দূষণ পর্ষদের নামে তোলাবাজি নিয়ে শিল্পমহলে আতঙ্ক, সতর্কবার্তা জারি
দেবাশিস ঘড়াই
কোনও কারখানায় বা নির্মাণস্থলে হঠাৎ হাজির এক দল ব্যক্তি। পরনে কেতাদুরস্ত পোশাক, হাতে কেন্দ্রীয় দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের লোগো লাগানো লেটারহেড ও সিলমোহর দেওয়া নোটিস। অভিযোগ পরিবেশ দূষণের, আর তার পরেই শুরু মোটা অঙ্কের জরিমানা বা কাজ বন্ধের হুমকি। শেষমেশ ‘রফা’ করার প্রস্তাব দিয়ে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে মোটা অঙ্কের টাকা। ফলে শিল্পাঞ্চল থেকে নির্মাণস্থল— সর্বত্রই এখন এক নতুন আতঙ্কের নাম ‘দূষণ পরীক্ষা’। তবে এই আতঙ্ক পরিবেশ রক্ষার জন্য নয়, বরং কেন্দ্রীয় দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ বা সিপিসিবি-র নাম ভাঙিয়ে চলা এক সংগঠিত জালিয়াতি চক্রের জন্য।
দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সম্প্রতি এমন কিছু ঘটনার খবর সামনে এসেছে, যেখানে এক দল ব্যক্তি নিজেদের কেন্দ্রীয় সংস্থার আধিকারিক পরিচয় দিয়ে শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলিতে ঢুকে পড়ছে। তাদের হাতে থাকছে সরকারি সিলমোহর দেওয়া, লোগোযুক্ত লেটারহেড এবং কড়া ভাষায় লেখা নোটিস। কোথাও দূষণ-বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ, কোথাও আবার পরিবেশগত ছাড়পত্র না থাকার অজুহাতে কাজ বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত আইনি জটিলতা থেকে মুক্তি দেওয়ার নাম করে দাবি করা হচ্ছে মোটা অঙ্কের টাকা।
বিষয়টি প্রশাসনের নজরে আসতেই শোরগোল পড়ে গিয়েছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, খোদ কেন্দ্রীয় পর্ষদ তাদের সরকারি পোর্টালে ‘পাবলিক নোটিস’ জারি করে জানিয়েছে, এক দল জালিয়াত পর্ষদের পরিচয় ব্যবহার করে ব্যবসায়ীদের বিভ্রান্ত করছে। আরও জানিয়েছে, এই ধরনের কোনও ব্যক্তি বা বেসরকারি পরামর্শদাতা সংস্থাকে তারা পরিদর্শন বা জরিমানা আদায়ের জন্য নিয়োগ করেনি। অর্থাৎ, যারা নিজেদের সিপিসিবি-র প্রতিনিধি বা মনোনীত কনসালট্যান্ট বলে পরিচয় দিচ্ছে, তাদের কোনও আইনি ভিত্তি নেই।
তদন্তে জানা গিয়েছে, জালিয়াতির এই জাল অত্যন্ত সুচারু ভাবে বোনা হয়েছে। বর্তমান ডিজিটাল যুগে সরকারি লোগো, আধিকারিকদের জাল স্বাক্ষর কিংবা হুবহু একই রকম দেখতে লেটারহেড তৈরি করা অপরাধীদের কাছে জলভাতে পরিণত হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রতারকেরা এতটাই আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে পরিচয়পত্র দেখায় যে, সাধারণ ব্যবসায়ীদের পক্ষে তাদের সত্যতা যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে মাঝারি ও ক্ষুদ্র শিল্প সংস্থাগুলি, যারা প্রতিনিয়ত নানা সরকারি নিয়মকানুনের চাপে থাকে, তারাই সব থেকে বেশি এই ফাঁদে পা দিচ্ছে বলে অভিযোগ। আইনি লড়াইয়ের দীর্ঘসূত্রতা এড়াতে এবং কারখানা সচল রাখতে তারা অনেক সময় নীরবে এই তোলাবাজির শিকার হচ্ছে।
পরিবেশবিদ এবং প্রশাসনের আধিকারিকদের একটি বড় অংশ মনে করছেন, এই পরিস্থিতির অভিঘাত অনেক গভীরে। প্রথমত, এর ফলে দেশের পরিবেশ শাসনব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হচ্ছে। সাধারণ মানুষ এবং শিল্পমালিকদের মনে সরকারি নজরদারি ব্যবস্থার প্রতি এক ধরনের অনাস্থা তৈরি হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, নজরদারির নামে এই ভুয়ো অভিযানের সুযোগ নিয়ে আসল দূষণকারী সংস্থাগুলিও পার পেয়ে যেতে পারে। কারণ, ভবিষ্যতে যখন প্রকৃত সরকারি আধিকারিকেরা পরিদর্শনে যাবেন, তখন তাঁদেরও সন্দেহের চোখে দেখা হতে পারে। এর ফলে পরিবেশ রক্ষার মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকছে।
তা সত্ত্বেও এই চক্র দিনের পর দিন সক্রিয় থাকছে কী ভাবে, তা নিয়ে প্রশাসনিক নজরদারি নিয়েই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে ওয়াকিবহাল মহলে। সিপিসিবি তাদের নির্দেশিকায় সাধারণ নাগরিকদের সচেতন হওয়ার আবেদন জানিয়েছে। বলা হয়েছে, কোনও আধিকারিক পরিদর্শনে এলে ব্যবসায়ীরা যেন অবশ্যই তাদের বৈধ পরিচয়পত্র দাবি করেন। কোনও সন্দেহজনক ঘটনা ঘটলে তৎক্ষণাৎ স্থানীয় থানা বা কেন্দ্রীয় পর্ষদের আঞ্চলিক দফতরে অভিযোগ জানাতে বলা হয়েছে।
তবে কেবল সাধারণ মানুষের সতর্কতাই কি যথেষ্ট? আইনজ্ঞদের মতে, সরকারি পরিচয়ের অপব্যবহার রুখতে প্রশাসনিক সমন্বয় এবং দ্রুত ধরপাকড় জরুরি। অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ফৌজদারি ব্যবস্থা না নিলে এই জালিয়াতদের দাপট কমানো সম্ভব নয় বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।