রুটিরুজির লড়াই
সোমা মুখোপাধ্যায়ের প্রবন্ধ ‘কিছুই কি নেই বাকি’ (১৩-৬) অত্যন্ত সময়োপযোগী এবং মর্মস্পর্শী। এই প্রসঙ্গে একটি অভিজ্ঞতার কথা বলি। গত মাসের এক সকালে বাজারে যাওয়ার পথে দেখি, শেওড়াফুলি স্টেশন-সংলগ্ন রাস্তায়, রেলচত্বরের বাইরের অংশে স্টেশনে যাওয়ার পথের পাঁচিলঘেঁষা এলাকায় সারি সারি হকারের অস্থায়ী গুমটি উধাও। আগে অবশ্য উচ্ছেদের নোটিস দেওয়া হয়েছিল। প্রায় ৫০-৬০টি দোকান ছিল সেখানে। বহু বছর ধরে সাধারণ মানুষ ওই পথ ব্যবহার করে বাজার, স্টেশন ও খেয়াঘাটে যাতায়াত করেন। বহু দিনই শুনেছি, ব্রিটিশ আমল থেকেই নাকি পাঁচিলের বাইরের ওই অব্যবহৃত অংশ জনসাধারণের ব্যবহারের জন্য
উন্মুক্ত ছিল।
কিন্তু আমরা কি এক বারও ভেবে দেখেছি, ওই মানুষগুলির জীবনে এই উচ্ছেদের অভিঘাত কতটা গভীর? প্রায় চল্লিশ-পঞ্চাশ বছর ধরে তিন ফুট বাই চার বা পাঁচ ফুটের ছোট ছোট কাঠ ও টিনের গুমটিতে বসেই তাঁরা সংসার চালিয়ে এসেছেন। প্রখর রোদ, প্রবল বর্ষা কিংবা কনকনে শীত— সব উপেক্ষা করে তেলেভাজা, রোল, বিরিয়ানি, রুটি-তরকারি, চা-বিস্কুট, পোশাক, প্রসাধন সামগ্রী, ইমিটেশন গয়না-সহ নানা জিনিস বিক্রি করে পরিবার, সন্তানের পড়াশোনা ও বাড়িভাড়ার খরচ জুগিয়েছেন। অন্য দিকে, সাধারণ ক্রেতারাও তুলনামূলক কম দামে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে পারতেন। উচ্ছেদের দিন তাঁদের হতাশা ও অনিশ্চয়তার আর্তি শুনেছি, সহজে ভোলার নয়।
আমাদের মতো বিপুল জনসংখ্যার দেশে এক সঙ্গে সকলের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা সরকারের পক্ষে সহজ নয়। তাই এই সঙ্কটের সময়ে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। আইন অবশ্যই তার নিজস্ব পথে চলবে, কিন্তু আইন প্রয়োগের পাশাপাশি পুনর্বাসনের বিষয়টিও সমান গুরুত্ব পাওয়া উচিত। যে-হেতু কেন্দ্র ও রাজ্যে একই রাজনৈতিক দলের সরকার রয়েছে, তাই প্রশাসনের কাছে আবেদন, ওই ধরনের অব্যবহৃত জায়গাগুলিতে উপযুক্ত নিয়ম ও মাসিক সামান্য মাসুলের ভিত্তিতে হকারদের পুনর্বাসনের বিষয়টি বিবেচনা করা হোক। তাতে আইনও মানা হবে, আবার বহু পরিবারের জীবিকা ও ভবিষ্যৎও রক্ষা পাবে।
সুকুমার সরকার
শেওড়াফুলি, হুগলি