মাঝে মাঝে উইকিপিডিয়া ব্যবসা-বাণিজ্য বিষয়ে তার নিজস্ব বাংলা-ভাষায় যে তথ্য দেয় তার সত্য-মিথ্যে যাচাই করা কঠিন, তবে অসম্ভব নয়। ১৯৬৭ সালে, উইকিপিডিয়ার ভাষায়, ‘সর্বোচ্চ আয়কারী বাংলা সিনেমা’ উত্তমকুমারের এন্টনী ফিরিঙ্গী। মনে রাখতে হবে সে বছরেই মুক্তি পেয়েছিল উত্তম অভিনীত সত্যজিৎ পরিচালিত চিড়িয়াখানা। তার আগের বছর মুক্তি পেয়েছিল নায়ক— সে ছবি সত্যজিৎ উত্তমের জীবন ও সাফল্যকে স্মরণে রেখেই করেছিলেন। বাঙালির ‘নায়ক’ হিসাবে উত্তম ছাড়া আর কাউকেই তখন ভাবা যাচ্ছিল না। ভুবন-ভোলানো সেই হাসি, বাঙালির অন্তর্মঞ্চ জয় করে নিয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গে তখনও বামেরা সে ভাবে শাসনে আসেননি। গুরুত্বপূর্ণ লেজুড়। ষাটের দশকে নানা রাজনৈতিক ওঠাপড়া, কেন্দ্রে ও রাজ্যে। স্বল্পস্থায়ী দুই রাজনৈতিক জোটের পতনের পর ১৯৬৮-র ফেব্রুয়ারি মাসে পশ্চিমবঙ্গে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হবে, চলবে ১৯৬৯-এর ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। ১৯৬৭-তে যখন উত্তমের ছবি এন্টনী ফিরিঙ্গী বক্স অফিসে মুক্তি পাচ্ছিল তখন বঙ্গজ রাজনীতিতে সে বড় সুখের সময় নয়। রাজনৈতিক অসুখ উপেক্ষা করে বাঙালি অবশ্য উত্তমের এই মানবিক ছবিটি দেখেছিল। বক্স অফিসে সত্যজিতের উত্তমের চাইতে মূল ধারার উত্তম সফলতর। গালে হালকা দাড়ি, কানে দুল। ধুতি পরা চণ্ডীমণ্ডপের ছোট বাঙালিদের মাঝে বসে অন্য রকম ফিরিঙ্গি যুবকটি গান গাইছে ‘আমি যামিনী তুমি শশী হে’।
পিতৃপরিচয়ে ফিরিঙ্গি মাতৃপরিচয়ে বাঙালি সাহেবটি বাঙালি কবিগানের সংস্কৃতিকে গভীর অর্থে সমন্বয়ী করে তুলেছিল। সে গানের পদে বলেছিল, ‘ঐহিকে সব ভিন্ন অন্তিমে সব একাঙ্গী।’ এই উচ্চারণের জন্য অবশ্য অনেকটা পথ এগোতে হয়েছিল তাকে, অভিজ্ঞতায় শিক্ষায়। নিজের জাত-ধর্ম ভুলে গিয়ে সমন্বয়ী মানব সংস্কৃতির অংশীদার হওয়ার অনেক ঘটনারই সাক্ষ্য ভারতবর্ষের ও বঙ্গদেশের ইতিহাসে ছিল। তুর্কিয়ানা থেকে সুফিয়ানায় রূপান্তর যে হতে পারে, ভাষাচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় তা মনে করিয়ে দিয়েছিলেন। দরাপ খাঁ গাজি সংস্কৃত ভাষায় গঙ্গাস্তোত্র রচনা করেছিলেন। এর অনেক আগে বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাবে চণ্ডাশোক ধর্মাশোক হয়েছিলেন। ইতিহাস বইয়ের পাতায় তা ছোটবেলায় পড়া। তবে সে সব তো অক্ষরমালা, বইয়ের অক্ষর সব সময় ঘটনাকে ছবি করে তুলতে পারে না— সিনেমা পারে। সে তো দৃশ্যমালা, মহানায়ক গভীর বিশ্বাস থেকেই কবিয়ালের চরিত্র-দৃশ্যে অভিনয় করেছিলেন। বাঙালির চোখ-মন এই কাহিনির ভাব-সত্যে ভিজে গিয়েছিল, ঘটনাগত তথ্যের চুলচেরা বিচার তারা করেনি। সামাজিক জীবনে কান্না সামূহিক শুদ্ধি আনতে পারে, মুহূর্তের জন্য হলেও পারে। সে দিন উত্তম বাঙালিকে কাঁদাতে পেরেছিলেন। বাঙালির বড় অংশ মনে মনে স্বীকার করেছিল ‘আমার খোদা যে হিন্দুর হরি সে,/ ঐ দেখ শ্যাম দাঁড়িয়ে আছে।/ আমার মানব জনম সফল হবে,/ যদি রাঙা চরণ পাই।’ উত্তমের ছবি খুব সহজে কঠিন সত্য বুঝিয়ে দিয়েছিল— ‘ঐহিকে সব ভিন্ন ভিন্ন’ অন্তরে ‘সব একাঙ্গী’। মানুষ তো বাইরে থেকে অন্তিম যাত্রায় অন্তরেই যেতে চায়। এই ছবিতে একটি দৃশ্যে সাধারণ এক জন মানুষ রাতের অন্ধকারে আপন মনে গাইতে গাইতে যাচ্ছে ‘খৃস্টে আর কৃষ্টে কিছু ভিন্ন নেই রে ভাই/ শুধু নামের ফেরে এ কথা তো শুনি নাই।’ কথাটা পাকাচুলো কোনও প্রবীণ লেখেনি, ছটফটে এক ছোকরা সাহেব বলেছে।
১৯৬৭ সালে ‘জেন-জ়ি’, ‘জেন-আলফা’ এ সব শব্দবন্ধের বালাই ছিল না। তবে এই ছবির প্রথম দৃশ্য থেকেই কানে দুল, গালে হালকা দাড়ি, ভাসা ভাসা উদাসীন চোখ, বুক খোলা জামা পরা উত্তম বুঝিয়ে দিয়েছিলেন পাকা মাথা সামাজিক
বিবেচনার মতলবি সঙ্কীর্ণতার বাইরে তিনি নবকুমার। যিনি বাকি কবিয়ালদের সঙ্কীর্ণ কটুকথাকে বড় কথা দিয়ে হারিয়ে দেন। সেই বড় কথা শুনে-বুঝে ভোলা ময়রা তাকে আলিঙ্গন করেন, এ তো ফিরিঙ্গি কবিয়ালের কাছে বাগবাজারের ময়রা ভোলার পরাজয় নয়। এ দুই কবিয়ালের ভাবের সম্মিলন। বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর কপালকুণ্ডলা উপন্যাসে নবকুমারের পরার্থপরতার সূত্রে লিখেছিলেন, ‘তুমি অধম তাই বলিয়া আমি উত্তম হইব না কেন?’ ফিরিঙ্গি কবিয়াল কেবল নিজে উত্তম নন, তাঁর উদারতা অপরের মনেও সঞ্চারিত হয়।
তবে সর্বদা কি হয়? হয় না। ১৯৫৪। ভাঙা স্বাধীনতার পর স্বপ্নভঙ্গের সে দশক। গৃহহারা মানুষের স্রোত। মুক্তি পেয়েছিল সদানন্দের মেলা। ছবি বিশ্বাস বলেছিলেন, ‘দিলটা যেখানে বড় সেখানে ও দেয়ালে আটকায় না।’ পরের দশকে যুগান্তর পত্রিকায় ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হয়েছিল তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের গ্রামের চিঠি, ১৯৬৩-র ২৭ জুলাই থেকে ১৯৬৮-র ২৭ মে। তারাশঙ্কর প্রায় অঙ্ক কষে দেখিয়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গের অন্তত পঁচিশ হাজার গ্রামকে বেছে নেওয়া সম্ভব। সে সব জায়গায় গড়ে দশ ঘর লোকের পুনর্বাসন করা সম্ভব। নানা জেলাতেই গ্রামে-গ্রামে আবাদযোগ্য পতিত জমি রয়েছে। এই যে সদানন্দ, যে চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন ছবি বিশ্বাস, তিনিই এখানে বড় দিলের জন্য সকলের চোখ টানেন। উত্তম তাঁর পাশে খানিকটা পার্শ্বচরিত্রের মতোই। যদিও সুচিত্রা-উত্তম এই ছবিতে শেষ অবধি মিলে গেলেন পরিণয়ে। সেই মিলনে ধর্ম বিপত্তির পাঁচিল তোলেনি, পারিবারিক বিত্ত ও বিত্তিহীনতা পাঁচিল তুলতে পারত, তুলল না। খানিক স্বপ্নপূরণের গল্পের মতোই সে ছবি শেষ হয়েছিল। বেহালা-বাদক সদানন্দবাবু দক্ষিণাবাবুর ফাঁকা বাড়িতে উদ্বাস্তু-কবলিত শহরে কিছু দিন তাঁর মেলা বসানোর জন্য গৃহহারা মানুষগুলিকে নিয়ে বসবাস করেছিলেন। কিন্তু বাস্তব কি এমন ছিল? বাড়ির মালিক আর আশ্রয় গ্রহণ-করা মানুষেরা এমন কি হন? এমন দিলওয়ালা? দিল বড় হলেই চলবে না, তার সঙ্গে তো বাস্তব বোধও চাই। সেই বাস্তবতার সূত্রেই তারাশঙ্কর গ্রামওয়ারি থাকার জায়গার হিসাব দিচ্ছিলেন। সেই বাস্তববোধ থেকেই তারাশঙ্কর লিখেছিলেন সপ্তপদী। অজয় কর তারাশঙ্করের লেখার চলচ্চিত্র রূপে ১৯৬১-তে উত্তম-সুচিত্রাকে ফিরিয়ে নিয়ে এলেন। ছবি বিশ্বাস এখানে সপ্তপদী-তে সদানন্দ নন, কঠোর নিষ্ঠাপূর্ণ উচ্চবর্ণীয় হিন্দু। পুত্র কৃষ্ণেন্দুর সঙ্গে ফিরিঙ্গি রিনা ব্রাউনের মিলন তাঁর ধর্ম-কঠিন মন মানতে চায় না, বিবাহে আপত্তি করলেন। রিনা ব্রাউনের কাছে নিজ-পুত্রের জাত-ভিক্ষা করলেন। রিনা আত্মপ্রত্যাহার করেছিল। আর সেই সততা শেষ অবধি পিতা ছবি বিশ্বাসকে এই বাস্তববোধে নিয়ে যায়, ‘আগে মানুষ পরে ধর্ম।’ তারাশঙ্করের রচনা অবলম্বনে নির্মিত অজয় করের ছবিতে ১৯৪৩-এ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আবহে দুই ভিন্ন ধর্মের মানুষ মানব পরিচয়ে গান্ধর্ব-বিবাহ সম্পন্ন করে। ছবির ঘটনাকাল ১৯৪৩, তখনও দেশভাগ পূর্ববর্তী ভয়ঙ্কর দ্বিপাক্ষিক দাঙ্গা আর দেশভাগ সত্য নয়। অজয় কর ১৯৬১-তে যখন এই ছবি মূল ধারার বাঙালি দর্শকদের জন্য করছেন তখন কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মানুষ বাস্তবে দেশভাগ ও দাঙ্গা দেখে ফেলেছেন। তবু ‘আগে মানুষ পরে ধর্ম’ এই বোধের ছবি হিসাবে তা সুপারহিট।
১৯৬৭-তে ফিরিঙ্গি কবিয়ালের জীবন নিয়ে যে ছবি মুক্তি পেল, আর যা উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুসারে সে বছরের ‘সবচেয়ে আয়কারী বাংলা’ ছবি, নর-নারীর প্রেমময় মিলনে তা কিন্তু শেষ হল না। নিরুপমা, বালবিধবা। তাকে ঘর ছাড়া করলে এক পুরুষ। সেই সম্বন্ধীয় পুরুষটি তাকে বাইজির কাছে বেচে দিল। সেখানে এক বিত্তশালী দেশীয় মুসলমান জমিদারের অনুগ্রহ পেল সে। হিন্দু নাম পরিবর্তিত। এক ধর্মের নাম থেকে অন্য ধর্মের নামে ভাসতে ভাসতে নতুন করে সে যাকে ভালবাসালে সে ফিরিঙ্গি কবিয়াল। নিরু বেশি কিছু চায়নি। চেয়েছিল মায়ের পুজো করতে, দুর্গা মায়ের মধ্যে সে খুঁজতে চেয়েছিল কবিয়ালের প্রয়াত মাকে। খুঁজতে চেয়েছিল মনের শান্তি। পেল না।
ছবির শেষে এক অগ্নিদৃশ্যের মুখোমুখি হই। দাউ দাউ করে জ্বলছে খড়ের চালার বাড়ি। জ্বালিয়ে দিয়েছে সঙ্কীর্ণ সমাজপতিরা। দুর্গাপুজোর অধিকারকে বিশেষ ভাবে কুক্ষিগত করে রাখাই তাদের উদ্দেশ্য। দুর্গাপূজার নিষ্ঠার নামে মানুষকে ছোট করাই লক্ষ্য। আগুনের মধ্য থেকে কোনও ক্রমে নিরুকে কোলে করে বাইরে আনে কবিয়াল। তার ভালবাসার সতী তার কোলে। ভোলা ময়রা ভোলানাথের কাছে, অর্থাৎ সমাজের সাধারণ বৃত্তিধারীর কাছে স্বীকৃতি পাওয়া কবিয়াল
সমাজের সঙ্কীর্ণ পুড়িয়ে দেওয়া অনুশাসকদের সে দিন সতী নিরুপমার মৃতদেহ কোলে নিয়ে জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘আচ্ছা বলুন তো এর কোনও প্রয়োজন ছিল কি?’ না, দরকার ছিল না। ‘ধর্মের চেয়ে মানুষ বড়’ এই কথাটুকু মেধাজীবী, ধর্মবিবিক্ত, হিন্দু-ধর্ম বিরাগী সেকুলারদের মধ্য থেকে উঠে আসেনি, ১৯৬১ সালের কথা ১৯৬৭ সালে আবার সাধারণের প্রশ্নের মাধ্যমে উঠে এসেছিল। উত্তমকুমারের মূল ধারার ছবি এই কথাটি সে দিন বাঙালিকে শেখাতে পেরেছিল।