রক্ষাকবচ, কোর্টের নির্দেশে
আন্দোলন পথ থেকে পার্কে
নিজস্ব সংবাদদাতা
বিকাশ ভবনের আন্দোলনে যুক্ত চাকরিহারা শিক্ষকদের রক্ষাকবচ দিল কলকাতা হাই কোর্ট। একই সঙ্গে শুক্রবার আন্দোলনের স্থান পরিবর্তনের নির্দেশও দিয়েছে আদালত। বিচারপতি তীর্থঙ্কর ঘোষের নির্দেশ, চাকরিহারাদের আন্দোলনে গোলমালের ঘটনায় পুলিশ মামলা দায়ের করে তদন্ত শুরু করলেও আপাতত কোনও কড়া পদক্ষেপ করতে পারবে না। তবে বিকাশ ভবনের সামনের রাস্তা থেকে সরে সেন্ট্রাল পার্কের ভিতরে অবস্থান-বিক্ষোভ করতে হবে। একসঙ্গে সর্বাধিক ২০০ জন থাকতে পারবেন। বিক্ষোভের ছাউনি, পানীয় জল, বায়ো টয়লেটের ব্যবস্থা করবে বিধাননগর পুরনিগম। অবস্থান সংক্রান্ত বিষয়ে প্রশাসনের সঙ্গে সহযোগিতা করতে হবে আন্দোলনকারীদের এবং ১০ জন প্রতিনিধির নাম পুলিশের কাছে জমা দিতে হবে। পরবর্তী শুনানি ৪ জুলাই।
‘যোগ্য শিক্ষক ও শিক্ষিকা অধিকার মঞ্চ’-র অন্যতম নেতা চিন্ময় মণ্ডল বলেন, “আদালতের নির্দেশ মেনে চলতেই হবে। তবে কখন আমরা সেন্ট্রাল পার্কে যাব, নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে ঠিক করে জানাব।” আর এক আন্দোলনকারী সঙ্গীতা সাহা বলেন, “দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন থেকে আমরা সরছি না।” আন্দোলনকারীরা জানান, শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে চেয়ে চিঠি দেওয়ার চার দিন পরেও উত্তর আসেনি। আন্দোলনরত আর একটি সংগঠন ‘যোগ্য চাকরিহারা শিক্ষক শিক্ষিকা ও শিক্ষাকর্মীবৃন্দ’-র নেতা সুমন বিশ্বাস বলেন, “আদালতের নির্দেশ মেনেই সেন্ট্রাল পার্কে বসে আন্দোলন করব।”
সঙ্গীতা এ দিন আদালতে বলেন, “আমাদের বক্তব্য তুলে ধরতে আমরা শান্তিপূর্ণ ভাবে আন্দোলন করছি।” বিচারপতি ঘোষ বলেন, “আপনাদের প্রতিবাদ নিয়ে আমার কিছু বলার নেই। সবার প্রতিবাদের অধিকার আছে...। আমার চিন্তা সাধারণ মানুষদের জন্য। আপনাদের প্রতি আমার সহানুভূতি আছে। তবে অনির্দিষ্টকালের জন্য ওই জায়গায় বিক্ষোভ দেখানো যায় না। এলাকাবাসী ও সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের চলাফেরা করার জন্য স্থায়ী ব্যবস্থা করে দিতে হবে আমাকে।” চিন্ময় আদালতে বলেন, “আমরা সার্ভিস রোডে অবস্থান বিক্ষোভ করছি। সেখানে যানবাহন চলে না। কারও অসুবিধা করছি না। ৪০০ জনকে নিয়ে আমাদের এই কর্মসূচি করতে দিন।” বিচারপতি ঘোষ বলেন, “আপনারা শিক্ষক। শিক্ষকতা করে এসেছেন, এর পরেও করবেন। এমন আচরণ করবেন না যাতে আদালতকে বারবার হস্তক্ষেপ করতে হয়। আইনশৃঙ্খলা মেনে প্রতিবাদ করুন। আপনাদেরও বাড়ি, পরিবার আছে। সে দিকেও খেয়াল রাখতে হবে। তাই ঘুরিয়েফিরিয়ে ২০০ জন মিলে অবস্থান করুন।”
কোর্টের নির্দেশ আসার পরে দুপুরেও আন্দোলনকারীদের একাংশ বিকাশ ভবনের উল্টো দিকেই বসে ছিলেন। তাঁদের বক্তব্য, আন্দোলন যাতে শিক্ষা দফতরের কর্তা এবং শিক্ষামন্ত্রীর নজরে পড়ে তাই বিকাশ ভবনের উল্টো দিকে বসেছিলেন তাঁরা। সেন্ট্রাল পার্কের ভিতরে ছাউনিতে রোদ-জল আটকাবে কি না, তা নিয়েও তাঁরা উদ্বিগ্ন। বাণী সরকার নামে এক আন্দোলনরত শিক্ষিকা জানান, তিনি কর্কট রোগে আক্রান্ত। পূর্ব বর্ধমানের মন্তেশ্বরের সতী কৃষ্ণমণি হাইস্কুলের পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষিকা বাণী বলছেন, “অস্ত্রোপচার হয়ে গেলেও চিকিৎসা এখনও চলছে। ডিসেম্বর মাসে চাকরি চলে গেলে কী ভাবে খরচ চালাব?”
এ দিকে, চাকরিহারা গ্রুপ-সি এবং গ্রুপ-ডি শিক্ষাকর্মীদের মাসিক অনুদান নিয়ে এ দিন বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে শ্রম দফতর। সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১ এপ্রিল থেকে গ্রুপ-সি কর্মীরা মাসে ২৫ হাজার এবং গ্রুপ-ডি কর্মীরা মাসে ২০ হাজার টাকা করে অনুদান পাবেন। শ্রম দফতরের বক্তব্য, ভারতীয় সংবিধানের ২১ নম্বর ধারা অনুযায়ী, জীবনের অধিকার মৌলিক। তা রক্ষা করার দায় সরকারের। তাই ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল লাইভলিহুড অ্যান্ড সোশাল সিকিয়োরিটি ইন্টারিম স্কিম-২০২৫’-এর আওতায় এই অনুদান দেওয়া হবে। অনুদানের জন্য জেলা স্কুল পরিদর্শকের মাধ্যমে আবেদন করতে হবে শিক্ষাসচিবের কাছে। আবেদনকারীর মৃত্যু হলে, অবসরের বয়স হলে, কোর্টে রিভিউ পিটিশনের ইতিবাচক নিষ্পত্তি হলে, অন্য জীবিকা অবলম্বন করলে বা রাজ্যের নীতিগত সিদ্ধান্ত বদল হলে অনুদান বন্ধ হতে পারে। এই প্রকল্পের ‘স্ক্রিনিং’ কমিটির চেয়ারম্যান শ্রম কমিশনার। সদস্য-সচিব অতিরিক্ত শ্রম কমিশনার। প্রসঙ্গত, এই অনুদান নিয়ে মামলা হয়েছে হাই কোর্টে। তবে এখনও শুনানি হয়নি। শিক্ষা দফতরের খবর, চাকরিহারা শিক্ষাকর্মীদের তথ্য প্রধান শিক্ষকদের আগামী দু’দিনের মধ্যে জেলা স্কুল পরিদর্শকদের পাঠাতে হবে।