর্যটকদের যাতায়াতের সুবিধা, পরিচ্ছন্নতা, পানীয় জল, শৌচাগার, থাকার ব্যবস্থা এবং স্থানীয় পর্যায়ে উপযুক্ত পর্যটন-পরিকাঠামোও গড়ে তুলতে হবে। পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন দফতরের তথ্য অনুযায়ী বিষ্ণুপুর কলকাতার সঙ্গে সড়ক ও রেলপথে যুক্ত এবং সেখানে পর্যটন-পরিকাঠামো গড়ে উঠেছে; কিন্তু ঐতিহ্যবাহী স্থানগুলির মর্যাদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আরও উন্নত ও পরিকল্পিত ব্যবস্থা করার অবকাশ অবশ্যই রয়েছে।
সর্বোপরি, প্রশাসনের কাছে আবেদন, বাঁকুড়া জেলার বিষ্ণুপুর-সহ ঐতিহ্যবাহী শহর ও গ্রামগুলির সাংস্কৃতিক সম্পদকে সংরক্ষণের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হোক। শুধু নামমাত্র সংস্কার নয়, পুরনো স্থাপত্যের চরিত্র অক্ষুণ্ণ রেখে বিশেষজ্ঞের পরামর্শে সংরক্ষণের ব্যবস্থা প্রয়োজন। একই সঙ্গে এই ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত স্থানীয় কারিগর, তাঁতি, শিল্পী ও অন্যান্য মানুষের জীবিকাকেও সংরক্ষণ-পরিকল্পনার অংশ করা দরকার। ঐতিহ্য বাঁচলে তাঁদের দক্ষতাও বাঁচবে, তাঁদের আয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়বে।
গীতিকা কোলে
কলকাতা-৫২