‘স্বদেশি-আজ়াদি-জেন জ়ি’, পুজোয় এ বার বাম ত্রি-শূল
সন্দীপন চক্রবর্তী
বিরোধী এবং তরুণ প্রজন্মের আন্দোলনের নেপথ্যে ‘বিদেশি মদত’ দেখতে পাচ্ছেন দেশের শাসক বিজেপি নেতৃত্ব। রাজ্যে বিজেপির আমলে আলিমুদ্দিন স্ট্রিটে সিপিএমের রাজ্য দফতরের অদূরে চণ্ডীপাঠের আসর বসে যাচ্ছে! বামপন্থীরা বিদেশি মতাদর্শে চালিত এবং ‘দেশদ্রোহী’— এই আক্রমণ অনবরত করে চলেছেন বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে শুরু করে চুনো নেতারা। এমন আবহে এ বারের পুজোয় সিপিএমের আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এল অতীতের স্বদেশি নায়ক এবং বর্তমানের ‘জেন-জ়ি’ বা তরুণ প্রজন্মের কথা।
সিপিএমের রাজ্য কমিটির দুই সদস্যের সম্পাদনায় দলের দুই মুখপত্রের শারদ সংখ্যায় এ বার ‘নেতাজি’র ভূমিকা, ‘আজ়াদি’র তাৎপর্য এবং তরুণ প্রজন্মের গুরুত্ব বোঝানোয় প্রয়াস করা হয়েছে নানা রকম। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতাসীন হওয়ার পরে নানা অছিলায় সাধারণ ও গরিব মানুষের উপরে বেড়ে চলা আক্রমণের মোকাবিলায় প্রতিবাদের ময়দানও যে বড় করতে হবে, এই অবসরে স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে
সেই লক্ষ্যও।
সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম তাঁর কলমে পরিষ্কারই ডাক দিয়েছেন, ‘আন্দোলন, সংগ্রামে আরও বেশি মানুষকে, বিশেষত নতুন প্রজন্মকে আরও বেশি করে নিয়ে আসতে হবে। যত আঘাত আসুক, গণ-সমাবেশের পথেই প্রত্যাঘাতে তা ফিরিয়ে দিতে হবে। ...নয়া ফ্যাসিবাদ বিরোধী সব অংশকে শামিল
করতে হবে’।
প্রবীণ নেতা বিমান বসু লিখেছেন সুভাষচন্দ্র বসুর উপরে। ‘নেতাজি’ যে ‘সত্যিকারের দেশপ্রেমিক’, তার ব্যাখ্যা দিয়ে বিমান বলেছেন, ‘সমালোচনা শুধু সমালোচনার জন্য না করে, ঐতিহাসিক তথ্যের উপরে নির্ভর করেই করা উচিত। নতুবা তা নতুন প্রজন্মের সামনে বিড়ম্বনার সৃষ্টি করতে পারে’। আবার সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির তরুণ সদস্য মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায়ের মতে, ‘জেন-জ়ি, জেন-আলফাদের ভয়ে সরকারের হাঁটু কেঁপে উঠছে! তখনই তাদের গলায় ‘হোড়’ ঝোলাতে চাইছে, কোথাও ‘গুন্ডা-দমন’ বিলের নাম করে, কোথাও মিথ্যে মামলার ভয় দেখিয়ে, কোথাও আজ়াদি উচ্চারণের বিরুদ্ধে মিথ্যে দেশদ্রোহী তকমা লাগিয়ে, কোথাও সরাসরি আক্রমণ করে। তরুণদের কি এ ভাবে থামানো যাবে’? তরুণদের প্রতিবাদের স্পর্ধাকে ব্যাখ্যা করতেও মীনাক্ষীও সুভাষচন্দ্রের ‘তরুণের স্বপ্ন / দেশের ডাক’-এর দ্বারস্থ হয়েছেন।
সিপিএম নেতৃত্বের মতে, পরিস্থিতি পরিবর্তনের লড়াইয়ে তরুণ প্রজন্মের ভূমিকাই এখন সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। দেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম-সহ বিভিন্ন আন্দোলনের ইতিহাস নবীন প্রজন্মকে আকৃষ্ট করার ক্ষেত্রে সহায়ক বলেই তাঁদের যুক্তি। সেই পথেই শমীক লাহিড়ী লিখেছেন ‘স্বদেশের ভেতর কারা’, মালিনী ভট্টাচার্য আলোচনা করেছেন ‘বঙ্কিমচন্দ্রের সীতারাম ও হিন্দুরাজ্য’ নিয়ে। প্রাক্তন আমলা ও প্রাক্তন সাংসদ জহর সরকার দেখিয়েছেন ‘শ্রীচৈতন্য ও তাঁর সামাজিক বিল্পবের কিছু ঐতিহাসিক ও সাংগঠনিক বিবরণ’, শোভনলাল দত্তগুপ্ত শুনিয়েছেন ‘ফ্যাসিবাদ বিরোধিতায় দুই অতন্দ্র প্রহরী’ মানবেন্দ্রনাথ রায় ও সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথা।
দেশ জুড়ে চলতে থাকা তরুণদের আন্দোলনের প্রভাব তুলে ধরার চেষ্টাও হয়েছে সিপিএমের পুজো-চর্চায়। যেমন, দেবব্রত ঘোষ লিখেছেন ‘জেন-জ়ি’র কথা। ‘ককরোচ আন্দোলন’ থেকে কী শেখা গেল, বলেছেন সৃজন ভট্টাচার্য। আর যে ‘আজ়াদি’ শুনলেই বিজেপি তথা দক্ষিণপন্থী অংশ ‘খেপে উঠছে’, তা যে আসলে মানুষের অর্থনৈতিক স্বাধীনতার জন্য লড়াই এবং তা বহু দিন ধরেই জারি আছে, সে তথ্যও স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে নানা অনুষঙ্গে। সেই পথেই তরুণ নেতা কলতান দাশগুপ্ত মনে করিয়ে দিয়েছেন ‘বেরোজগারি সে
আজ়াদি’র কথা। সিপিএমের মুখপত্রের শারদ সংখ্যার ‘আমাদের কথা’য় বলা হয়েছে ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’! মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মুখে যে কথা অহরহ শোনা যেত, সিপিএমের বইয়ে তারই পুনরাবৃত্তিকে সাম্প্রতিক রাজনীতির প্রেক্ষিতেই দেখছেন অনেকে।