১৮৯২ থেকে ২০০৩ সাল— এই ১১১ বছরের মধ্যে কলকাতা পুর এলাকায় কমপক্ষে ২৭৩টি রাস্তা, গলি ও পার্কের নাম পরিবর্তন করা হয়েছে বলে প্রশাসনিক নথি জানাচ্ছে। অর্থাৎ, প্রতি বছরে গড়ে দু’টিরও বেশি রাস্তার নাম বদল হয়েছে। এই নাম বদল নির্দিষ্ট কোনও শাসকের রাজত্বে নয়, বরং ব্রিটিশ থেকে হালফিলের পূর্বতন তৃণমূল সরকার— সকলের আমলেই হয়েছে। রাজ্যে বিজেপি সরকার আসার পরে ফের একই প্রক্রিয়ার প্রাথমিক প্রস্তুতি শুরু হয়েছে।
কিন্তু সংশ্লিষ্ট মহলের একাংশের প্রশ্ন, রাস্তার নাম ব্রিটিশ আমল থেকে পাল্টে এলেও রাস্তার হালের পরিবর্তন হয় কই? সাম্প্রতিক সময়ের প্রশাসনিক নথিই বলছে, কিছু দিন আগে পর্যন্ত শহরের সিংহভাগ রাস্তার অবস্থাই খানাখন্দে ভরা ছিল। সেগুলির কিছু কিছু মেরামত করা হয়েছে।
তবে তড়িঘড়ি মেরামতির কাজের স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। খারাপ রাস্তায় প্রলেপ দেওয়ার মতো একই ধারাবাহিকতা রয়েছে রাস্তার নামকরণের ক্ষেত্রেও। ইতিহাসের একটি সূত্র বলছে, ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ পর্যন্ত রাস্তার নামগুলি ছিল মূলত প্রকৃতি, পেশা বা এলাকার বিবরণ-নির্ভর। যেমন আমড়াতলা, বকুলবাগান, কলুটোলা। এর পরে ১৮১৭-১৮৩৬ সালের মধ্যে শহরে নতুন রাস্তা তৈরি হওয়ায় সেগুলি লর্ড কর্নওয়ালিস, ওয়েলেসলি বা ডালহৌসির মতো ব্রিটিশ কর্তাদের নামে রাখা হয়। তবে স্বাধীনতার আগে কলকাতা পুরসভায় ভারতীয়করণের প্রভাব পড়তে শুরু করে। ১৯২৬ সালে সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউয়ের নাম পাল্টে রাখা হয় চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনিউ ও কর্পোরেশন স্ট্রিটের নাম হয় সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি রোড।
নামকরণের এই রাজনীতি স্বাধীনতার পরেও চলেছে। যেমন, ১৯৪৭ সালে ক্লাইভ রো-র নামকরণ হয় নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু রোড। পরবর্তী কালে একে একে ডালহৌসি স্কোয়ার (বি বা দী বাগ), মির্জাপুর স্ট্রিট (সূর্য সেন স্ট্রিট), থিয়েটার রোডের (শেক্সপিয়র সরণি) নাম পরিবর্তন হয়। আবার বাম সরকারের আমলে, অর্থাৎ ১৯৭৭ থেকে ২০০৭ সালের মধ্যে ১৬৮টি রাস্তার নাম পাল্টানো হয়। যেমন, হ্যারিংটন স্ট্রিট হয় হো চি মিন সরণি ও ধর্মতলা স্ট্রিট হয় লেনিন সরণি। ২০১১ সালে রাজনৈতিক পালাবদলের সঙ্গে নামকরণের ধারাতেও পরিবর্তন আসে। ২০১১-’১৪ সালের মধ্যে প্রায় ৩৫টি রাস্তার নাম বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বদের নামে রাখা হয়।
তবে আশ্চর্যের বিষয়টি হল, যে রাস্তাগুলির নামকরণ তিন-চারটি রাজনৈতিক পর্বে বার বার হয়েছে, ঘটনাচক্রে সেই রাস্তাগুলিই খানাখন্দে ভরা বেহাল রাস্তার তালিকায় শীর্ষে অবস্থান করেছে। যেমন, মধ্য কলকাতার চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনিউ, বি বি গাঙ্গুলি স্ট্রিট, এ পি সি রায় রোড, লেনিন সরণি, এস এন ব্যানার্জি রোডের মতো নাম-পরিবর্তিত রাস্তাগুলি ধারাবাহিক ভাবে খানাখন্দে ভরা থাকে। তার পরে সেগুলি সাময়িক ভাবে মেরামত করা হয়। এ বছর পুজোর আগে, ১০ অক্টোবরের মধ্যে রাস্তা মেরামতির কাজ শেষের সময়সীমা ধার্য করেছে বর্তমান সরকার।
তবে তড়িঘড়ি মেরামতির কাজ কতটা টেকসই হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছেই। নটিংহ্যাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক তথা পথ নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়ে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ নিক থমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “জল অ্যাসফল্টের জোর এবং রাস্তার ভিতের দৃঢ়তা কমিয়ে দেয়, যার ফলে রাস্তা সহজেই ভেঙে যায়। নিকাশি ব্যবস্থা দুর্বল হলে পরিস্থিতি আরও মারাত্মক আকার ধারণ করে, কারণ রাস্তা দীর্ঘক্ষণ জলমগ্ন থাকে।” ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফর্নিয়া, ডেভিস-এর অধ্যাপক তথা পথ-পরিকাঠামো এবং সংস্কার সংক্রান্ত বিষয়ে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ জন হার্ভির বক্তব্য, ‘‘আবহাওয়া অনুযায়ী প্রতি ৭-১৫ বছর অন্তর রাস্তায় প্রতিরোধমূলক প্রলেপ বা ‘সিল কোট’ দেওয়া উচিত। ভারী যান চলাচলের রাস্তায় ফাটল বেশি হলে শুধু তাপ্পি না মেরে অ্যাসফল্টের
আস্তরণটি পুরোপুরি বদলে ফেলা দরকার।’’
আইআইটি, বম্বের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ধরমবীর সিংহ কলকাতার প্রেক্ষাপটটি আলাদা করে তুলে ধরেছেন। তাঁর কথায়, ‘‘কলকাতার মতো বেশি বৃষ্টিপাতের শহরগুলিতে সংশ্লিষ্ট সংস্থা বা দফতরগুলি অনেক সময়ে বেশি খরচের ‘ম্যাস্টিক অ্যাসফল্ট’ ব্যবহার করে। সেটি সাবধানে বিছানো দরকার, না হলে রাস্তা পিছল ও এবড়োখেবড়ো হওয়ার আশঙ্কা থাকে।’’
ফলে রাস্তার নতুন নাম যাতায়াতের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতায় প্রভাব ফেলে না বলে জানাচ্ছে সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা। বিভিন্ন আমলেই শহরের রাস্তার সাইনবোর্ডে কেবল নতুন নাম লেখা হয়েছে, শুধু অপরিবর্তিতই থেকে গিয়েছে রাস্তার ভগ্নদশা! (শেষ)