একলা জীবন
মোস্তাক আহমেদের ‘মনখারাপের একলা পথে’ (৭-৯) পড়ে মন ভারী হয়ে উঠল। আজকের প্রজন্ম নিঃসঙ্গতা, অবসাদ, একাকিত্বের শিকার। প্রযুক্তির উপর নিরন্তর নির্ভরতা ও ডিজিটাল দুনিয়ার আবর্ত ঠেলে দিচ্ছে ওদের গভীর একাকিত্বের দিকে। ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে জীবনের আবেগঘন মুহূর্তগুলো।
এ ছাড়াও ব্যর্থ প্রেম, পারিবারিক অশান্তি, সামাজিক সম্মানহানি, বার বার পরীক্ষা দিয়ে ব্যর্থ হওয়া, শিক্ষাব্যবস্থায় ঘুণপোকা, প্রকৃত দরদি শিক্ষকের অভাব, গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস, যোগ্যদের চাকরি না-থাকা, চাকরিক্ষেত্রে অযোগ্যদের নিয়োগ— এই সমস্তের অনুরণন সঞ্চারিত হচ্ছে আজকের প্রজন্মের শিরায় শিরায়। বহু মানবিক সম্পর্ক এই আধুনিক যুগে তামাদি হয়ে গিয়েছে। নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচয়ের মধ্যে অবিশ্বাস দানা বাঁধছে। যাঁদের যত্নে, ভালবাসায় জীবন মধুর হয়ে ওঠে, তাঁদেরই জীবন থেকে বাদ দিয়ে পিছুটানহীন হতে চায় এই প্রজন্ম। একা হওয়ার তীব্র বাসনা মনের ঘরে বাসা বাঁধে। তার পর ঘিরে ধরে জীবনকে আষ্টেপৃষ্ঠে।
এর থেকে মুক্তির উপায় খুঁজতেই হবে। নইলে প্রজন্মের পর প্রজন্ম একাকিত্বের চোরাবালিতে ডুবে যাবে, শেষ হয়ে যাবে এদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার ঘেরাটোপে।
করবী হাজরা
নিউ টাউন, কলকাতা
কবিরঞ্জন
পুস্তক পরিচয় বিভাগে ‘এক সমৃদ্ধ জনপদের কথা’ (২২-৮) শিরোনামে ‘কৃষ্ণনগরের ইতিহাস’ (দুই খণ্ড) (সম্পা. নীলকমল সরকার) গ্রন্থটির বিষয়ে আলোচনা করেছেন শ্রদ্ধেয় অভ্র ঘোষ। তাঁকে সাধুবাদ জানিয়েও রচনার একটি অংশে সামান্য ভিন্নমত পোষণ করছি। তিনি লিখেছেন, “কৃষ্ণনগর সঙ্গীতেরও পীঠস্থান। দীপঙ্কর দাসের রচনায় তার মনোজ্ঞ বিবরণ পাচ্ছি। রাজা ক্ষিতীশচন্দ্র রামপ্রসাদের ভক্তিমূলক গান শুনে তাঁকে সভাসদ করেছিলেন, ‘কবিরঞ্জন’ উপাধি-সহ একশো বিঘা নিষ্কর জমি দান করেন।”
প্রথমত, সাধক-কবি রামপ্রসাদকে কবিরঞ্জন উপাধি এবং ১৭৫৮ সালে (৪ ফাল্গুন ১১৬৫ বঙ্গাব্দ) একশো বিঘা নিষ্কর জমি উপঢৌকন রাজা ক্ষিতীশচন্দ্র দেননি, দিয়েছিলেন স্বয়ং নদিয়ারাজ কৃষ্ণচন্দ্র রায়। আর দ্বিতীয়ত, কবিরঞ্জন রামপ্রসাদ কোনও দিন কোনও রাজসভার-ই সভাসদ ছিলেন না। রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রামপ্রসাদকে কৃষ্ণনগর রাজসভার সভাসদ হওয়ার মৌখিক প্রস্তাব দিয়েছিলেন মাত্র। শোনা মাত্রই কবি রামপ্রসাদ কৌশলে তা প্রত্যাখ্যান করেন। রামপ্রসাদ কৃষ্ণনগরে গিয়েছেন, কিন্তু তা রাজসভা অলঙ্কৃত করার জন্য নয়। রাজা কৃষ্ণচন্দ্রই রামপ্রসাদের গান শোনার জন্য সময় পেলেই মাঝে-মধ্যে হালিশহরে আসতেন। সংবাদ প্রভাকর-এর পাতায় কবি ঈশ্বর গুপ্তের রচনায় এর বিস্তর উল্লেখ আমরা পাই।
বঙ্গভাষা ও সাহিত্য গ্রন্থে দীনেশচন্দ্র সেন লিখেছেন, “রামপ্রসাদ সেন কৃষ্ণচন্দ্র মহারাজার সমসাময়িক। এই গুনজ্ঞ রাজা ১৭৫৮ খ্রিস্টাব্দে রামপ্রসাদকে ১০০ বিঘা ভূমি নিষ্কর দান করেন...।
তিনি রামপ্রসাদকে ‘কবিরঞ্জন’ উপাধি দিয়াছিলেন ও তাঁহাকে রাজসভায় আনিতে আগ্রহ দেখাইতেন। কিন্তু বিষয়নিষ্পৃহ কবি স্বীয় পল্লীতে বসিয়া শ্যামা-সঙ্গীত গানে নিজে মুগ্ধ থাকিতেন ও আর সকলকে মুগ্ধ করিতেন। তিনি কৃষ্ণচন্দ্রের অনুরোধ পালন করেন নাই।” রামপ্রসাদের কোনও লেখায় বা গানে কৃষ্ণনগরের কোনও রাজারই কোনও উল্লেখ নেই। রামপ্রসাদ কখনও কোনও রাজার স্তুতি করেননি। শাক্তগীতির ভগীরথ তিনি। একটি স্বতঃস্ফূর্ত ও স্বতন্ত্র সুরের উদ্গাতা কবিরঞ্জন। গীতিকার ও সুরকারের নামের সঙ্গে গানের সুর চিহ্নিতকরণে ‘রামপ্রসাদী’-ই বাংলা গানের ইতিহাসে প্রথম।
রণজয় মালাকার
কাঁচরাপাড়া, উত্তর ২৪ পরগনা
পথের অধিকার
নগরজীবনের প্রাথমিক শর্তই হল পথচারীদের নিরাপদ চলাচলের অধিকার। অথচ, আজ গলি থেকে রাজপথ— সর্বত্র দৃশ্যপট চরম বিশৃঙ্খল। বড় বড় শহরে ‘ফুটপাত’ শব্দটি আজ কেবল কাগজে-কলমে অবশিষ্ট আছে। বাস্তবে এর প্রায় পুরোটাই হকারদের দখলে। বাধ্য হয়ে সাধারণ মানুষকে জীবন বাজি রেখে মূল সড়কে নামতে হচ্ছে এবং প্রায়শই বিপদে পড়তে হচ্ছে। এই অবৈধ দখলদারি এখনই শক্ত হাতে দমন না করলে আগামী এক দশকে চওড়া মূল রাস্তা ১৫-২০ ফুটের সরু গলিতে পরিণত হবে।
এর স্থায়ী সমাধানে কিছু জরুরি পদক্ষেপ বিবেচনার আবেদন রাখছি। প্রথমত, যত্র তত্র সারা দিন দোকান চালানো বন্ধ করে কেবল নির্দিষ্ট কিছু রাস্তায় সন্ধ্যার পর সীমিত সময়ের জন্য ব্যবসা করার অনুমতি দেওয়া যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, নিয়ম মেনে প্রকৃত হকারদের বায়োমেট্রিক রেজিস্ট্রেশন-এর মাধ্যমে চূড়ান্ত তালিকা তৈরি করতে হবে। এই তালিকার বাইরে নতুন কারও দখলদারির চেষ্টা দেখামাত্রই কঠোর আইনি ব্যবস্থা করতে হবে। তৃতীয়ত, উচ্ছেদ হওয়া স্থানগুলি দখলমুক্ত রাখতে এবং আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয়ে একটি স্থায়ী যৌথ মনিটরিং সেল গঠন করা অত্যন্ত জরুরি। চতুর্থত, উচ্ছেদ অভিযানের পরও যদি পুনরায় কোনও স্থানে হকার বসেন, তবে সংশ্লিষ্ট এলাকার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
পঞ্চমত, হকারদের ফুটপাত থেকে সরিয়ে ক্ষুদ্র ঋণ সহায়তা ও সমবায় মার্কেট গড়ে তোলার মাধ্যমে বিকল্প জীবিকার সংস্থান করাই সবচেয়ে কার্যকর সমাধান।
কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ এবং আধুনিক নগর পরিকল্পনাই পারে শহরের সুস্থ স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে।
সংগ্ৰাম অগস্তি
কলকাতা-৮২