কেমন ব্যবহার আশা করো, বিজয়ী রাজা প্রশ্ন করেছিলেন পরাজিত রাজাকে। “রাজার মতো,” বলেছিলেন বন্দি রাজা। আলেকজ়ান্ডার আর পুরুর এই গল্প দুই সহস্রাব্দের ওপার থেকে আজও ডাক দিয়ে যায় মনে। শৌর্য যে সম্পূর্ণ হয় না সৌজন্য না থাকলে, সে কথাটা যেন আধুনিক বিশ্ব ভুলতে বসেছে। যুদ্ধ মানুষ কবে না করেছে! সেনার পিছনে বিপুল ব্যয়, মাসের পর মাস অভিযান, শতসহস্র মানুষের রক্ত দিয়ে কেউ জিততে চেয়েছে নতুন ভূখণ্ড, ধনরত্ন, কেউ বা চেয়েছে সেরা বীরের শিরোপা। সে সব জয়োল্লাস ধ্বনি কবেই মিলিয়ে গিয়েছে কালের আকাশে। “রক্তমাখা অস্ত্র হাতে যত রক্ত-আঁখি/ শিশুপাঠ্য কাহিনীতে থাকে মুখ ঢাকি,” রবীন্দ্রনাথের কবিতার এই একটি পঙ্ক্তিতে যেন যাবতীয় যুদ্ধবাজের বিধিলিপি নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এক দিক থেকে দেখলে মনে হয়, সব থেকে সার্থক হয়েছে সেই যুদ্ধগুলিই যেগুলো স্থান করে নিতে পেরেছে শিশুদের পাঠ্যে— অর্থাৎ প্রচলিত গল্পে, ছড়ায়, ছবিতে, গানে। আর সেই সব গল্পে দেখা যায়, বিজেতার লোভ, হিংস্রতা, আস্ফালনকে ছাপিয়ে গিয়েছে অন্য কোনও গুণ। ৩২৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ঝিলম নদী পেরিয়ে ভারতে-আসা আলেকজ়ান্ডার যদি পরাজিত পুরুকে কচুকাটা করতেন, তা হলে গ্রিক ইতিহাসবিদ প্লুটার্ক-এর বইয়ের পুরুরাজ্য জয়ের অধ্যায় অতীত সাম্রাজ্যের মতোই মিলিয়ে যেত। এমনই দাগ কেটে গিয়েছেন সাধারণ এক সৈন্য, রিচার্ড রোল্যান্ড কার্কল্যান্ড। ১৮৬২ সালে আমেরিকার গৃহযুদ্ধের সময় প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে বিপক্ষের আহত সেনাদের মুখে জল ঢেলে দিয়েছিলেন উনিশ বছরের এই সৈন্য। তার সাহস আর হৃদয় দেখে হতবাক দু’পক্ষের সৈন্যরা প্রায় দেড় ঘণ্টা গুলিবর্ষণ বন্ধ রাখে। বিশ বছর বয়সে রিচার্ড মারা যান শত্রুর গুলিতে।
প্রায় সব মহাকাব্যে বীরগাথায় প্রচণ্ড যুদ্ধের পাশাপাশি এমন মানবিক কিছু মুহূর্ত রক্ত-মাংস-ক্লেদের মধ্যে জ্বলজ্বল করে ওঠে। রাবণবধের পরে বিভীষণ রাবণের শেষকৃত্য করতে অস্বীকার করেন— গুরুজন হলেও তিনি পরস্ত্রীনিপীড়ক, সর্বলোকের অহিতে রত। বড় ভাইয়ের দাহসংস্কার না করলে লোকে তাঁকে নৃশংস বলবে, জেনেও বিভীষণ পরাঙ্মুখ। তখন রাম বলেন, রাবণের মৃত্যুতে শত্রুতার অবসান হয়েছে। তিনি ছিলেন তেজস্বী, মহাবল, ধর্ম অনুসারে তাঁর অগ্নিসংস্কার করাই বিভীষণের কর্তব্য। নীল মেঘের স্তূপের মতো ভূপতিত রাবণকে তখন শকটে তুলে নিয়ে যাওয়া হল। প্রতিহিংসার স্পৃহা জয় করতে দেখা যায় সীতাকেও। যুদ্ধ জয়ের পরে হনুমান যখন অশোকবনে সীতার পাহারায় নিযুক্ত ক্রুর, নিপীড়ক, নিয়ত তর্জনরত রাক্ষসীদের বধ করার অনুমতি চাইলেন, সীতা হনুমানকে নিষেধ করে বললেন, প্রভুর আদেশেই এই রাক্ষসীরা তাঁকে তর্জন করত। পরের আদেশে যাঁরা পাপ করে, প্রাজ্ঞ ব্যক্তি তাঁদের উপর প্রতিশোধ নেন না। সেই শোকমুক্তির সময়ে অপরূপ একটি বাক্য উচ্চারণ করলেন সীতা, “কার্যং কারুণ্যমার্গেণ ন কশ্চিন্ন্যপরাধ্যতি”— সকলের প্রতিই সদয় ব্যবহার করা উচিত, কারণ অপরাধ করে না এমন কেউ নেই। বহু যুগ পরে এক তরুণ ধর্মপ্রচারক জেরুসালেমের মন্দিরে ঠিক এই কথাই মনে করাবেন ধর্মের বিধি দেখিয়ে হিংসায় উদ্যত কিছু মানুষকে— “তোমাদের মধ্যে যে কখনও অপরাধ করেনি,
সে-ই যেন প্রথম পাথরটা ছোড়ে।” পরকীয়ায় অভিযুক্ত এক নারীকে পাথর ছুড়ে হত্যা করতে উদ্যত হয়েছিল যারা, তারা একে একে নীরবে সরে গেল। জিশু সেই নারীকে নিন্দা করলেন না, বললেন সুপথে ফিরতে।
যা কল্যাণকর, তা-ই সত্য, এ কথা মহাভারতেও বার বার উচ্চারিত হয়েছে। ধর্মের প্রতিনিধি যুধিষ্ঠিরকে দেখা যায় বার বার প্রতিপক্ষকে ক্ষমা করতে। অর্জুন বা ভীম ছোট-বড় নানা অপরাধীকে পরাস্ত করে ধরে এনেও ছেড়ে দিয়েছেন যুধিষ্ঠিরের আদেশে। এর একটাই আশ্চর্য ব্যতিক্রম দেখা যায়, তা দুর্যোধনের ঊরুভঙ্গের পরে তাঁকে বধ্যভূমিতে প্রহরীহীন রেখে আসায়। যন্ত্রণাবিদ্ধ, চলচ্ছক্তিহীন এক রাজা, আঠারো দিন আগেও যিনি ছিলেন একাদশ অক্ষৌহিণী সেনার অধিপতি, তিনি রক্তবমি করতে করতে কোনও মতে হাত দিয়ে মাংসলোভী শৃগাল, কুকুর তাড়াচ্ছেন, এ এক অসম্ভব করুণ দৃশ্য। হয়তো এ ছিল রণক্লান্ত পাণ্ডবদের বিস্মৃত কর্তব্য, কিংবা হয়তো দুর্যোধনের চরম নীচতার জন্য মহাভারতকার তাঁর জন্য এই দীন, মহত্বহীন মৃত্যুই যথার্থ মনে করেছিলেন। তবু কুরুক্ষেত্রের ধর্মযুদ্ধে পরাজিতের প্রতি বিজেতার মর্যাদা প্রদর্শনে এই একটি বিচ্যুতি যেন থেকেই গেল মহাভারতে।