১৯৬২। সীমান্তে ভারত-চিন যুদ্ধ চলছে। চিন্তামগ্ন দেশে হাত গুটিয়ে বসে থাকেনি যাদবপুরের ছাত্রছাত্রীরা। তৎকালীন উপাচার্য ত্রিগুণা সেনের নির্দেশে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে তৈরি হল সেন্ট্রাল ডিফেন্স কমিটি। দিনভর ক্লাস শেষে ৩০০ শিক্ষার্থী নিতেন ফার্স্ট-এডের প্রশিক্ষণ। যাদবপুরের ছাত্রীরা নার্সিংয়ের প্রশিক্ষণ নিতে গেলেন নিকটবর্তী হাসপাতালে। জওয়ানদের জন্য শীতবস্ত্র বানালেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীরা। সেই বছর বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বাতিল করে অনুষ্ঠানের জন্য বরাদ্দ অর্থও তুলে দেওয়া হল নিরাপত্তা তহবিলে। এমনই বিবরণ শুনিয়েছেন লেখকেরা। রাষ্ট্রীয় সঙ্কট উপেক্ষা করে ‘শুদ্ধ’ জ্ঞানচর্চায় মুখ গুঁজে থাকাকে প্রশ্রয় দেননি বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন পড়ুয়া থেকে উপাচার্য। কী ভাবেই বা মুখ ফিরিয়ে থাকতে পারে এই বিশ্ববিদ্যালয়? এই প্রতিষ্ঠানের জন্মই যে স্বদেশি আন্দোলনের পটভূমিতে, বঙ্গীয় জাতীয় শিক্ষা পরিষৎ-এর হাত ধরে।
১৮৬০-এর দশক থেকেই বঙ্গদেশে জাতীয়তাবাদের তীব্রতা বৃদ্ধির সঙ্গে যোগ ছিল পরিষদের প্রতিষ্ঠার। মাতৃভাষায় শিক্ষার অভাব, পেশাদারি ও প্রযুক্তিশিক্ষার অপর্যাপ্ত বন্দোবস্ত, ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থার দৌলতে বিজাতীয়করণের পটভূমিতে জাতীয় শিক্ষা-আন্দোলনের দাবিও জোরদার হয়ে উঠল। ভ্যালেন্টিন চিরল লিখলেন, এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলির চার দেওয়ালের গণ্ডির ভিতরের শিক্ষাচর্চার সঙ্গে ভারতীয় ছাত্রদের শ্রেণিকক্ষের বাইরের জগতের কোনও যোগ নেই। এই সময়েই সতীশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘দ্য ডন’ জাতীয় শিক্ষা আন্দোলনের কার্যত মুখপত্র হয়ে উঠল। ১৮৯৮-এ এই পত্রিকায় সতীশচন্দ্র লিখলেন, বিদেশি শিক্ষা এ দেশে মৌলিক মানুষ সৃষ্টিতে ব্যর্থ। বিদেশি শিক্ষা আত্মনির্ভর, আত্মত্যাগী, দেশপ্রেমিক হতে শেখায়নি। এই আবহে ১৯০২-এ লর্ড কার্জনের আমলে প্রস্তাবিত বিশ্ববিদ্যালয় আইন দেশীয় চিন্তাবিদদের বিক্ষোভের মুখে পড়ে। বছর কয়েকের মধ্যেই এল বঙ্গভঙ্গের ঘোষণা। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ব্রিটিশ পণ্য বয়কটের ডাক দেওয়া হল। আর সাংস্কৃতিক স্তরে উঠল জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবি। বঙ্গভঙ্গের আবহে ‘দ্য ডন’-এর পাতায় ১৯০৫-এর নভেম্বরে সতীশচন্দ্র ফের খেয়াল করালেন, জাতীয় শিক্ষা ও জাতীয় চেতনার সম্পর্কের কথা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, অরবিন্দ ঘোষও শামিল হলেন এই উদ্যোগে। ১৯০৬-এ তৈরি হল বঙ্গীয় জাতীয় শিক্ষা পরিষৎ। প্রতিষ্ঠানটির প্রথম কাজ, বিদেশি প্রতিষ্ঠান বয়কটের ডাকে সাড়া দিয়ে যাঁরা স্কুল-কলেজ ছেড়েছেন বা বহিষ্কৃত হয়েছেন, তাঁদের জন্য পরীক্ষা আয়োজনের বন্দোবস্ত করা। পরিষদের পাঠক্রমে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের বিদ্যার সমন্বয় সাধনে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হল। জোর দেওয়া হল প্রাচ্যের নানা বিদ্যার ধারাকে। সংস্কৃতের পাশাপাশি থাকল আরবি, ফারসি শেখার বন্দোবস্তও। সাহিত্য, বিজ্ঞান, কারিগরি ও পেশাদারি শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়। জাতীয় শিক্ষা আন্দোলনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ভাবে যুক্ত বিনয় সরকার সাক্ষাৎকারে বলেছেন, সরকারি রোষানলের ভয়ে অভিভাবকেরা সন্তানদের জাতীয় শিক্ষা পরিষদের স্কুলগুলিতে পাঠাতেন না। ‘নেহাৎ যারা স্বদেশি, স্বরাজ ও স্বাধীনতার আদর্শনিষ্ঠ’, তাঁদেরই কেউ কেউ ‘আঁকড়ে’ ধরলেন এই প্রতিষ্ঠানকে। পরিষদের অবশ্য আশা ছিল, এই প্রতিষ্ঠান থেকে উত্তীর্ণ ছাত্ররা ভারতের ইতিহাস, প্রত্নতত্ত্ব, অর্থনীতি বিষয়ে গবেষণা করবেন; সাংবাদিকতার পেশায় থাকবেন অথবা জাতীয় চেতনা জাগরণের জন্য পাঠ্যপুস্তক লিখবেন বিভিন্ন দেশীয় ভাষায়। নানা বেসরকারি বাণিজ্যিক সংস্থায় হয়তো চাকরি পাবেন প্রযুক্তিবিদ্যার শিক্ষার্থীরা।
এক ধরনের সমন্বিত শিক্ষার বন্দোবস্ত করে পরিষৎ। বিনয় সরকার লিখছেন, প্রযুক্তিবিদ্যার ছাত্রদেরও বাধ্যতামূলক ভাবে নিতে হত মানবিকীবিদ্যার পাঠ। ধর্মীয় শিক্ষারও আয়োজন ছিল। নানাবিধ পাঠ্যাতিরিক্ত বক্তৃতামালার মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীদের নৈতিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতার অভিমুখ নির্মাণে সচেষ্ট ছিল পরিষৎ। একটু বিতর্কেরও সৃষ্টি হয়েছিল অবশ্য। ধর্মশিক্ষার পাঠক্রমের মাধ্যমে হিন্দু জীবনাচরণের মাহাত্ম্য প্রকাশের সম্ভাবনায় বিরক্ত হন এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত নীলরতন সরকার, কৃষ্ণকুমার মিত্রের মতো ব্রাহ্ম নেতারা। তবে পরিষদের অন্যতম রূপকার সতীশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের মধ্যে যে গোঁড়ামি ছিল না, তা নিয়ে অবশ্য সকলেই একমত। কর্তা-ব্যক্তিরা কোনও ধর্মীয় অনুষ্ঠানই উদ্যাপন করেননি প্রাতিষ্ঠানিক পরিসরে। সরস্বতী পুজোও হত না পরিষদের কলেজ ও স্কুলগুলিতে। বহুত্বকে মর্যাদা দেওয়ার আকাঙ্ক্ষা এই সব ঘটনায় স্পষ্ট।
এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই জন্ম নেয় কলেজ অব ইঞ্জিনিয়ারিং ও টেকনোলজি (সিইটি) বা যাদবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য (সেকালের পরিভাষায় ‘রেক্টর’) ত্রিগুণা সেন ছিলেন এই কলেজেরই ছাত্র। পরে ১৯৪৩-এ পরিষদের তৎকালীন কর্ণধার বিধানচন্দ্র রায় কলেজ পরিচালনার দায়িত্ব দেন অধ্যাপক সেনকে। স্বদেশি আন্দোলনে যুক্ত থাকাকালীন তিনি গ্রেফতার হয়েছিলেন বেশ কয়েক বার। ঋষি অরবিন্দ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনের সান্নিধ্যপ্রাপ্ত ত্রিগুণা সেনও শিক্ষাকে দেখতে চেয়েছেন আত্মনির্ভরতা ও জাতীয় জাগরণের মাধ্যম হিসাবে। পরিষদের সামাজিক দায়বদ্ধতার ভাবনা চলে এসেছিল যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়েও। বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘রেক্টর’ হিসাবে স্বাগত ভাষণে ত্রিগুণা সেন স্মরণ করেছেন পরিষদের উত্তরাধিকারকে। চল্লিশের দশকের টালমাটাল সময় থেকেই অধ্যাপক সেন ও যাদবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ নানা সামাজিক সমস্যা সমাধানে তৎপর হয়ে ওঠে।
’৪৩-এর মন্বন্তরে দুর্ভিক্ষকবলিত মানুষদের সাহায্যার্থে অধ্যাপক সেনের নেতৃত্বে শিক্ষার্থীরা চালু করলেন ক্যান্টিন। ’৪৬-এ এল ভয়াবহ দাঙ্গা ও পরে দেশভাগ। উদ্বাস্তু মানুষের ঢল নামল যাদবপুর-সংলগ্ন অঞ্চলগুলিতে। এই সময়ে রেক্টর ত্রিগুণা সেনকে কখনও ছাত্রদের সঙ্গে নিয়ে যাদবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে অসহায় মানুষদের থাকার বন্দোবস্ত করতে, কখনও যাদবপুরের ছাত্র-সহ শিয়ালদহ স্টেশনে পূর্ব-পাকিস্তান থেকে আসা শরণার্থীদের জল, খাবার বিতরণের মতো নানা ভূমিকায় দেখা গিয়েছে। দাঙ্গার সময়ে যাদবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ব্লু-আর্থ ওয়ার্কশপে কাজে নিযুক্ত নোয়াখালির ৯৩ জন মুসলমান শ্রমিককে বাঁচাতে নিজের জীবনের ঝুঁকিও নিয়েছেন। পরিষদের বহুত্বের ভাবনা নতুন রূপ নেয় এই সব কর্মকাণ্ডে। সাময়িক সাহায্য শুধু নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি, স্থিতিশীল উন্নয়নেই তাঁর আগ্রহ ছিল। বহু উদ্বাস্তু তরুণ তখন হন্যে হয়ে চাকরি খুঁজছেন। বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানে এই সময়ে উদ্বাস্তু তরুণদের রাখা হয় শিক্ষানবিশ হিসাবে, যাতে পরে স্থায়ী চাকরির সংস্থান হয়। টিটাগড়েও কারিগরি শিক্ষার বন্দোবস্ত হয়েছিল। ত্রিগুণাও এই অবস্থায় যাদবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে উদ্বাস্তুদের জন্য চালু করলেন তিন বছরের ‘ওভারসিয়ার্স কোর্স’। যাদবপুর সংলগ্ন বিজয়গড় কলোনির বাসিন্দা সাধন দে জানাচ্ছেন ত্রিগুণা সেনের সাহায্যের কথা। যাদবপুরের ছাত্রদেরও ডাকলেই পাওয়া যেত। এই সবই ছিল উদ্বাস্তু জনতার মানসিক শক্তি। আর এক উদ্বাস্তু সন্দীপ সেনগুপ্ত উদ্বাস্তু-দরদি হিসাবে স্মরণ করেছেন অধ্যাপক সেনের কথা। তাঁর ছাত্র যাদবপুর ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের পড়ুয়া সুজিতকুমার সেন ছিলেন শক্তিগড় কলোনি তৈরির অন্যতম উদ্যোক্তা। ১৯৫০-এ বিজয়গড় কলেজ সারা ভারতে সম্পূর্ণ উদ্বাস্তুদের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত প্রথম কলেজ। সেখানেও কলেজ-সমিতির সহ-সভাপতি ছিলেন অধ্যাপক সেন।
১৯৫৫-র ২৪ ডিসেম্বর তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায়ের আমলে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় অ্যাক্ট চালু হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের গোড়ার দিক থেকেই ডিরেক্টর অব ইউথ ওয়েলফেয়ার ও পরে ডিন অব স্টুডেন্টস হিসেবে যুক্ত ছিলেন হিমেন্দু বিশ্বাস। তিনি জানাচ্ছেন, সে কালে যাদবপুরের ছাত্রদের সামাজিক দায়বদ্ধতার কথা। ১৯৫৯-৬০ সালে দক্ষিণ ২৪ পরগনার কালিকাপুরে ভয়াবহ বন্যায় বিধ্বস্ত মানুষদের সাহায্যে অধ্যাপক সেনের নির্দেশে এগিয়ে এসেছিলেন যাদবপুরের ছাত্র ও আধিকারিকরা। বন্যায় সেতু ভেঙে পড়েছে, এলাকার মানুষদেরই শামিল করা হল সেতু মেরামতের কাজে। বিনিময়ে তাঁদের দেওয়া হল বন্যাত্রাণের চাল। কালিকাপুরে বন্যাত্রাণের স্মৃতিচারণ করেছেন ত্রিগুণা সেনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও যাদবপুরের প্রাক্তন ছাত্র দেবব্রত রায়ও। বন্যাধ্বস্ত এলাকায় নৌকা চড়ে ত্রাণকার্যে আসা শহুরে পোশাকের লোককে গ্রামবাসী প্রথমে উপহাস করেছিলেন। পরে অবশ্য নির্দেশমতো তাঁরা প্যান্ট ছেড়ে ধুতি বা লুঙ্গি পরে গ্রামের লোকের কাজে হাত লাগান। ধীরে ধীরে জন্মায় সাধারণ মানুষের আস্থা। সুভাষচন্দ্র বসুর আদি বাড়ি কোদালিয়ায় (বর্তমান সুভাষগ্রামে) যাদবপুরের শিক্ষার্থীরা গ্রামের ছেলেদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে সুভাষ-স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের মিস্ত্রি ও এলাকাবাসীর সহযোগিতায় গ্রামের স্কুলঘর মেরামত করে দেন। গ্রামের ছেলেদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়ার্কশপে লেদ মেশিন চালানোর প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়।
১৯৬৪-তে জয়প্রকাশ নারায়ণের অনুরোধে বিহারের খরা-কবলিত অঞ্চলে ত্রাণকার্যে পৌঁছন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। একই সঙ্গে সেই অঞ্চলে নলকূপ বসানোর জন্য মাটি পরীক্ষা করতে যান ভূতত্ত্ববিদ্যা বিভাগের ছাত্র সমীর রায় ও আরও কয়েক জন। ষাটের দশকেই অসমে ‘বাঙালি খেদাও’ আন্দোলন চরমে উঠল। দলে-দলে অসম থেকে কলকাতায় চলে এলেন বাঙালি শিক্ষার্থীরা। সেখানকার পলিটেকনিক ও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের পড়ুয়ারা ভর্তি হলেন যাদবপুরে। হিমেন্দুর স্মৃতিকথায় জানা যায়, তখন যাদবপুরের নতুন ছাত্রাবাসে মাত্র ৬০টি আসন। অসমের ছাত্রে ছাত্রাবাস ভর্তি। অসমের অন্য ছাত্রদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের তরফেই যাদবপুর-লাগোয়া সন্তোষপুরে বাড়ি ভাড়া নেওয়ার ব্যবস্থা করা হল। একদা পূর্ববঙ্গের উদ্বাস্তুদের পাশে দাঁড়ানো ত্রিগুণা সেন এ বার অসম থেকে আসা বাঙালি শরণার্থীদের পাশেও দাঁড়ালেন। বন্যা অথবা খরা, যুদ্ধ বা শরণার্থী সমস্যা— এই সময়ে যাদবপুরের ছাত্র, শিক্ষক, আধিকারিক, উপাচার্য সকলেই এগিয়ে এসেছেন দেশের ডাকে। প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অধ্যাপক সেন গেঁথে নিয়েছিলেন মানুষকে। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান মেতে উঠেছিল জনসেবায়। ভৌগোলিক, সামাজিক শিকড়ের নিরিখেই প্রতিষ্ঠানের অভিমুখ নির্ধারিত হয়েছে এই সময়। চল্লিশ থেকে ষাটের দশকে রাষ্ট্রীয় বিপর্যয়ের দিনে, সদ্যগঠিত রাষ্ট্রের বিকাশের পদক্ষেপে যাদবপুর মুখ ফিরিয়ে থাকেনি।
সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রশ্নে আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক, স্কুল তৈরি। উচ্চশিক্ষার গজদন্তমিনার তৈরির আগ্রহ পরিষদেরও ছিল না। বিশেষ করে কলকাতা মহানগরের বাইরে জাতীয় বিদ্যালয় তৈরির ঝোঁক ছিল সে কালে। ব্রিটিশ শাসকেরা এই স্কুলগুলিকে দেখতেন ‘দেশদ্রোহ’-এর আখড়া হিসাবে। তবে পূর্ববঙ্গ ও উত্তরবঙ্গে তৈরি হয় বেশ কিছু জাতীয় বিদ্যালয়। যদিও সরকারি রোষানল, ডিগ্রির বৈধতা সংক্রান্ত আশঙ্কায় ছাত্র ভর্তির হার কখনওই খুব সন্তোষজনক ছিল না। জনশিক্ষার এই আদর্শ ছাপ ফেলেছিল অধ্যাপক সেনের মধ্যেও। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও পরিষদের সঙ্গে যুক্ত থাকাকালীন তিনি পরিষৎ-অব্যবহৃত দু’বিঘা জমিতে একটি স্কুল তৈরির প্রস্তাব দেন। সেই সূত্রেই ১৯৫৭-য় ‘যাদবপুর বিদ্যাপীঠ’-এর প্রতিষ্ঠা, বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দুই বছর পরেই। দুইয়েরই মূলে পরিষৎ।
বিদেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নীতি, কর্মপদ্ধতির সংঘাতে তৈরি হয়েছিল বঙ্গীয় জাতীয় শিক্ষা পরিষৎ। শিক্ষার বিদেশি ধাঁচা ভেঙে দেশের শিকড়ের সঙ্গে যোগস্থাপনই ছিল এর লক্ষ্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণার বিজাতীয়তা নিয়ে ভাবিত ছিলেন বলেই উচ্চশিক্ষার ভারতীয়করণের প্রচেষ্টা ছিল জাতীয় শিক্ষা আন্দোলনের নেতৃত্বের। সেই পদক্ষেপের প্রধান দিক— দেশীয় সমাজের সঙ্গে গভীরতর সংযোগ। বৌদ্ধিক গণ্ডির বাইরে এক বিশেষ ধরনের সামাজিকতা নির্মাণ। সম্প্রতি দেবাদিত্য ভট্টাচার্য ‘মেকিং সেন্স অব দ্য ইউনিভার্সিটি: আ ম্যানিফেস্টো অব আওয়ার টাইমস’-এ বলেছেন, ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসই এক অর্থে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজাতীয় ধারণার সঙ্গে এ দেশের জনগণের অস্তিত্বের প্রশ্নগুলির যোগ-অযোগের ইতিহাস। এই ইতিহাস নির্মাণের অনিবার্য অংশ ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রমে বৌদ্ধিক আর সামাজিক পরিসরের সম্পর্ক। পরিষৎ, যাদবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ ও শেষে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় বৌদ্ধিক বৃত্তের বাইরে সমাজের, দেশের এই বড় পরিসরকেই ছুঁতে চেয়েছে বরাবর।
তথ্যসূত্র: ‘ল্যাম্প ইন দ্য লোটাস: আ হিস্ট্রি অব যাদবপুর ইউনিভার্সিটি’: আনন্দ লাল, রমাপ্রসাদ দে, অমৃতা সেন; ‘আমি ও আমার সময়’: হিমেন্দু বিশ্বাস; ‘লেসনস ইন দ্য লিভিং: স্টোরিজ় ফ্রম দ্য লাইফ অব ত্রিগুণা সেন’, ‘ফিফটি ইয়ারস অব ন্যাশনাল এডুকেশন- দ্য স্টোরি অব অ্যান এক্সপেরিমেন্ট’: অমিতাভ মুখোপাধ্যায়; ‘দি অরিজিন্স অব দ্য ন্যাশনাল এডুকেশন মুভমেন্ট’: হরিদাস মুখোপাধ্যায় ও
উমা মুখোপাধ্যায়