নয়াদিল্লি, ১৫ জানুয়ারি: মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে নয়। আইপ্যাকের অফিস ও তার কর্ণধার প্রতীক জৈনের বাড়িতে ইডি-র তল্লাশির সময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হাজির হয়েছিলেন তৃণমূলের চেয়ারপার্সন হিসাবে। আজ সুপ্রিম কোর্টে মমতার তরফে আইনজীবী কপিল সিব্বল এই দাবি করে প্রশ্ন তুলেছেন, ‘‘তৃণমূলের ভোটকুশলী আইপ্যাকের দফতর থেকে দলের নির্বাচন পরিচালনা সংক্রান্ত সমস্ত গোপন তথ্য হাতিয়ে নিলে তৃণমূল কী ভাবে নির্বাচনে লড়বে?” তাঁর যুক্তি, তৃণমূলের চেয়ারপার্সন হিসেবে এই সব তথ্য রক্ষা করার অধিকার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রয়েছে। আর সেই তথ্য রক্ষা করতেই মমতা ইডি-র তল্লাশির সময় সেখানে গিয়েছেন। প্রতীক জৈনের ল্যাপটপ ও মোবাইলে তৃণমূলের গোপন তথ্য ছিল বলে তিনি তা নিয়ে বেরিয়ে আসেন।
গত বৃহস্পতিবার আইপ্যাকের দফতর ও প্রতীক জৈনের বাড়িতে তল্লাশির সময় মমতা সেখানে পুলিশ কর্তাদের নিয়ে হাজির হয়েছিলেন। আজ ইডি-র হয়ে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা সুপ্রিম কোর্টে সওয়াল করে বলেছেন, আইপ্যাক-তল্লাশির সময়ের মুখ্যমন্ত্রী, পুলিশ কর্তাদের হস্তক্ষেপ বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এর আগে কলকাতার পুলিশ কমিশনার থাকাকালীন রাজীব কুমারের বাড়িতে চিটফান্ড কেলেঙ্কারির তদন্তে সিবিআই গেলে মমতা সেখানে হাজির হয়েছিলেন। ধর্নাতেও বসেন। নারদ মামলায় তৃণমূলের নেতাদের গ্রেফতারির পরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও রাজ্যের আইনমন্ত্রী আদালতে হাজির হয়েছিলেন। মেহতা বলেন, ‘‘পশ্চিমবঙ্গে চমকে দেওয়ার মতো ঘটনা বারবার ঘটছে। যেখানে সাংবিধানিক পদস্থ মুখ্যমন্ত্রী মমতা কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার তল্লাশির জায়গায় পুলিশ কর্তাদের নিয়ে ঢুকে পড়ছেন।’’ সুপ্রিম কোর্ট আজ এই ঘটনায় মমতার জবাব চাওয়ায় বিজেপি মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে তাঁর ইস্তফা দাবি করেছে। দিল্লিতে বিজেপির সদর দফতরে সাংবাদিক সম্মেলন করে দলের মুখপাত্র গৌরব ভাটিয়া বলেন, এর আগেও কলকাতায় সিবিআইয়ের আধিকারিকদের উপরে হামলা হয়েছিল। সন্দেশখালিতে কেন্দ্রীয় সংস্থার উপরে হামলা হয়েছে। এটা কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী সুকান্ত মজুমদারের মন্তব্য, ‘‘সুপ্রিম কোর্টের সুপ্রিম থাপ্পড় খেয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর দলবল ফিরে এসেছেন!’’
আদালতে ইডি যুক্তি দিয়েছে, কয়লা পাচার মামলায় তদন্ত করতে তল্লাশির আইনানুগ অনুমতি নিয়েই তারা তল্লাশি করতে গিয়েছিল। তল্লাশির আগে আইনমাফিক স্থানীয় পুলিশকে জানানো হয়েছিল। রাজ্য সরকার ও পুলিশের ডিজি রাজীব কুমারের হয়ে আইনজীবী অভিষেক মনু সিঙ্ঘভি এর পাল্টা অভিযোগ তুলেছেন, সকাল ৬টা ৪৫ মিনিটে ইডি তল্লাশি শুরু করে। কিন্তু বেলা সাড়ে ১১টায় নিয়মমাফিক ই-মেল পাঠিয়ে তল্লাশির কথা জানানো হয়। তাঁর প্রশ্ন, কোন ক্যালেন্ডারে সকাল ৬টা ৪৫ মিনিটের আগে বেলা সাড়ে ১১টা আসে? তাঁর যুক্তি, তল্লাশির জন্য হাজির ব্যক্তিরা প্রথমে নিজেদের পরিচয়পত্র দেখাতে চাননি। তল্লাশির অনুমতিও দেখাননি। তাই মমতা সেখানে গিয়েছিলেন। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে যান বা তৃণমূলের চেয়ারপার্সন হিসেবে, মমতা জ়েড-ক্যাটেগরির নিরাপত্তা পান। তাই তিনি ঘটনাস্থলে গেলে রাজ্যের পুলিশ কর্তাদের সেখানে যেতে হয়েছে। অন্য দিকে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় প্রশ্ন তুলেছেন, ‘‘আইপ্যাকের নাম করে শুধু বাংলায় তল্লাশি করবেন! আইপ্যাকের অফিস রয়েছে তামিলনাড়ু, চেন্নাই, হায়দরাবাদেও। সেখানে করলেন না। আরও তিন ডিরেক্টর রয়েছেন। তাঁদের বাড়িতে তল্লাশি করলেন না, করলেন এখানে।’’
সিঙ্ঘভি আজ আদালতে দাবি করেন, ইডি সরাসরি সুপ্রিম কোর্টে এসে সিবিআই তদন্ত চাইতে পারে না। আর কোনও উপায় না থাকার মতো বিরল পরিস্থিতিতেই একমাত্র সরাসরি সুপ্রিম কোর্টে আসা যায়। এ ক্ষেত্রে ইডি পুলিশের কাছে অভিযোগ জানাতে পারত। ইডি একই সঙ্গে দু’টি সমান্তরাল ঘোড়ার চাপছে। এক দিকে কলকাতা হাই কোর্ট, অন্য দিকে সুপ্রিম কোর্টে মামলা করেছে। সুপ্রিম কোর্টে মামলা করেছে বলে হাইকোর্টের শুনানিতে স্থগিতাদেশ চেয়েছে।
সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা এর উত্তরে বলেন, গত ৯ জানুয়ারি কলকাতা হাইকোর্টে তৃণমূলের আইন দফতর ওয়টসঅ্যাপ করে সবাইকে এজলাসে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেয়। শুনানি ভন্ডুল হয়ে যায়। সেখানে ‘মবোক্র্যাসি’ চলছিল। বিচারপতি প্রশান্ত কুমার মিশ্র প্রশ্ন করেন, ‘‘যে ভাবে দিল্লির যন্তর মন্তরে সবাইকে প্রতিবাদে হাজির হতে বলা হয়?” মেহতা সেই সূত্র ধরে বলতে থাকেন, কোর্টের এজলাসকে যন্তর মন্তরে পরিণত করা হয়েছিল। শুনানি বাতিল হয়ে যাওয়াতেই ইডি-কে সুপ্রিম কোর্টে আসতে হয়। যেখানে মুখ্যমন্ত্রী-ডিজি-পুলিশ কমিশনারের বিরুদ্ধে অভিযোগ, সেখানে রাজ্য পুলিশের তদন্তে ভরসা করা যায় না বলে সিবিআই তদন্ত চাওয়া হয়েছে। সিঙ্ঘভি বলেন, একদিন আবেগের বশে হাইকোর্টের এজলাসে শুনানি ভন্ডুল হতে পারে। কিন্তু বুধবারই শান্তিপূর্ণ ভাবে শুনানি হয়েছে। হাই কোর্টের বদলে কেন সুপ্রিম কোর্ট এই মামলা শুনবে, তা নিয়েই আজ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও রাজ্য পুলিশের কর্তাদের আইনজীবীরা প্রশ্ন তোলেন।
সুপ্রিম কোর্ট অবশ্য শেষ পর্যন্ত এই মামলা শোনারই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে, ‘‘তল্লাশি সংক্রান্ত কিছু তথ্য আমাদের হাতেও রয়েছে। আমরা যদি হাই কোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টে সেই তথ্য দিই, যারা (ইডি) সুপ্রিম কোর্টে-হাই কোর্টে মিথ্যা বলছে, তারা পালানোর পথ পাবে না। পরবর্তী সময়ে মামলার শুনানি যেখানে হবে, সেখানে আমরা এই তথ্য তুলে ধরব।’’ সুকান্তের দাবি, ‘‘আজ সুপ্রিম কোর্ট প্রমাণ করে দিয়েছে যে পুলিশকে সামনে রেখে
কেন্দ্রীয় এজেন্সির তদন্তে বাধা সৃষ্টি করা যায় না।’’